পরিবেশ রক্ষায় কৃষক আবুল কালাম’র উদ্যোগ

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

প্রকৃতিকে রক্ষা করলে প্রকৃতিই আমাদের রক্ষা করবে। ষাটের দশকের পর সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ ও উন্নয়নের নামে প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশ বিধ্বংসী পদক্ষেপের ফলে স্থানীয় ধান, সবজি, মাছ, প্রাণী ও উদ্ভিদসহ সকল প্রাণবৈচিত্র্য আজ বিপন্ন। উন্নত কৃষির নামে আমাদের কৃষকদের আপন জ্ঞান অভিজ্ঞতায় গড়া স্বনির্ভর, পরিববেশবান্ধব ও কৃষক নিয়ন্ত্রিত কৃষিকে করে তোলা হয়েছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নির্ভর কোম্পানিনির্ভর বাণিজ্যিক কৃষিতে। কৃষকের দীর্ঘদিনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে করে তোলা হয়েছে অবহেলিত, পরিবেশ ও প্রকৃতিকে করে তোলা হচ্ছে বিপন্ন। এত বিপন্নতা আর বিনাশের কালে এখনও নেত্রকোনা অঞ্চলের কৃষকরা বৈচিত্র্যময় শস্যফসল চাষ করে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করে স্বনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাসহ প্রাণবৈচিত্র্যকে সংরক্ষণের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

কৃষিকে কৃষকের নিয়ন্ত্রণে আনতে ও কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় নেত্রকোনা সদর উপজেলার বালি গ্রামের কৃষক আবুল কালাম নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছেন একটি ‘গ্রামীণ বীজঘর’। প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় ও সাধারণের জন্য বৈচিত্র্যময় কাঠ, ফলদ ও ফল জাতীয় সবজি ফসলের চারা সহজলভ্যকরণে কৃষক আবুল কালাম নিজ বসতভিটায় গড়ে তুলেছেন একটি গ্রামীণ নার্সারি। যেখানে তিনি ফল জাতীয় বৈচিত্র্যময় সবজি, ফল ও কাঠ জাতীয় গাছের চারা। বীজঘর তদারকি করেন কৃষক আবুল কালাম’র স্ত্রী জাহানারা বেগম। বিভিন্ন আকৃতির মাটিরপাত্র, বোতল, মাটির কলসী এবং প্লাস্টিক ও কাঁচের বয়ামে বৈচিত্র্যময় স্থানীয় জাতের ধান, সীম, শীতলাউ, মিষ্টিলাউ, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, করলা, পেঁপে, পুঁই, গোলআলু, মিষ্টিআলু, জামআলু, ডাটা, লালশাক, ধুন্দল, বেগুন, চালকুমড়া, মরিচ, বরবটি, ঢেড়সসহ নানা জাতের বীজ সংরক্ষণ এবং নিজের জমিতে চাষ করছেন। তিনি গ্রামের সকল কৃষক-কৃষাণীদের সাথে এসব সবজি বীজ বিনিময় করেন এবং বিনামূল্যে বিতরণ করেন। বাড়ীর আঙ্গিনার ২০ শতাংশ জমিতে কৃষি কাজ ও নার্সারির কাজের পাশাপাশি বছরজুড়ে বৈচিত্র্যময় সবজি যেমন-ডাটা, লালশাক, ধুন্দল, বেগুন, চালকুমড়া, মরিচ, সীম, শীতলাউ, মিষ্টিলাউ, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, করল¬া, শসা, পেঁপে, পুঁইশাক, আলু, মিষ্টিআলু চাষ করে নিজ বাড়িটিকে গড়ে তুলেছেন একটি আদর্শ পুষ্টি বাড়িতে। বাড়ির সামনের জমিতে বছরব্যাপী বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করছেন। গোয়ালে আছে তিনটি গাভী ও চারটি ছাগল। এছাড়াও তিনি হাঁস-মুরগি পালন করেন ও ছোট পুকুরে মাছ চাষ করেন। তিনি এসব গবাদী পশু-পাখির গোবর ও বিষ্ঠা দিয়ে জৈব উপায়ে সবজি উৎপাদনের জন্য কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন। কৃষক আবুল কালাম গত আমন মৌসুমে ৯টি স্থানীয় জাতের ধান চাষ করেছেন এবং সবগুলো ধানের বীজ (রতিশাইল, বিরই, কালোজিরা, চিনিশাইল) বীজঘরে সংরক্ষণ করছেন। বসতঘরের দুয়ারের দুই পাশে চাষ করেছেন বারোমাসি বেগুন ও বারমাসি মরিচের। মুরগির খোয়ারে বেশক’টি স্থানীয় জাতের মুরগি সংরক্ষণ করছেন। তার খোয়ারে সংরক্ষিত মূরগীর বীজ (বাচ্চা) গ্রামের চার জন কৃষক নিয়ে পালন করছেন।


কৃষক আবুল কালাম সবজী চাষে কোন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করায় তার উৎপাদন খরচ অনেক কম হয়। তিনি নিজেই অনেক জাতের জৈব বলাইনাশক তৈরি করে মাঠ ফসলে চাষ করেন। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা করে যাচ্ছন, যা গ্রামের অন্য কৃষকদের নিকট শিক্ষণীয়।

২০২০ সালের আর্ন্তজাতিক প্রাণবৈত্র্যি দিবসে ২০ ধরণের জৈব বালইনাশক তৈরি করে একটি স্টলে সেগুলো প্রদর্শন করেন। অনেক কৃষক জৈব বালাইনাশকের স্টল দেখে এবং এসব তৈরি ও ব্যবহার কৌশল সম্পর্কে তার পরামর্শ নেয়। দর্শনার্থীরা জৈব বালাইনাশকের উপকারিতার কথা শুনে ফসলের রোগবালাই দমন জৈব বালাইনাশক তৈরি করে ব্যবহার করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশেষভাবে ফল জাতীয় সবজির মাছিপোকা, বিটলপোকা, মাজরা পোকা ও বিছাপোকা দমনে নিমপাতার রস, জাবপোকা, কুমড়ার পোকা দমনে আতাগাছের পাতার রস, এছাড়াও তামাকপাতা, গো-চুনা, মরিচের গুড়া, কেরোসিন ও সাবানের মিশ্রণ এবং ছাই ও কেরোসিন মিশ্রণসহ মোট ২০ জাতের জৈব বালইনাশক তৈরি করে ব্যবহার করেন এবং গ্রামের অন্য কৃষকদেরও ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কৃষক আবুল কালাম’র পরিবেশবান্ধব উপায়ে কম খরচে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ দেখে গ্রামের অন্যান্য কৃষকদের মধ্যেও দিন দিন জৈব কৃষি চর্চায় আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকরা আবুল কালাম’র পরামর্শ অনুসরণ করে জৈব উপায়ে চাষাবাদ করে বেশ উপকৃত হচ্ছেন। তাঁর কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদন প্লান্ট দেখে গ্রামের অনেক কৃষকরা কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছেন।


কৃষক আবুল কালামের জৈব কৃষি চর্চার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন মানুষসহ সকল প্রাণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেমন অবদান রাখতে তেমনি প্রাণবৈচিত্র্য সংক্ষণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও সমান অবদান রাখছে। এর ফলে উদ্ভিদ এবং সকল ধরণের প্রাণ ও মানুষের সহবস্থান ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত হচ্ছে।

happy wheels 2

Comments