একজন সংগ্রামী মায়ের যুদ্ধ

মানিকগঞ্জ থেকে ঋতু রবি দাস
আমাদের মহল্লার এক দাদার বিয়েটা অনেক ধুমধাম করে হয়েছিল, আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়তাম। তার বিয়েতে আমি বরযাত্রী গিয়েছিলাম, অনেক মজা হয়েছিল সময়টা ছিল ২০০৯ সাল। আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগে দাদার বিয়ে হয়েছিল। তাদের পরিবারটি অনেক সুখি ছিল। দাদার নাম ছিল সাবলু রবি দাস (৩০) এবং বৌদির নাম সুমিতা রানি দাস (১৯)। সাবলু‘রা’ ৩ ভাই। তার বাবা দুই বিয়ে করেছিলেন। তার বাবার নাম কাঙ্গালী রবি দাস এবং মায়ের নাম মনি রানি দাস। প্রথম ঘরের তিন ছেলে এবং এক বোন। দ্বিতীয় ঘরে এক ছেলে এবং এক মেয়ে। সাবলুর বাড়ি মানিকগঞ্জ হলেও তিনি অনেক আগের থেকেই সাভারে থাকতেন বাসা ভাড়া নিয়ে। সেখানে তিনি ঘড়ির দোকান দিয়েছিলেন। তার অবস্থা অনেক ভালো ছিল। মা কাকিদের মুখে শুনেছি তিনি ছোটবেলায় অনেক কষ্ট করেছিলেন। খাবারের কষ্ট থেকে শুরু করে জামা কাপড়ের সব কিছুর কষ্ট করেছিলেন। তার বড় দাদার (বাবুল) কাছ থেকে ঘড়ির কাজ শিখেছিলেন। সাভারে একটি দোকান ভাড়া নিয়েছিলেন। সাবলুর বিয়ের আগেই তার বড় দাদার অকাল মৃত্যু হয়। তার দাদার মৃত্যুর পর দুই ভাতিজি এক ভাতিজা এবং বিধবা বৌদির দায়িত্ব তার কাঁধে চলে আসে। কয়েক বছর তিনি কষ্ট করে সবার দায়িত্ব পালন করেন।

এইদিকে সাবলুর বিয়ের বয়সও পার হয়ে যাচ্ছে। মহল্লার সবাই চেয়েছিল তিনি যেন তার বিধবা বৌদিকে বিয়ে করেন। তারও ইচ্ছা ছিল, কিন্তু এই বিয়েতে বাঁধা দেন তার বাবা। তিনি না করার জন্য বিয়েটা হয়না। এই ঘটনার কয়েক বছর তিনি কাপাসিয়া বিয়ে করেন সুমিতা রানি দাসকে। বিয়ের পর তিনি সাভার চলে যান। বিয়ের কয়েক বছর তাদের অনেক সুখেই কাটছিল। বিয়ের ৩ বছর পর তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। কন্যা সন্তানের নাম রাখেন নুপূর। সে এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বিয়ের সময় তিনি অনেক ধার করেছিলেন, আর বিয়ের এক বছর পরেই তার দোকান ভেঙে ফেলা হয়। দোকান ভাঙার পর তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। সংসারের হাল ধরতে সুমিতা জামসার একটি গার্মেন্টস এ চাকরি নেন। তার আয় দিয়েই তাদের কোনরকম দিন চলছিল। মেয়ে তখন কিন্ডারগার্টেন এ পড়ে। মেয়ের লেখাপড়া, বাড়ি ভাড়া, যাবতীয় খরচ দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয়। প্রায় ৬ মাস তিনি গার্মেন্টসে চাকরি করেন। উপায় না দেখে তারা তিনজন মানিকগঞ্জে ফিরে আসেন।

মানিকগঞ্জে আসার পর থেকেই সাবলু সাভারেই কাজের খোঁজ করছিলেন। অনেক চেষ্টার পর সাভারে তিনি একটি ব্রয়লার মুরগির দোকান দেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অল্প পুঁজিতে দোকানটি চালু করেন। দোকানটি ভালোই চলছিল। কয়েক মাস পর তিনি একজন কর্মচারি রাখেন। মানিকগঞ্জ থেকে প্রতি সপ্তাহে গিয়ে দোকানের হিসাব নিতেন। এভাবে ভালোই কাটছিল। বেশি বিশ^াস করলে যা হয়, কর্মচারিটি দোকানের হিসাবে গড়মিল করা শুরু করেন। এভাবে করতে করতে দোকানটিতে অনেক লোকসান হয় এবং বন্ধ হয়ে যায়।

দোকান বন্ধ হওয়ার পরে সুমিতা রানি বাসা বাড়িতে কাজ করা শুরু করেন এবং সংসারের হাল ধরেন। তাদের বাড়িতেই জুতার একটি ছোট দোকান ছিল। সেই দোকানে অল্প পুঁজি দিয়ে অল্প জুতা দিয়ে দোকানটি চালু করেন। এভাবেই দুই জনের আয়ে সংসার চলছিল। এইদিকে সাবলু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে কয়েকবার ঢাকা হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। আমাদের মহল্লার লোকজন নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী তাদের সাহায্য করেন। সাবলুর ব্রেইন স্ট্রোক হয়। তিনি কাউকে চিনতে পারেন না। সুমিতা মানুষের কাছ থেকে ধার করে এনে তার স্বামীর চিকিৎসা করেন। এভাবে প্রায় এক বছর অসুস্থ থাকার পর তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর আগে থেকেই তারা অনেক ঋণ এ জর্জরিত ছিলেন। একমাত্র মেয়ে আছে তার লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে হয়। উপায় না পেয়ে তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পর থেকেই তিনি আবার বাসা বাড়ির কাজ শুরু করেন। এভাবে মা মেয়ের ভালোই চলছিল। হঠাৎ একদিন তার কানে সমস্যা হয় ডাক্তার বলে দেন অপারেশন করতে হবে। এতদিন বাবার বাড়ি থাকলে তার কাজগুলো চলে যাবে। বাবার বাড়ি গিয়ে কানের অপারেশন করার পর প্রায় ২ মাসের মত বাবার বাড়িতে থাকার জন্য তার সব কাজ চলে যায়। বাড়িতে বাড়িতে খোঁজ নিয়েও কোন কাজ পাননি।

কোন উপায় না দেখে তিনি নিজেই তার স্বামীর জুতার দোকানে বসা শুরু করেন। জুতা রেডিম্যাড আনেন এবং বিক্রি করেন। এইভাবেই চলে যাচ্ছে তার আর মেয়ের দিনগুলো। জুতা কালি করা থেকে শুরু করে সেলাই পর্যন্ত সব করেন। মানুষের ভাগ্য কোথায় থেকে কোথায় নিয়ে যায় বলা যায় না। তার জীবন যুদ্ধ চলছে তার সন্তানের জন্য। আর এভাবেই সংগ্রামী মায়েরা তাদের জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যান। তিনি পশ্চিম দাশড়া নারী উন্নয়ন সংগঠনের একজন সদস্য। তার ইচ্ছা মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলবেন। এতে তার যতই কষ্ট হোক না কেন!

happy wheels 2

Comments