শ্রম বিনিময় একটি গ্রামীণ চর্চা

নেত্রকোনা থেকে রুখাসানা রুমী

বাংলাদেশের হাওরবেষ্টিত একটি জেলা নেত্রকোনা। নেত্রকোনা জেলার অধিকাংশ মানুষের অন্যতম পেশা কৃষি। নেত্রকোনা জেলার একটি অংশ হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ জমি এক ফসলী (বোরো মৌসুম)। ২০১৭ বোরো মৌসুমে কৃষকদের উৎপাদিত ধান অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় প্রায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। ধান রোপণ ও কাটার মৌসুমে নেত্রকোনা এলাকার কৃষকরা কৃষি শ্রমিক সংকটের জন্য সময়মত ক্ষেতের ধান ঘড়ে তুলতে পারেনা। মাত্রাতিরিক্ত পেকে যাওয়া ধান কাটার ফলে অনেক ধান ঝড়ে পড়ে, ফলে ফলনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অন্যদিকে সময়মত কৃষি শ্রমিক না পাওয়ায় হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুমের ধান আগাম বন্যার পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়।

20170118_114701-W600

ধান রোপণ ও কাটার মৌসুমে কৃষি শ্রমিক সংকট নিরসনে নেত্রকোনা অঞ্চলের বেশকিছু গ্রামে কৃষকরা চালু করেছেন শ্রম বিনিময় বা হাঙ্গার পদ্ধতির। শ্রম বিনিময় পদ্ধতি চালু রয়েছে এমনই বেশকিছু গ্রাম কেন্দুয়া উপজেলার আশুজিয়া ইউনিয়নে। বিশেষভাবে পাড়াদূর্গাপুর, আশুজিয়া ও নগুয়া গ্রামের যুবক ও কৃষকরা তাদের এলাকায় কৃষি শ্রমিকের মুজরি বেশি হওয়ায় নিজরা পরস্পরের সাথে শ্রম বিনিময় করে একদিন একজনের জমিতে, অন্যদিন আরেকজনের জমিতে কাজ করেন। পারস্পারিক শ্রম বিনিময়ের এই পদ্ধতি এলাকায় হাঙ্গার পদ্ধতি নামে পরিচিতি পেয়েছে। কাজের মৌসুমে কৃষি শ্রমিক সংকট দেখা দিলে তারা ১০/১৫ জনের একটি দল তৈরি করে পর্যায়ক্রমে দলের সকলের জমিতে কাজ করে। এভাবে প্রতি আমন ও বোরো মৌসুমে তারা পরস্পরকে কৃষি কাজে সহযোগিতা করে। এতে যেমন একে অপরের সাথে সুসর্ম্পক গড়ে উঠেছে, তেমনি কৃষি শ্রমিক সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম হচ্ছে। বীজতলা থেকে ধানের চারা তোলা, চারা রোপণ, ফসল কর্তন, মাড়াই, ঘর তৈরি, ঘরের ছাউনি মেরামত ইত্যাদি কাজে তারা পরস্পরকে সহযোগিতা করে আসছে।

শ্রম বিনিময় বা হাঙ্গার পদ্ধতিতে যার বাড়িতে কাজ করা হয় সেই বাড়ির মালিক সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তাকারী শ্রমিকদের মাছ, মাংস দিয়ে এক/দুই বেলা খাবারের আয়োজন করেন। গ্রামের স্বচ্ছল ও অস্বচ্ছল উভয় শ্রেণীর কৃষকই এই পদ্ধতিতে শ্রম বিনিময় করেন। প্রবাদ আছে ‘দশের লাঠি একের বোঝা’। দলগতভাবে কাজ করায় কাজগুলো তাদের নিকট অতি সহজ মনে হয় এবং তারা আনন্দের সাথে কাজগুলো করে সমাধানে সক্ষম হয়। এসময় তারা অনেকে গান ধরে ও কৌতুক বলে অনেক বিনোদন করেন। তবে অন্যান্য ফসলের তুলনায় ধানের মৌসুমে এ পদ্ধতির প্রচলন বেশি। কৃষক মো. বাচ্চু মিয়া এর মতে, “এভাবে কাজ করার ফলে কঠিন কাজও সহজে করা যায়, সময় সাশ্রয় হয়, কৃষি শ্রমিকের জন্য চিন্তিত হতে হয় না এবং কম খরচেই কাজটি হাসিল করা যায়। বংশানুক্রমে এপদ্ধতিতে কাজ করে আসায় গ্রামের সকলের মধ্যে একটা নিবিড় সর্ম্পক গড়ে উঠেছে এবং ফলে দীর্ঘদিন ধরে এসম্পর্ক বিদ্যমন রয়েছে। কৃষি শ্রমিক সংকট নিরসনের একটি ভালো উদ্যোগ যা’ আমাদের দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা গ্রহণ করে লাভবান হতে পারে।”

hg-W600

শ্রম বিনিময়ের এ প্রথা আজ থেকে প্রায় ৩০/৩৫ বছর পূর্বেও প্রায় সকল গ্রামেই পরিলক্ষিত হত। তবে এ প্রথা এলাকা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। যেমন- কোন কোন এলাকায় ধারা কামলা, আবার কোন কোন এলাকায় মাগনা কামলা, আর নেত্রকোনা এলাকায় হাঙ্গার পদ্ধতি নামে পরিচিত। এ পদ্ধতিতে হাল চাষের ক্ষেত্রে খুব ভোর বেলা কৃষকরা নিজ নিজ হালের গরু, লাঙ্গল, জোয়াল ও মই নিয়ে সারিবদ্ধভাবে জমি চাষ করত। ধানের চারা তোলা, চারা রোপণ, ধান কাটা, ধান মাড়াই ও ঘরের চাল তৈরির (ছন/নাড়ার চাল) ক্ষেত্রে সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কাজ চলত। গ্রামের নারীরা রান্না-বান্না ও জলজোগের আয়োজনে সহযোগিতা করত। ফলে গ্রামের সকল নারী-পুরুষের মধ্যে হৃদ্যতার সম্পর্ক বিরাজ করত।

বর্তমানে এ ধরনের প্রথা বিলুপ্তির উপক্রম বিধায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পরস্পারিক নির্ভরশীলতা, সহযোগিতা ও আন্তঃনির্ভরশীলতা হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান নতুন প্রজন্ম এ প্রথা সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞাত রয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখন সকল ক্ষেত্রে বাজার নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক ও আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধি এবং সহযোগিতার মানসিকতা বৃদ্ধির জন্য এ ধরণের প্রথা পুনরায় চালু হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

happy wheels 2

Comments