সোনাই মন্ডল এর সোনালি দিন

সোনাই মন্ডল এর সোনালি দিন

ভারত থেকে ফিরে হেপী রায়

আমরা সব সময় নারীদের ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখে থাকি। এবং যতবার তাদের মেধা বা গুণের পরিচয় পাই, তত বার অবাক হই। ভাবনাগুলো মাথায় ঘুরপাক খায়, এও কি সম্ভব! কারণ আমাদের চিন্তার জায়গাটা খুব সীমিত। একজন পুরুষ যদি উপার্জনের সর্বস্তরে যেতে পারে, তবে নারী কেন নয় ? নারী তার চেনা গ-ি পেরিয়ে নিজের পছন্দ মতো কোনো পেশা বেছে নিতেই পারেন। প্রয়োজন শুধু একটু সুযোগ ও সমর্থনের। এই সুযোগটা আমাদের দেশে তেমনভাবে প্রচলিত না হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যাপকভাবে চলমান। অর্থাৎ সেখানকার নারী একজন পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে ঘরে ও বাইরে সকল ধরনের পেশায় নিয়োজিত থাকেন।

বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবী অনেক নারীই রয়েছেন। এর বাইরে বিভিন্ন পেশা যেমন খাবার হোটেল, ফলের দোকান, তৈরি পোশাক, চায়ের স্টল, মুদির দোকানসহ নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া যায় প্রভৃতি স্থানে পুরুষের চাইতে নারীদের পদচারণা চোখে পড়ার মতো। শুধু তাই নয় ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্র তৈরি ও মেরামতের কাজেও তারা সমান দক্ষতা রেখে চলেছেন। তাঁদের কার্যক্রম আমাদের দেশের একজন সাধারণ কৃষানীকেও আন্দোলিত করবে, উৎসাহিত করবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পেশায়।

Shonai

ভারতের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গোসাবা অঞ্চলের গোমড় নদীর কূল ঘেঁষা গ্রাম শুকুমারি। সেই গ্রামের একজন নারী সোনাই ম-ল। তিনি গত দুই বছর আগে পল্লী উন্নয়ন সমিতি বারুইপুর এর গ্রোথ সেন্টার থেকে সোলার লণ্ঠন তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ পাবার পর থেকে তিনি নিজেই এই লণ্ঠন তৈরি করে বিক্রি করছেন।
একই গ্রামের শুকদেব ম-লের সাথে তাঁর বিয়ে হয় দশ বছর আগে। তাদের ৮ (আট) বছর বয়সের একটি ছেলে রয়েছে। সোনাই ম-ল স্থানীয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে দূরে গিয়ে চাকুরি করতে হবে বলে তিনি কোনো চাকুরি করেননি।
স্বামী স্যানিটারী মিস্ত্রির কাজ করতেন। নিজ গ্রামে কাজের অভাব ও সংসারের চাহিদা মেটাতে তাঁর স্বামী কলকাতা, নদীয়া ও উড়িষ্যার বিভিন্ন শহরে কাজের জন্য চলে যেতেন। তিনি বাড়িতে ছেলেকে নিয়ে থাকতেন। সংসারের কাজের পাশাপাশি অবসর সময়ে বাড়িতে সব্জী চাষ, হাঁসÑমুরগি ইত্যাদি পালন শুরু করেন।

স্বামী কাজের ফাঁকে বাড়িতে এসে পল্লী উন্নয়ন সমিতি বারুইপুর এর সহায়তায় সোলার লণ্ঠন তৈরির প্রশিক্ষণ নেয়। স্বামীর সহায়তায় তিনিও এই প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। প্রথমে এক সপ্তাহ হাতে কলমে প্রশিক্ষণ, একমাস পরে আবার এক সপ্তাহ। এই দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণে তিনি সোলার লণ্ঠন তৈরি করতে শিখে যান। পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর স্বামীর পাশাপাশি তিনি লণ্ঠন তৈরি করে বিক্রি করা শুরু করেন।
স্যানিটারি মিস্ত্রির কাজ ছেড়ে তাঁর স্বামী একটি ইলেক্ট্রনিক্স এর দোকান শুরু করেছিলেন। সেখানেও তেমন সুবিধা হলো না। মূলধনের অভাবে দোকানটি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তখন সোনাই এই লণ্ঠন বিক্রি করে যে লাভ হয় সেই টাকায় ইলেক্ট্রনিক্স এর পাশাপাশি একটি চা এর দোকান শুরু করেন। সেখানে এই লণ্ঠনও বিক্রি হতে থাকে এভাবে দোকানের আয় দিয়ে তাঁর সংসারের অভাব কিছুটা দূর হয়েছে।
ভোর থেকে শুরু করে রাত ৮-৯ টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। তাই রাতের অন্ধকার দূর করতে লণ্ঠনই একমাত্র ভরসা। সোনাই ম-ল তাঁর লন্ঠন জ্বেলে রাতেও দোকান চালাতে লাগলেন। তাঁর দেখাদেখি এই ঘাটে আরো দোকান গড়ে উঠলো এবং ঘাটের সবাই এখন সোনাই এর কাছ থেকে লন্ঠন কিনে দোকান চালায়।

Shonai-1

এখন তাঁর দোকানের পরিসর বেড়েছে। শুধু চা নয়, সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিস এখানে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে তাঁর স্বামী দোকানের কাজে সহায়তা করলেও এখন তা পারেন না। কারণ উক্ত প্রতিষ্ঠানের একজন টেকনেশিয়ান হিসেবে তিনি কর্মরত আছেন। তাই দোকানের প্রয়োজনীয় উপকরণ গ্রামের বাজার থেকে সাইকেলে চড়ে সোনাই মন্ডলকেই নিয়ে আসতে হয়। দোকানে রাতে আলো থাকার কারণে তাঁর বিক্রি এখন বেড়ে গেছে।
এই লন্ঠন এর বৈশিষ্ট্য হলো একদিন চার্জ হলে ৪/৫দিন পর্যন্ত চলে। মোবাইল চার্জ দেওয়া যায়। নষ্ট হলে বাড়িতেই মেরামত করা যায়। এ সমস্ত সুবিধার কারণে নদীতে যারা মাছ ধরতে যায় বা সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে যায় তারা এটি বেশি ব্যবহার করে। বাড়ি বা দোকানে ব্যবহার ছাড়াও যে সকল শিক্ষক রাতে প্রাইভেট পড়ায় তারাও কিনে নিয়ে যায়।

একটি লাইট তৈরি করতে সোনাই ম-লের একদিন সময় লাগে। কারণ তাঁকে সংসার সামলানো ও দোকান চালাতে হয়। একটি লণ্ঠন তৈরির সকল সরঞ্জাম তাঁকে কিনে আনতে হয়। এটি তৈরি করতে ১১০০-১১৫০ টাকা খরচ হয়। ১৩৫০ টাকায় বিক্রি করেন। এছাড়া মেরামত করা বাবদও কিছু উপার্জন হয়। এছাড়া তিনি কাপড় সেলাই ও এর মাঝে নানা রকম নকশা করার কাজ পারেন। তাই দোকানে যখন বিক্রি কম থাকে সেই সুযোগে তিনি লন্ঠনের আলোতে কাপড় সেলাই করেন।

তিনি এখন স্বাবলম্বী। সংসারে কোনো অভাব নেই। এই গ্রামের আরো ৫ জন নারীকে তিনি হোম লাইট তৈরির প্রশিক্ষণ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। তারাও নিজেদের মতো কাজ করছেন। সোনাই ম-ল সারাদিন হাসিমুখে ক্রেতাদের কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণ বিক্রি করেন। দোকানের লাভের টাকা থেকে সংসারে খরচ করার পাশাপাশি অল্প অল্প করে জমা করছেন। ভবিষ্যতে দোকানটি আরো বড় করার ইচ্ছা আছে। ছেলেকে মানুষ করতে হবে।

সোনাই ম-লের মতো অনেক নারী আছেন যারা নিজেদের প্রয়োজনটিকেই প্রাধান্য দিয়ে সমাজে এগিয়ে চলেছেন। নিজেদের পাশাপাশি অন্যদেরকেও পথ চলতে সাধ্যমতো সহায়তা করছেন। এ সকল নারী সমগ্র নারী জাতির প্রেরণা হয়ে থাকবে আজীবন।

happy wheels 2

Comments