নারীর হাতে বুনানো স্বনির্ভরতা

নারীর হাতে বুনানো স্বনির্ভরতা

বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে শহিদুল ইসলাম

“শুরুটা দীর্ঘ দিন থেকে। কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারিনি। নিজেরাও একতাবদ্ধ ছিলাম না। বাজার ধরতে পারিনি। আবার কোথায় বিক্রি হয় তাও জানতাম না। অনেকসময় শ্রমের মজুরিটুকু ঠিকভাবে পেতাম না। কিন্তু ২০১৬ সালের মাঝ পথ থেকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি আমাদের।” তৃপ্তির চোখে কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের বিলনেপালপাড়া নারী সংঠনের সদস্য আনেরা বেগম (৪০)।

20180128_101638
একটা সময় ছিলো বাড়ির পুরুষরা নারীদের ঘর থেকে বের হতে দিতো না। এখন তা শুধুই স্মৃতি। কিন্তু নানামূখী উন্নয়নের কারণে এবং নারীর দক্ষতার প্রমাণের কারণে তাঁরা এখন আর চাইলেও ঘরে বসে থাকতে পারেন না। তাঁদের পাশের পুরুষটিই তাঁদের কাজে সহযোগিতা করছেন। দিচ্ছেন উৎসাহ। নিজের পরিবারে পুরুষের থেকেও বেশি সহযোগিতা করছেন নারী। আর এই কাজটি আরো সহজ হয় যখন নারী আরো বেশি সংগঠিত হয় তাঁদের অধিকার এবং সৃজনশীলতা প্রকাশে।

20180128_103005
বিলনেপাল পাড়া নারী সংগঠনের সদস্যরা একে একে সবাই নানা দক্ষতা অর্জন করছেন। হাতের বুনানো সুই-সুচি দিয়ে কাপড়ে এবং শাড়িতে নানা নকশা তুলে বিক্রি করছেন পাইকারি বাজারে। বাজারে ডিজাইনকৃত কাপড়ের মূল্য এবং সম্মানীতেও একসময় ভীষণভাবে ঠকেছিলেন। কিন্তু দিনে দিনে এ বিষয়ে নানা জায়গায় যোগাযোগ মতবিনিময় করে এখন আগের তুলনায় মূল্য বেশি পান। আগামীতে নিজেরাই এরকম পাইকারি দোকান দেবার ইচ্ছা পোষণ করেন এই সংগঠনের সদস্যরা। এর জন্যে প্রয়োজন বিনিয়োগ সহায়তা। হাতের কাজের উপার্জিত টাকা দিয়ে নারীরা আরো বেশি নিজের ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারেন। এমনটাই বলছিলেন সংগঠনের সদস্য খালেদা বেগম।

20180128_103654
চাইলে নিজের প্রয়োজনে ঔষধ, ছেলে মেয়ের জামা কাপড়, বই খাতাসহ নানা কাজে নিজের ইচ্ছার স্বাধীনতা প্রকাশ করছেন নারীরা। পরিবারের সিদ্ধান্তও এখন অনেক বিষয়ে নারীরাই নিয়ে থাকেন। এটা এক ধরনের উন্নয়ন বলেই মনে করেন রিনা বেগম। এই সংগঠনের নারীরা শুধু নিজের পরিবারে নয়। নিজের প্রয়োজনে তাঁরা ইউনিয়ন পরিষদসহ উপজেলা পর্যায়েও যোগাযোগ করছেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উপজেলার সেবাসমূহও গ্রহণ করছেন। আবার নিজেদের কারিগরি দক্ষতা অন্য গ্রামের নারীদের শিখিয়ে তাদেরকেও স্বাবলম্বী করতে সহায়তা করছেন।

20180128_112915
সংগঠন এবং যৌথ উদ্যোগ নারীদের অনেক বেশি সক্ষমতা প্রমাণের জায়গা করে দেয়। তারই প্রমাণ বিলনেপাল পাড়া নারী সংগঠন। শুরুতে ১৫ জনকে নিয়ে গড়ে উঠা সংগঠনটি এখন ৪৫ জনেরও বেশি সদস্য। বলা যায়, সংগঠনের সদস্যরাই গোটা পাড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সংগঠনটির সদস্য দেলেরা বেগম বলেন, “নিজেদের সমস্যাগুলো যখন ভাগ করে নেয়া হয়। তখন আর কোন সমস্যাই মনে হয়না।” সবখানে সবকিছুতে নারীর সক্ষমতা প্রমাণ করে দিয়েছে তাঁরাও পারে সবকিছুতে নেতৃত্ব দিতে। নিজের গ্রামের মধ্যেই তারা শুধু সীমাবদ্ধ থাকেনি। নিজেদের সমস্যা এবং নেতৃত্বের বিকাশ তারা ইউনিয়ন এবং উপজেলা পর্যায়েও প্রমাণ করে দিয়েছেন। সংগঠনের দুজন নারী সদস্য বর্তমান দর্শনপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটিতে অর্ন্তভুক্ত হয়েছেন। কাজল রেখা বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের পরিবেশ উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ কমিটি এবং সুলতানা খাতুন সমাজ ক্যলাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সংগঠনের সদস্য মুর্শিদা বেগম বলেন, “কারো দয়ায় মায়ায় নয়, আমরা আমাদের অর্জন নিজের হাতেই গড়ে তুলেছি। নিজের হাতেই আমরা আমাদের স্বনির্ভরতা গড়ে তুলতে চাই। প্রয়োজন শুধু সংগঠিত হবার দক্ষতা আর কিছু পথ চিনিয়ে দেয়া। আমরা দিনে দিনে তাও অর্জন করছি।”

happy wheels 2

Comments