গ্রামীণ নারীর খাদ্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়া

নেত্রকোনা থেকে পার্বতী রাণী সিংহ

ভূমিকা
সেই প্রাচীনকাল থেকে ইতিহাসকে স্বাক্ষী রেখে নারী যখন কৃষি সভ্যতার সূচনা করেছিল সেদিন থেকে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং খাদ্য প্রস্তুতকরণ কাজ করে আসছেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনও তাঁরা ধরে রাখার চেষ্টা করছেননিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে। এসব কাজ করার মধ্য দিয়ে নারী প্রকৃতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং পরিবারের সাথে ধরে রেখেছেন একটি আন্তরিক ও নিবিড় সর্ম্পক। এই সম্পর্ক এত নিবিড় যে এর কোন একটাতে আঘাত হলে সেটার প্রভাব পুরো সম্পর্ক প্রক্রিয়ার ওপর পড়ে। তাই নারীরা সবসময় চেষ্টা করে আসছেন এই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার ও শক্তিশালী করার। মূলত খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রস্তুতকরণের মধ্য দিয়েই তাঁরা এই পবিত্র সম্পর্ক ধরে রেখেছেন যদিও আধুনিক খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার আগমনে কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছে নারীর খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া। এসব ডামাডোলের মধ্যে গ্রামীণ নারীরা এখনও নিজের প্রয়োজনীয় খাদ্যগুলো নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সংরক্ষণ করার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন নিরন্তর যার কিছু উদাহরণ নি¤েœ তুলে ধরা হলো: যাচ্ছে দিনের পর দিন।

মাংস সংরক্ষণ
গ্রামীণ জীবন এখনো আধুনিক সহজতর জীবনে অনভ্যস্ত। তাই গ্রামীণ জনগণ রেফ্রিজারেটরের ব্যবহার না করেও এখনো অনুষ্ঠান থেকে বেঁচে যাওয়া বা অতিরিক্ত মাংস বিভিন্নভাবে সংরক্ষণ করে থাকেন। মাংস সংরক্ষণ আবার কম বা বেশি দিনের জন্যও করা যায়। কম সময় বুঝাতে  ২-৩ দিনের জন্য আর বেশি সময় বুঝাতে ৫-৬ মাসের জন্য।  কম সময়ের জন্য সংরক্ষণ করার জন্য তাঁরা মাংস রান্না করে বারবার আগুনে জ্বাল করে সংরক্ষণ করেন। অন্যদিকে বেশি দিনের জন্য সংরক্ষণ করার জন্য তাঁরা প্রথমত মাংসগুলো ছোট ছোট টুকরো করেন। এরপর সুতোর মধ্যে সারি সারি করে সাজান। সাজানো মাংসের মালাগুলো রোদে ১০ থেকে ১২ দিন শুকান। বৃষ্টি থাকলে চুলার উপর দিয়ে শুকান। শুকানো মাংসের টুকরাগুলো বাতাস প্রবেশ করতে পারে না এমন বোয়ামে রেখে সংরক্ষণ করে থাকেন। সংরক্ষনকৃত মাংস ৬ মাস পর্যন্ত রেখে খাওয়া যায়। পরবর্তীতে খাওয়ার সময় গরম পানিতে হালকা সেদ্ধ করেন। সেদ্ধ করা মাংস ছেঁচে তারপর পুনরায় রান্না করেন তাঁরা।

মাছ সংরক্ষণ
বর্ষাকালে গ্রামের চারপাশে থাকা জলাশয়, বিল, হাওর, নদী থেকে মাছ সংগ্রহ করেন নারীরা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাছ তাঁরা সংরক্ষণ করে নিজেদের জ্ঞান অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে। প্রথমত মাছগুলো কেটে রোদে ৪-৬ দিন শুকান। 20161023_105352ছোট মাছ হলে বাঁশের তৈরি চালনিতে শুকান। আবার বড় মাছ হলে তাঁরা সেই মাছের টুকরো করে সুতা/দঁড়িতে ঝুলিয়ে শুকান।শুকানো মাছগুলো বাতাস প্রবেশ করতে পারেনা এমন কৌটাতে রাখেন। শুকানো মাছ ৬-৭ মাস পর্যন্ত রাখা যায়। বিশেষ করে চিংড়ি, টাকি, চিকড়া, পুটিঁ, শোল, বাইম, চান্দা, মলা, বইছা, খইলসা, রুই, মৃগেল, –কাতলা মাছগুলো সংগ্রহ করে এই কায়দায় সংরক্ষণ করেন তাঁরা। রান্না করার সময় তাঁরা ভালোভাবে হালকা গরম পানিতে মাছগুলো ধুয়ে নেন এবং এরপর রান্না করেন।

লেবু সংরক্ষণ
আজকাল আধুনিক মানুষেরা ফ্রিজ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারে না। কিন্ত আমাদের গ্রামের মানুষ যারা বিদ্যুৎবিহীনভাবে দিনাতিপাত করতে হয় তারা তাদের নিজস্ব জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সবজি যেমন লেবু সংরক্ষণ করে থাকেন। সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় তাঁরা মাটিতে অল্প পরিমাণ (৫-৭ ইঞ্চি) গর্ত করেন। গর্তে লেবু রেখে মাটি দিয়ে চাপা দিয়ে রাখেন। খুব বেশি গরম পড়লে অনুষ্ঠানের সময় তারা এভাবে লেবু সংরক্ষণ করে থাকেন।

পিঠা
বহুজাতিক কোম্পানির ছোট ছোট প্যাকেটে বাজারজাতকৃত সহজলভ্য খাবার পরিবেশেনে অনেকে অভ্যস্ত হলেও গ্রামীণ নিরাপদ খাবারগুলো খেতে এখনো অনেকে ছুটে যায় গ্রামে। নতুন ধান উঠার পর সোয়াই, কাটা,ি পঠা, পাপড়া, সিরিজ্ঞ, পাপড়া, পয়সা পিঠা, জালি পাপড়া, পাতা পাপড়াগুলো তৈরি করে ২-৩ দিন রোদে শুকান নারীরা। তারপর বোয়ামে সংরক্ষণ করেন। অন্যদিকে কাটা পিঠাগুলো তেলে ভেজে সংরক্ষণ করেন।  তেলে ভাজা পিঠাগুলো আবার একদিন রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করেন তাঁরা। পরবর্তীতে পরিবেশনের সময় তেলে ভেজে পরিবেশন করেন। এই পিঠা ৫-৬ মাস পযর্ন্ত রাখা যায়। গ্রামে অতিথি আপ্যায়নে এবং বাচ্চাদের নিরাপদ খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কাজে দেয়।
20161024_113842
নারকেলের চিড়া
অতিথি আপ্যায়নে অথবা বাচ্চাদের জন্য গ্রামের নারীরা তৈরি করেন নারকেলের সুস্বাদু চিড়া। এই প্রক্রিয়ায় নারকেলগুলো প্রথমে লম্বালম্বীভাবে চিকন করে চিড় করে কাটেন তাঁরা। তারপর চিড়ার আকৃতিতে পাতলা করে ছোট ছোট করে টুকরা করেন। ছোট টুকরোগুলো হালকা রোদে শুকিয়ে ভেজা ভাব দূর করেন। এরপর চিড়াগুলো খোলা বা খালি মাটির পাতিলে ভাজেন। ভাজা চিড়াগুলোতে চিনি মিশিয়ে আগুনে জ্বাল করেন। একটু শুকনো শুকনো হলে ঠান্ডা করে পরিবেশন করেন।

উপসংহার
আধুনিক খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা আসার পর থেকেই গ্রামীণ নারীর সৃষ্টিশীলতা চাপা পড়ছে বহুজাতিক কোম্পানির ছোট ছোট প্যাকেটে। এই সৃষ্টিশীলতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের সংস্কৃতিকে আমাদেরকেই সচেতনভাবে ধরে রাখতে হবে। নইলে আমরা আমাদের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলব। আসুন গ্রামীণ নারীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সম্মান দিই এবং সবার মাঝে ছড়িয়ে দিই।

happy wheels 2