‘ছেউ জাউনের’ ব্যবহার গ্রাম থেকে গ্রামে

রাজশাহী থেকে অমৃত সরকার

২০১৮ সালের মার্চ মাসে বারসিক নিউজ.কমে প্রকাশিত হয় ‘ছেউ জাউন’ বরেন্দ্রর কৃষক উদ্ভাবিত নিজস্ব সেচ পদ্ধতি শিরোনামের একটি প্রতিবেদন। যেখানে দেখা গিয়েছে প্রাকৃতিক ও ভৌগলিক কারণে রাজশাহী তথ্য বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা বোরো ধান চাষে পানির অপচয় রোধ ও কম পানি ব্যবহার করে ফসল চাষ করা যায় এমন পদ্ধতি নিজেদের পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন। কৃষকরা সেই সেচ পদ্ধতির নাম দিয়েছিলেন ‘ছেউ জাউন’।

দীর্ঘ দুই বছর পর রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার বটতলি ও বড়শিপাড়া গ্রামের কৃষকদের সাথে আবারো ‘ছেউ জাউন বিষয়ে আলোচনা করা হয়। কৃষকরা বলেন এটা আমাদের জন্য অনেক ভালো একটি পদ্ধতি বিশেষ করে বোরো ধান চাষে। পদ্ধতিটি প্রতি মৌসুমেই নতুন নতুন এলাকার কৃষকরা ব্যবহার করছেন। গোদাগাড়ি উপজেলার বরশিপাড়া গ্রামের কৃষক মো. বাচ্চু মিয়া (৪৬) বলেন, ‘আমাদের এই পদ্ধতি এখন আশেপাশের অনেক এলাকা যেমন দাদড়, গোগ্রাম, বসন্তপুর এলাকায় ছড়িয়ে গিয়েছে।
এবারই বোরো ধান চাষে ছেউ জাউন পদ্ধতিতে ব্যবহার করছে মো. হেলাল উদ্দিন (৪২) তিনি বলেন, ‘গত বছর আমি বড়শিপাড়া গ্রামে এ পদ্ধতি দেখে এসে নিজের গ্রামের অন্য কৃষকদের সাথে আলোচনা করে এবারই সবাই মিলে ‘ছেউ জাউন’ পদ্ধতি শুরু করেছি। যেহেতু এই পদ্ধতি সবাই মিলে ব্যবহার করে উপকার পাওয়া যায়।’


অপর আরেকটি গ্রাম বসন্তপুরে গিয়েও দেখা যায়, সদ্য রোপণকৃত বোরো জমিতে ‘ছেউ জাউন’ ব্যবহার করছে কৃষক মো. রবিউল হক (৩৭)। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। কারণ বোরো ধানে আমাদের এখানে প্রচুর পানি প্রয়োজন হয় কিন্তু ‘ছেউ জাউন’ পদ্ধতি ব্যবহার করলে ২-৩টি সেচ কম দিলেই চলে। যার কারণে আমাদের ১৫০০-২০০০ টাকা কম খরচ হয় একবিঘা জমিতে ধান চাষ করতে। এটা আমাদের জন্য অনেক উপকারী।’

ছেউ জাউন পদ্ধতির উপকারিতা
প্রয়োজনের তাগিদেই এ অঞ্চলের যে কোন ফসলেই সেচের প্রয়োজন অপরিহার্য। পানির প্রাপ্যতা, একসেচ থেকে আরেক সেচের মধ্যবর্তী সময়, ভূমি ক্ষয়, সেচজনিত খরচ বিবেচনা করে কৃষকরা নিজেদের মধ্য আলোচনা ও সমন্বয় করে ফসলের জমিকেই সেচ নালা হিসেবে বিবেচনা করে ব্যবহার করেছেন। এই পদ্ধতিকেই কৃষকরা নাম দিয়েছেন ‘ছেউ জাউন’ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে এক জমি থেকে অন্য জমি নিচু হওয়ায় সেচ কাজ শুরু হয় উঁচু জমি থেকে এভাবে পর্যায়ক্রমে শেষ নিচেু জমিতে সেচ কাজ আগে সম্পন্ন হয়। এরপর আস্তে আস্তে সকল জমিই সেচের পানি দ্বারা পূর্ণ হয়। দুইটি জমির মধ্যবর্তী আইলে পলিথিন ব্যবহার করে নালা তৈরি করা হয়।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি উপজেলার বরশিপাড়া গ্রামের কৃষক মো. বাচ্চু মিয়া (৪৫) বলেন, ‘আমাদের এলাকায় সেচের প্রধান সমস্যা হলো সঠিক সময়ে আমরা সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য পানি পাই না। আবার জমি উঁচু নিচু হওয়ার কারণে পানি সেচে মাটি ক্ষয় হয়ে জমির আইল ভেঙে যায়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা পাশের জমির মালিকদের সাথে আলোচনা করে আমরা এই পদ্ধতিতে সেচ কাজ পরিচালনা করছি।’ ছেউ জাউন পদ্ধতিতে সেচ কাজ পরিচালনার ফলে ফসল চাষীর জমিতে সঠিক সময়ে পানির প্রাপ্ততা নিশ্চিতম হচ্ছে, নিশ্চিত হচ্ছে ভ’মি ক্ষয় রোধ। পাশাপাশি রোধ হচ্ছে পানির অপচয়।

অন্যদিকে একই উপজেলার বটতলী গ্রামের কৃষক মো. আনোয়ার হোসেন (৪৮) বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বিশেষ করে বোরো ধানের ক্ষেত্রে জমি ভেদে সাত থেকে দশটি সেচের প্রয়োজন পরে। আমরা যখন থেকে ‘ছেউ জাউন’ পদ্ধতি ব্যবহার করছি তখন থেকে প্রতিবছরই বোরো ধানে ক্ষেত্রে এক থেকে দুইটি সেচ কম লাগছে, যা আমাদের এলাকার জন্য খুবই উপযোগি।’ একই গ্রামের বিএমডিএ গভীর নলকূপের পরিচালনায় থাকা ডিপ চালক মো. আশরাফুল আলম (৪২) বলেন, ‘সাধারণত একবিঘা জমিতে বোরো মৌসুমে পানি দ্বারা পূর্ণ করতে তিন থেকে চার ঘন্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কৃষকরা যখন ‘ছেউ জাউন’ পদ্ধতির ব্যবহার করছেন তখন দেখা যাচ্ছে দুই বিঘা জমি চার থেকে ৫ ঘন্টার মধ্যেই পানি দ্বার পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তা থেকে যেমন বিদ্যুৎ খরচ রক্ষা পাচ্ছে, তেমনই রক্ষা পাচ্ছে অতি প্রয়োজনীয় ভূগর্ভস্থ পানি, যা বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের জন্য খুবই উপযোগী।

happy wheels 2

Comments