মহামারী করোনায় ভয় নয় বরং সচেতনতাই বেশি জরুরি

সিংগাইর মানিকগঞ্জ থেকে শিমুল বিশ্বাস

মহামারী করোনায় ভয় নয় বরং সচেতনতাই বেশি জরুরি। আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপে মন্তব্য সুধীজনের। সম্প্রতি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এবং জলবায়ু সংকট নিরসন বিষয়ে আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপের আয়োজন করে বারসিক। সংকট মোকাবেলায় যুব, নবীন ও প্রবীণের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পারস্পারিক সমন্বয় ঘটানো ছিলো এ প্রজন্ম সংলাপের মূল উদ্দেশ্য। বারসিক সিংগাইর রিসোর্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ প্রজন্ম সংলাপে বায়রা, বলধারা ইউনিয়ন ও সিংগাইর পৌর এলাকায় বারসিক’র সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন শিক্ষার্থী-যুব ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সিংগাইর এলাকার নবীন ও প্রবীণসহ তিন প্রজন্মের ৪৪ জন মানুষ অংশগ্রহণ করেন। প্রত্যেক প্রজন্ম নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ধ্যান ধারণার আলোকে মহামারী সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেন। বারসিক’র ক্যাপাসিটি বিল্ডিং এন্ড মনিটরিং এক্সপার্ট এম.এ রাকিব এবং পরিচালক পাভেল পার্থ প্রজন্ম সংলাপটি পরিচালনায় সহায়তা করেন। এছাড়া আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপ উপলক্ষে উপস্থিত ছিলেন বারসিক মানিকগঞ্জের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায়সহ বারসিক সিংগাইর অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ।


সংলাপের মাধ্যমে মহামারীর একাল সেকালের চিত্র উঠে আসে। সেখানে দেখা যায়, মহামারী আগেও অনেকবার এ পৃথিবীতে এসেছে। মারা গেছে অনেক মানুষ। রাস্ত ঘাটে পরে থাকতে দেখা গেছে মৃতদেহ। তবে মানবিকতার মৃত্যু ঘটেনি কখনো। যা ঘটেছে বর্তমান সময়ে চলমান সংকট কোভিড-১৯ ক্ষেত্রে। ছেলে তার মাকে ফেলে এসেছে জংগলে। করোনা সনাক্ত বাবার কাছে যায়নি সন্তান। সংসার ভেঙে গেছে অনেকের। ছিন্ন হয়েছে ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধন। এ প্রসঙ্গে প্রবীণ কৃষক ইমান আলী বলেন, ‘আমি কলেরা দেখছি, বসন্ত দেখছি। তয় আমার মতে বসন্ত সবচেয়ে মারাত্মক ছিলো। তবুও মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ছিলো। করোনা তেমন কোন ভয়াবহতা সৃষ্টি করবার পারে নাই। কিন্তু মানুষের মানবতাকে কমাই দিছে।’


অন্যদিকে ষাটোর্ধ প্রবীণ কৃষক জুলমত আলী বসন্তে হারিয়েছেন ৫ বছরের ছোট ভাইকে। নিজেরসহ বাড়িতে চার জনেরই বসন্ত হয়েছিল। তার মা তাকে নিজে হাতে খাওয়াতো। এ প্রবীণের মতে, বর্তমান মহামারী করোনায় মরার ভয়ের চাইতে না খেয়ে মরার ভয়ই বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। কারণ করোনার কারণে দেশে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছে। তাই তিনি করোনা থেকে বাঁচতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আমি গুটি বসন্ত দেখেছি। অনেক বাড়িতেই মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। তবে সে গুলোর প্রচার কম ছিল।’


এম. এ রাকিব বলেন, ‘করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে হলে আমাদের নিয়মিত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। শরীরে জ্বর, শুকনা কাশি, ক্লান্তিভাব, ডাইরিয়া, শরীর ব্যাথা, খাবারের স্বাদ না পাওয়া, শ্বাস কষ্ঠ এ রোগের প্রধান লক্ষণ। করোনা রোগ সাধারণত ১০ দিনে উপসর্গ দেখা দেয়।’ তিনি করোনা রোগের সংক্রমণ ঝুকি এড়াতে মাস্ক পড়া ও হাঁচি-কাঁশি দেওয়ার সময় হাতের কনুই ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
প্রবীণ কৃষক ইমান আলী কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া ও কোভিড-১৯সহ ৪টি মহামারী জলন্ত সাক্ষী। তার মতে, বসন্ত সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ ছিলো। নিম পাতার পানি দিয়ে চিকিৎসা দিয়েছেন অনেক মানুষকে। তারা সুস্থও হয়েছিল।


অন্যদিকে যুব সমাজ দেখছে কোভিড-১৯ কে। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় নিজের ভুমিকার কথা উল্লেখ করেন তারা। যুবক শামীম বলেন, ‘আমরা করোনার সময়ে জনগণকে সচেতন করেছি। মাস্ক, সেনিটাইজার, সাবান বিতরণ করেছি।’ মারুফা আক্তর বলেন, ‘করোনাকালিন সময়ে বাড়ি থেকে বের হইনি। আত্মীয়স্বজনকে ফোনে সচেতন করার চেষ্টা করেছি।’


বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এবং জলবায়ু সংকট নিরসন বিষয়ে আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপের মূল আলোচক প্রতিবেশ এবং প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ক গবেষক ও পরিচালক পাভেল পার্থ বলেন, ‘প্রত্যেক মহামারীর সাথে বন্যপ্রাণির সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ‘প্লেগ ইদুর দ্বারা মানব দেহে এসেছে, নিপাহ এসেছে বাদুর থেকে , ম্যালেরিয়ার বাহক মশা, মাশ এর বাহক উট, কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে বাঁদুর এবং বানর। সেক্ষেত্রে বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রত্যেক মহামারী কোননা কোন প্রাণি থেকে মানব দেহে সংক্রমিত হয়েছে। আর এ সংক্রমণের কারণ হিসাবে মানুষই দায়ি বলে তিনি উল্লেখ করেন। কারণ মানুষ অহেতুক পরিবেশের উপর, প্রাণির উপর অত্যাচার করার কারনে বিশ্ব প্রকৃতি মানুষের উপর খারাপ আচরণ করে। তাই তিনি মহামারী ঠেকাতে বা মহামারী থেকে বাঁচতে নিজেদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশ ভালো রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

happy wheels 2

Comments