বরেন্দ্র অঞ্চলের জল ও জীবনের কথা

শহিদুল ইসলাম ও অমিত সরকার

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলটি বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের দেহের সাথে শিরার মতো মিশে আছে প্রাকৃতিক খাড়িগুলো। বরেন্দ্র অঞ্চল মানে খাড়ির এক সজ্জিত বয়ে যাওয়া। এখানে নীচু অঞ্চলের মতো খুব বেশি বিল জলাভূমি না থাকলেও যে বিল ও জলাভূমি আছে তা এই এলাকার ভারসাম্য রক্ষার জন্যে যথেষ্ট। আর প্রকৃতির নিয়মেই তা সৃষ্টি হয়েছে। এই অঞ্চলের নদ-নদীসহ পুকুরগুলোও প্রাণ-প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করে। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রকৃতির এই বিন্যাসেই জন্ম হয়েছে হাজারো পেশা। কেউ কৃষক আবার কেউ মাছ শিকার করে, মাছ বিক্রি করেই জীবিবকা নির্বাহ করেন। জলেই যাদের জীবন-সংস্কৃতি, জলের সাথেই যাদের বেড়ে ওঠা, আবার জলের কারণেই যাদের জীবিকার সংকট, সেই সকল মানুষের জল ও জীবনের কথাগুলো প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানার চেষ্টা থেকে এই লিখার সৃষ্টি।
DSC01517
চলমান উন্নয়নে ধান উৎপাদনে অনেক বড় সফলতা দেখিয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চল। কিন্তু একমুখী পাতাল নির্ভর বোরো ধানের চাষের কারনে আরেক ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বলা হয়ে থাকে, দিনে দিনে বরেন্দ্র অঞ্চলের পাতালের পানি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আগামীতে এলাকটি পানিশুন্য হলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের শিকার হবে। প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে তার সত্যতাও পাওয়া যাচ্ছে। আবার বিগত তিন বছরের সময়ের বেশি থেকে আরেক ধরনের উন্নয়ন সংকটের কথা জানা যাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। মৎস্য উৎপাদনে বড় ধরনের সফলতা দেখা যাচ্ছে। রাজশাহীর মৎস বিভাগের সূত্র মতে, ২০১৪ সালে ৪৮,৬৭৮টি বন্ধ এবং খোলা জলাশয়ে মাছ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিলো ৫৩,৯৯৩ টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৬৬৮৮২ টন। ২০১৩ সালের মৎস্য উৎপাদন হয়েছে ৬১৭৬৮ টন এবং ২০১৬ সালে এই লক্ষ্যমাত্রা  ধরা হয়েছে ৭০,০৮৪ টন। অর্থ্যাৎ মৎস বিভাগের লক্ষ্যমাত্রার থেকেও প্রতিবছর বরেন্দ্র অঞ্চলে উত্তোরোত্তোর মৎস্য চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই উৎপাদনে দেশীয় প্রজাতির মাছের পরিমাণ খুবই নগন্য বরং বিদেশী জাতীয় কার্প ও হাইব্রিড জাতীয় মাছই বেশি। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, মৎস্য বিভাগের মতে রাজশাহী থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক তাজা মাছ ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে।

উপরোক্ত পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় বরেন্দ্র অঞ্চলের মাছ চাষ দিনে দিনে কি পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তা এই অঞ্চলের উন্নয়নসহ জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু একটি উন্নয়নের ফলে আরেকটি বা অনেকগুলো সমন্বিত উন্নয়ন, সমন্বিত জীবনের কথা কেউ চিন্তা না করে। তাই তো দেখা গেছে, বিলের বৈচিত্র নষ্ট করে পুকুর খনন করে, স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা না করে মৎস্য উৎপাদনের হিড়িক পড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। এভাবে বিলের বৈচিত্র্য নষ্ট করে বিলে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করলে বরেন্দ্র অঞ্চলের বাকি বৈচিত্র্যটুকুও নষ্ট হয়ে যাবে। বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে যাবে। যে উন্নয়নে সকল জীবের সুখের সুর, বাঁচার দিশা পায় না সেটি কখনো স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন হতে পারে না-এমনটি জানালেন তানোর তালন্দ ললিত মোহন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শ্রী নীশিত কুমার প্রামাণিক।

অনুসন্ধান এবং প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলের নাচোল, গোদাগাড়ি, তানোর, পবা এবং মান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বিল এবং খাড়িগুলোও লিজ দেওয়ার কারণে স্থানীয় জলভিত্তিক পেশার মানুষগুলোর সমস্যা বেড়েছে। একই সাথে গ্রামের সবর্ সাধরনের প্রবেশাধিকারও খুন্ন হয়েছে। জলের পেশাভিত্তিক মানুষগুলো পেশা হারিয়ে অন্য পেশায় কোন মতে দিনাতিপাত করছে। একই সাথে জলজ উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়েছে। নাচোল উপজেলার হাজার দিঘা বিলের মৎস্যজীবী আঃ খালেক (৫৫) দুঃখ করে বলেন, “এই বিলে একসময় রাতে দিনে মাছ ধরতাম, কতো ধরনের মাছ পেতাম, বাজারে বিক্রি করে পরিবারের জন্যে চাল ডাল কিনতাম। আর এখন সরকার বিলটি লিজ দিয়ে আমাদের মতো মৎস্যজীবীদের আর নামতে দেওয়া হয় না।” তিনি আরও বলেন, “আবার যেসকল খাড়িতে পানি থাকে তাও আবার সরকার গুটি কয়েক মানুষকে লিজ দেওয়া হয়েছে। আমারা বাঁচবো কি করে। পেপার পত্রিকার কথা শুনি বরিন্দে এখন অনেক মাছ উৎপাদন হয়, অনেক আয় হয়, কিন্তু কই আমাদেরতো হয় না । আমরা দিনে দিনে যে শেষ হয়ে যাচ্ছি।”  আগে বিলে, ঝিলে, খাল খাড়ি, নদী কিংবা প্রাকৃতিক পুকুরে প্রচুর দেশীয় মাছ উৎপদিত হতো প্রাকৃতিকভাবেই। শিং, মাগুর, কই, পাবদা, বোয়াল, ইটাসহ নানা জাতের মাছ পাওয়া যেতো হরমামেশাই। জেলেদের চাহিদাও মিটতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে কৃত্রিম উপায়ে রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করে মাছ চাষ করায় দেশী মাছগুলো অনুকুল পরিবেশ না পেয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
IMG_20140927_130619
রাজশাহীর পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ও হুজুরি পাড়াসহ কয়েকটি ইউনিয়ন মিলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল কর্ণাহার। একসময় নানা জাতের মাছ বৈচিত্র্য ছিলো এই বিলে। জেলেদের চাহিদাও পূরণ হতো। কিন্তু দিনে দিনে বিলে কৃত্রিম পুকুর খনন করে বিলটির বৈচিত্র্য নষ্ট করা হয়েছে। এতে করে স্থানীয় বিলকেন্দ্রিক পেশার মানুষগুলো হয়েছে পেশাহীন। প্রভাবশালীরা বিলে শত শত বিঘা পুকুর খনন করে হাজার হাজার মণ মৎস্য উৎপাদন করছে। পুকুরে মাছ চাষের কারণে সেখানকার খেটে খাওয়া মানুষগুলোও হয়েছে পেশাহীন। যারা প্রতিনিয়ত বিলে কখনো হাল চাষ, শস্য ফসল রোপণ ও কর্তন এবং মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো তারা পড়েছে মহা সংকটে। এই প্রসঙ্গে কৃষক গিয়াস উদ্দিনের (৫৫) বলেন, “যেটুকু জমি আছে বিলে পুকুড় খনন করার কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আবার তাদের কাছে সে জমি লিজ দিতে হচ্ছে। আর সে জমি নিয়ে দরিয়া (পুকুড়) বানাচ্ছে। জানিনা এই জমি আবার কখনো পাবো কি না। এখন চাল কিনে খেতে হয়।”

দর্শনপাড়ার মৎস্যজীবী আশরাফ মিয়ে (৫০) বলেন, “আমাদের দিকে কে দেখবে? সব বিলে এখন পুকুর খনন করেছে, খাড়িগুলোও লিজ দিয়েছে, আমারা আর কোথায় মাছ শিকার করবো। বাধ্য হয়ে অন্য এলাকায় কাজ করতে যাই। এতে অনেক কষ্ট হয়। কারণ আমারা আগে থেকেই মাছ শিকারের সাথে জড়িত। অন্য কাজ করতে ভালো লাগে না।”একই কথা বলেন তানোর উপজেলার বিলকুমাড়ী বিলপাড়ের এক সময়ের মৎসজীবী আফাজ উদ্দিন (৫৫)। তিনি বলেন, “আগের মতো বিলে আর মাছ নেই। তাছাড়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিলে মৎস্য চাষ হয়। বলা হয় সকল মৎস্যজীবীর জন্যে এই মাছ চাষ, কিন্তু হঠাৎ করে রাতের অন্ধকারে প্রভাবশালী ও দুষ্কৃতিকারীগণ বিলের মৎস্য অভয়ারণ্যের সকল মাছ মেরে নিয়ে যায়। কোন অভিযোগ করেও লাভ হয় না।” তিনি আরও বলেন, “এলাকার পুকুরগুলোতে এখন রাসায়নিক কীটনাশক দিয়ে মাছ চাষ হয়, যা আমদের স্বাস্থ্যের জন্যেও হুমকি। খাড়িগুলো শুকিয়ে গেছে, কিছু খাড়িতে লিজ নিয়ে বা জোড় করেই প্রভাবশালীরা মৎস্য চাষ করে। বিল ও জলে সাধারণ মানুষের আর অধিকার নেই।”
IMG_20140927_171746
অন্যদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলের শিব, শিব রাবনাই, আত্রাই, ছোট যমুনা, মহান্দা, পদ্মাসহ বিভিন্ন নদ নদীগুলোতে বারোমাসে পানি না থাকায় নদীর সাথে জেলে ও মাঝিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষেরও সমস্যা দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়েই পেশার পরিবর্তন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু অনেকে আবার খুয়ে খুয়ে বাপ দাদার পেশা টিকিয়ে রাখতে কোন মতে চালিয়ে নেন পরিবার পরিজন। পদ্মা পাড়ের নৌকা চালিয়ে নিজের পরিবার চালান মো. এনামুল হক (৪৫)। তিনি বলেন, “বাপ দাদার পেশা ছিলো নৌকা চালানো। আমিও এই পেশা ধরে রেখেছি। কিন্তু এখন আর পরিবার চলে না এই আয়ে। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা শুকিয়ে যায়, পদ্মা গার্ডেনের কাছে কিছু শৌখিন লোক নৌকায় চড়ে ঘোড়ে, তখন কিছু টাকা পাওয়া যায়, যা দিয়ে নিয়মিত পরিবার চালানোও মুশকিল হয়ে পড়েছে।”

স্থানীয় সচেতন মানুষ মনে করেন, একসময় যেমন অধিক ফসলের আশায় পাতাল থেকে পানি উত্তোলন করে আজ পানির সমস্যায় পড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চল ঠিক তেমনি মৎস চাষের অধিক লাভের আশায় দিনে দিনে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাকৃতিক বিলগুলোতে কৃত্রিম পুকুর খনন করে বিলের বৈচিত্র্য নষ্টসহ স্থানীয় বাস্তসংস্থান বিনষ্ট হয়ে যাবে, যা বরেন্দ্র অঞ্চলকে আরো ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিবে। একই সাথে মাছ চাষে রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যও হুমকির মধ্যে পড়বে। গ্রামভিত্তিক পুকুরগুলোতে কৃত্রিম উপায়ে মাছ চাষ করার ফলে গ্রামের প্রান্তিক মানুষগুলো পুকুরের পানি ব্যবহার করতে পারে না। উপায়ন্তর না পেয়ে বিষাক্ত পানি ব্যবহার করে প্রান্তিক মানুষগুলো স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন দিনে দিনে।

happy wheels 2

Comments