পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য তানোরের কৃষক মো. ইউসুফ মোল্লা গত ২০১৩ সালে পরিবেশ পদক গ্রহণ করেন । ২০১৩ সালের ৫ জুন চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে তিনি এই পুরষ্কার গ্রহণ করেন। সম্প্রতি ইউসুফ মোল্লার সাথে কথা হয় বারসিক নিউজ.কম এর । মো. ইউসুফ মোল্লার কাজ, পরিবেশ সংরক্ষণের শুরু, কিভাবে এবং কোথায় তিনি বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্ত প্রায় ধানের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন, পরিবেশ পদক পাওয়ার অনুভুতিসহ পরিবেশবান্ধব উপায়ে তার কৃষিকাজের নানান বিষয় সহভাগিতা করেন। এখানে ইউসুফ মোল্লার সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো বারসিক নিউজ.কম পাঠকদের জন্য । সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিলভানুস লামিন।
বারসিক নিউজ.কম: কী কারণে আপনার কাছে লোকায়ত জ্ঞানভিত্তিক স্থায়িত্বশীল কৃষি একটি পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা বলে মনে হয়েছে যেখানে আপনার মতো অনেক কৃষক শক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষি চর্চায় আত্মনিয়োগ করেছে?
মো. ইউসুফ মোল্লা: আমি আমার বাবার কাছ থেকে কৃষিচর্চা শিখেছি। তিনি এলাকায় একজন প্রভাবশালী ও সফল কৃষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি জৈব বালাইনাশক, জৈব সার প্রস্তুত করে জমিতে প্রয়োগ করে সফল কৃষক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তিনি কৃষি উপকরণ তথা বীজ, সারের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ কৃষক বাজার থেকে বীজসহ সার ও কীটনাশক ক্রয় করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব বিষ ব্যবহার করে একদিকে যেমন মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ক্ষতি হয়েছে অন্যদিকে কৃষকেরা তাদের স্থানীয় জাতগুলো হারাতে বসেছে। বীজ সংরক্ষণের মতো ঐতিহ্যবাহী কৃষিচর্চা বিলুপ্ত হওয়ায় স্থানীয় জাতের অনেকগুলো কৃষিফসল আজ এলাকা থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। শুধু বীজ নয় এলাকা থেকে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো বিভিন্ন উদ্ভিদ, গুল্মসহ অন্যান্য প্রাণবৈচিত্র্য বিলুপ্তির মাত্রাও বেড়ে গেছে। এই বিলুপ্তির কারণে আমাদের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে লোকায়ত কৃষি কখনও পরিবেশ বিনাশ করেনা, প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতি করে না। আমি আমার পরিবারের সদস্য ও ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য দিতে চাই, পরিবেশকেও দুষণমুক্ত রাখতে চাই। পরিবেশ যদি সুরক্ষিত হয় তাহলে এই পরিবেশই আমাদের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণ ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। এই কারণেই আমি স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চা করি এবং অবশেষে আমার পরিশ্রমের ফসল লাভ করেছি!
বারসিক নিউজ.কম: পরিবেশ সুরক্ষার কাজে কারা আপনাকে বেশি উৎসাহিত করেছে?
মো. ইউসুফ মোল্লা: সত্যিই বলতে কি প্রথমদিকে আমি আমার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কোন সহায়তা ও উৎসাহ পাইনি। আমার ভাই ও সন্তানেরা আমার এই কাজকে ‘অকাজ’ হিসেবে দেখতো এবং এই কাজের পেছনে সময় ‘নষ্ট’ করায় নানাভাবে আমাকে বকাঝকা করতো। তারা আমাকে এমনও বলতো যে, ‘পুরাতন জিনিস’ দিয়ে তুমি কী করবে! তবে বর্তমানে তাদের ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। তারা আমাকে নিয়ে গর্ব করে এবং এ কাজে উৎসাহ ও সহায়তা দুটোই দেয়। সত্যি বলতে কি, আমি সমাজে আমার একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। অন্যদিকে বারসিক’র কাজ দেখে আমি আরও বেশি উৎসাহিত হয়েছি। বারসিক নানাভাবে আমার এই কাজে সহায়তা করে এবং উৎসাহ প্রদান করে পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগ চালিয়ে যেতে।
বারসিক নিউজ.কম: পরিবেশ পদক প্রাপ্তিতে আপনার কেমন লেগেছে?
মো. ইউসুফ মোল্লা: এই মুহূর্তে আমি সত্যিই খুবই আনন্দিত, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি কখনও কল্পনা করিনি যে, আমার জীবনে প্রধানমন্ত্রীর হাতে জাতীয় পুরষ্কার গ্রহণ করতে পারবো। এই পুরষ্কার প্রাপ্তিতে আমি আরও উৎসাহিতবোধ বোধ করছি আমার কাজগুলো সম্প্রসারণ করার, পরিবেশ রক্ষা করার। এই পুরষ্কার আমার কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ। আমার একার পক্ষে কখনও এই পরিবেশ পদক পাওয়া সম্ভব হতো না যদি বারসিক এই কাজে আমাকে সহায়তা না করতো। বারসিক কর্মকর্তারা গত ১৮ এপ্রিল আমার পক্ষ থেকে পরিবেশ পদক তালিকাভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের বরাবর একটি আবেদনপত্র দাখিল করে। আমি বারসিক’র সব কর্মকর্তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি।
বারসিক নিউজ.কম: পরিবেশ রক্ষায় অবদানের জন্যই আপনাকে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে। আপনি সংক্ষিপ্তভাবে আপনার কাজ সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন?
মো. ইউসুফ মোল্লা: আমি যেদিন থেকে কৃষিকাজ শুরু করি সেদিন থেকেই স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চা করে আসছি। ১৯৭৮ সাল থেকে আমি বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় প্রজাতির ধান ও অন্যান্য কৃষিফসলের বীজ সংরক্ষণ করে আসছি। বর্তমানে আমার সংরক্ষণে ৬০ অধিক স্থানীয় ধানপ্রজাতি ও অন্যান্য ফসলাদি রয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে অনেক প্রজাতি এই এলাকায় আর পাওয়া যায় না। কৃষিকাজে আমি কখনও রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করিনি। আমি নিজেই কম্পোস্ট সার ও জৈব বালাইনাশক তৈরি করে জমিতে প্রয়োগ করেছি। বর্তমানে আমার একটি নার্সারি রয়েছে যেখানে বিভিন্ন ওষুধি ও ফলদ গাছসহ অন্যান্য বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির গাছের চারাও রয়েছে। আমার এই নীরব পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দৈনিক প্রথম আলোয় আমার সংরক্ষণ কাজের ওপর ভিত্তি করে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এই নিবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আমার সাথে অনেকে যোগাযোগ করেছেন, আমারা কাজ দেখতে এসেছেন। বলতে পারেন আমরা জীবনটাই পাল্টে গেছে!
বারসিক নিউজ.কম: পরিবেশ পদক প্রাপ্তিতে আপনার পরিবারের সদস্যদের অনুভুতি কি?
মো. ইউসুফ মোল্লা: তারা খুবই আনন্দিত। পরিবেশ পদকের জন্য আমার মনোনয়নের সংবাদ জানার পর থেকে আমার পরিবারের সদস্য নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেছে। তারা নানাভাবে এই সংবাদ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি আমার গ্রাম ও অন্যান্য গ্রাম থেকে অনেকে এই আনন্দের সাথে শামিল হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা আমাকে বলেছে যে, এতদিন তারা আমাকে যা বলেছে সেটা ছিলো সম্পূর্ণ ভুল। তারা এও বলেছে যে, এখন থেকে তারা আমার কাজের অংশ হবে, বিভিন্নভাবে এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ তারা দিয়েছে।
বারসিক নিউজ.কম: আপনার সাফল্য দেখে অন্য কৃষকরা কি আপনার কাছে আসে পরামর্শের জন্য?
মো. ইউসুফ মোল্লা: হ্যাঁ। বলতে গেলে প্রতিদিন আমার নিজের ও বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনেক কৃষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর মানুষ আমার কাছে আসে পরামর্শের জন্য, বীজের জন্য। এমনকি বিভিন্ন জেলার কৃষকরাও আমাকে বিভিন্ন সময়ে ফোন করে নানা বিষয় জানতে চায়, পরামর্শ গ্রহণ করে। স্থানীয় ও জাতীয় বেসরকারি সংগঠন, গণমাধ্যম কর্মীরাও আমার কাজ দেখতে আসে, সাক্ষাৎকার নেয়। আমি এতে অভ্যস্ত হয়েছি।
বারসিক নিউজ.কম: আপনাকে যদি নতুন প্রজন্ম ও অন্যান্য বয়সের মানুষের উদ্দেশ্য কিছু বলতে বলা হয় আপনি তাদের কী বলবেন?
মো. ইউসুফ মোল্লা: এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। প্রতিটি প্রাণের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। আমি সবাইকে বলবো, প্রকৃতি-পরিবেশকে ভালোবাসতে। আমি তাদের প্রতি আহ্বান জানাবো প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে, বন সংরক্ষণ ও রক্ষা করতে এবং সর্বোপরি প্রতিটি প্রাণের বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করতে। প্রাণবৈচিত্র্য বিলুপ্তির মাত্রা বেড়ে গেলে মানবজাতির জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানান সমস্যা দেখা দেবে। তাই আসুন প্রকৃতিকে ভালোবাসি, বিনিময়ে প্রকৃতি থেকে আমরা জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনেই লাভ করতে পারবো।
বারসিক নিউজ.কম: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মো. ইউসুফ মোল্লা: আপনাকেও ধন্যবাদ।

