সাম্প্রতিক পোস্ট

ভালোবাসার বিন্দুগুলো…

সিলভানুস লামিন

ভালোবাসি
পৃথিবীতে প্রতিটি ‘সৃষ্টিরই’ আগমন ঘটেছে ‘ভালোবাসা ও মমতার’ মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে। মানুষের সৃষ্টিও হয়েছে ভালোবাসার চরম বহিঃপ্রকাশে। সুতরাং প্রতিটি সৃষ্টির কোষের অণু ও পরামাণুতে ‘ভালোবাসা’ বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে, ভালোবাসাই হচ্ছে সব ধরনের সৃষ্টি ও প্রাণের আর্বিভাবের অর্ন্তনিহিত কারণ। মানুষ তথা প্রতিটি সৃষ্টির অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ভালোবাসার উপাদান বিদ্যমান। প্রতিটি সৃষ্টি ও প্রাণের আভ্যন্তরীণ যোগাযোগেও এই ভালোবাসাই অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। ভালোবাসা মহান, ভালোবাসা মহিমাময়, ভালোবাসা অপরূপ, ভালোবাসা নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত এবং ভালোবাসা ক্ষমাশীল। চ্যার্লি চ্যাপলিন যর্থাথই বলেছে, “ক্ষমতা তখনই আপনার প্রয়োজন হবে যখন আপনি ক্ষতিকর কোনকিছু করতে চান, অন্যথায় পৃথিবীতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য ভালোবাসাই যথেষ্ট।” প্রকৃতপক্ষেই ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায়, ক্ষমতা দিয়ে নয়। এই ভালোবাসা সন্তানের প্রতি মায়ের, ময়ের প্রতি সন্তান, পিতার প্রতি সন্তান, সন্তানের প্রতি পিতার হতে পারে, ভাইয়ের বা বোনের ভালোবাসা হতে পারে, প্রেমিক বা প্রেমিকার ভালোবাসা হতে পারে, প্রাণীর প্রতি মানুষের কিংবা মানুষের প্রতি প্রাণীর ভালোবাসা হতে পারে। এই ভালোবাসা হতে পারে প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা, মানুষের প্রতি প্রকৃতির ভালোবাসা। প্রতিটি মানুষই ভালোবাসার জন্য কাঙাল হয়, ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকে। ভালোবাসা মানুষকে শান্তি দেয়, উৎফুল্ল করে, ভালোবাসা মানুষকে আশাবাদী করে, স্বপ্ন দেখায়। ভালোবাসা মানুষকে প্রশান্তি এনে দেয়, তৃপ্ত করে। ভালোবাসা মানুষকে আনন্দ দেয়, মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। ভালোবাসা মানুষকে অনুরাগ করে তুলে, তাদের ক্রোধ প্রশমিত করে। ভালোবাসা মানুষকে আবেগীয় করে তুলে, মানুষকে অসম্ভব রকমের ভালোলাগার অনুভূতি দেয়। ভালোবাসার গুণেই মানুষ পৃথিবীর অনেক হিংস্র প্রাণীকে পোষ মানিয়েছে। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে অনেক গৃহপালিত প্রাণী মানুষকে রক্ষা করেছে, সেবা করেছে এবং উপকার করেছে। ভালোবাসা তাই মানুষসহ অন্যান্য সৃষ্টির ও প্রাণের একটি সহজাত গুণ। তবে নানা কারণে আজ মানুষের হৃদয়ে এই ভালোবাসা অনুপস্থিত। নিজের স্বার্থ হাসিল করা এবং ক্ষমতা জাহির করার মোহে পড়ে মানুষ তাদের সহজাত গুণটি হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই তো আজ মানুষ আরও হিংস্র হচ্ছে। নিজের মতো মানুষকে হত্যা করতে পিছপা হয় না। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টিকে তারা ভালোবাসতে ভুলে গেছে। মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার বৃত্তটি আজ মুছে যেতে বসেছে। নিজের কল্যাণের জন্যই এই ভালোবাসার বৃত্তটিকে মূর্ত করতে হবে মানুষকে। আমরা জানি, কোনকিছু সৃষ্টি করতে বা উদ্ভাবন করতে প্রয়োজন একটি নকশা। একটি বাড়ি নির্মিত হবে, সেতু তৈরি হবে, একটি গাড়ি তৈরি করতে হবে, একটি সূত্র উদ্ভাবন করতে হবে সেটার জন্য প্রয়োজন একটি নকশা। একটি কাগুজে নকশা তৈরি শুরু হয় একটি বিন্দু থেকে। অসংখ্য বিন্দুর যোগফলই রূপ দেয় একটি নকশার। আমরা মানুষের হৃদয়ে একটি ভালোবাসার নকশা তৈরি করতে চাই। এ্ই নকশা তৈরির জন্য আমাদের ছোট ছোট মহৎ কর্ম, উদ্যোগ, মানবিক আচরণ, সহমর্মীতা, ক্ষমাশীলতা, উপকারিতা, মহানুভবতা, অনুরাগ এক একটি বিন্দু। আমরা এই ভালোবাসার বিন্দু অংকন করতে চাই আমাদের মতো মানুষসহ প্রতিটি সৃষ্টি ও প্রাণের হৃদয় ও মনে। একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য ভালোবাসা বড্ডই প্রয়োজন! কেননা ভালোবাসাই পারবে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ ও সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখতে, তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে।

মানবিক উন্নয়নে জোর দিই
মানুষসহ অন্যান্য প্রাণ ও স্পন্দনের জীবনে ইতিবাচতক পরিবর্তন আনয়নই হচ্ছে উন্নয়ন। সঙ্গত কারণেই এই উন্নয়ন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ‘মানদণ্ন্ড’ হিসেবে বিবেচনা করে না। এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক তথা আত্মিক উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দেয়। আমরা বেশির ভাগ সময়ে উন্নয়ন বলতেই আমাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়াকে বুঝি। ফলশ্রুতিতে, নিজের আর্থিক উন্নয়ন অর্জন করার জন্য আমরা ‘যেকোন কাজ’ করতে পিছপা হই না। এই ‘যেকোন কাজ’ হতে পারে প্রাণ ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করা, আমাদের মতো মানুষকে শোষণ, নিপীড়ন ও প্রতারণা করা; এটি হতে পারে নিজের ভেতরের অন্তরাত্মাকে সাড়া না দিয়ে খুন-খারাবীতে জড়িত হওয়া। নিজের স্বার্থ তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তাই আমরা বন উজাড় করি, নদী ও জলাভূমি দখল করি, গাছ নিধন করি, প্রাণবৈচিত্র্য হরণ করি এবং ছোট-বড় প্রাণ হত্যা করি। নিজের স্বার্থ  ও ক্ষমতা জাহিরের জন্য আমরা মানসিকভাবে নির্যাতন করি আমাদের মতো মানুষকে, প্রাণীকে এমনকি উদ্ভিদসমূহকেও! তাই মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার বিন্দু অংকন করত হবে মানবিক উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে। যতবেশি মানবিক উন্নয়নে জোর দেবো ততবেশি ভালোবাসার বিন্দু অংকিত হবে মানুষের হৃদয়ে। এছাড়া ভালোবাসার বিন্দুগুলোর সংখ্যা যত বাড়বে তত বেশি সংবেদনশীল হবে মানুষ। যেহেতু মানুষসহ প্রতিটি সৃষ্টিই ভালোবাসার উপাদান দিয়ে সৃষ্টি তাই মানুষের অন্তরের অন্তস্থল থেকে এই ভালোবাসাকে জাগ্রত করার জন্য এই মানবিক উন্নয়ন সাধন করতেই হবে। মানবিক উন্নয়নের একেকটি রূপ হতে পারে অন্যের সাথে আমাদের মিথষ্ক্রিয়ায়, আচার, আচরণ ও ব্যবহার আরও সংবেদনশীল করা, আরও যত্নশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলা। আমরা মানুষেরা নিজের জীবিকা অর্জনের জন্য নানান কাজের সাথে জড়িত। আমরা কেউ উন্নয়ন সংগঠনে কাজ করি, কেউ ব্যবসা করি, সরকারি চাকুরি করি। আমরা কেউ উকিল, ডাক্তার, সাংবাদিক, রাজনীতিক, কৃষক, জেলে, তাঁতী, পরিবহণ শ্রমিক, দিনমজুর। আমাদের এসব কাজের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে নিজ তথা সমাজ ও দেশের উন্নয়ন করা। মোদ্দা কথা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা। মানবিক উন্নয়নে আমরা কি জোর দিই? আমার কথা, আচরণ মানুষকে কষ্ট দেয় কি না, আমি আমার মতো মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করি কি না, কিংবা মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসার চোখে দেখি কি না। নাকি সেগুলোকে শুধুমাত্র ভোগবস্তু এবং ধ্বংস করার উপাদানই মনে করি। পর্যালোচনা করে দেখতে হবে আমাদের নিজের ভেতরে মানবিক যে একটি চোখ আছে সেটি কোন অবস্থায় আছে? এই মানবিক চোখটি কি আজ খুব বেশি ঝাপসা হয়েগেছে? যদি তাই হয় তাহলে নিজেকে এবং পৃথিবীকে রক্ষার জন্য এই মানবিক চোখকে স্পষ্ট ও উজ্জল করতে হবে। তা না হলে আমাদের নির্মমতায় অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে এই পৃথিবী! তাই আসুন আমাদের মানবিক চোখকে স্পষ্টতর ও উজ্জল করি, সবাইকে আপন করে নিই। এই আপন করে নেওয়ার মাধ্যমে আমরা মানুষসহ প্রতিটি প্রাণ ও সৃষ্টির হৃদয়ে ভালোবাসার বিন্দু অংকন করি। ভালোবাসায় ভরপুর করে তুলি এই পৃথিবীকে।

আরাধনা করি বৈচিত্র্যকে
আমরা মানুষ বিচিত্র, বিচিত্র আমাদের চিন্তা, ভাবনা ও সৃষ্টিগুলো। আমাদের মতো পৃথিবীর অন্যান্য সৃষ্টিগুলোও বৈচিত্র্যময়। একটু পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যায়, প্রকৃতিতে শুধুমাত্র পাখি, জীবজন্তুর নানান রূপ, রঙ, আকার, আচরণ, কণ্ঠ, সুর, খাবার, গান এবং জীবনপ্রণালী রয়েছে। চোখ মেলেই আমরা দেখতে নানান বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ; প্রতিটিই অনন্য, প্রতিটিরই বিভিন্ন রঙ, রূপ, গন্ধ, গঠন, আকার, জীবনপ্রণালী রয়েছে। বনে কোটি কোটি ধরনের ছোট্ট বড় উদ্ভিদ চোখে পড়ে, কোনটা বড়, কোন ছোট, কোনটার রঙ সবুজ, কোনটার রঙ লাল, হলুদ, বেগুনী। আমরা দেখতে পাই বিশাল সমুদ্র, উদার আকাশ, দুর্গম পাহাড়, খাদ, গিরি, দেখতে পাই ক্ষুদ্রকায় প্রাণী পিঁপড়া থেকে শুরু প্রকান্ড হাতি পর্যন্ত। আমরা দেখতে পাই নানান ধরনের মৃত্তিকার গঠন, রঙ, উৎপাদনশীলতা, দেখতে পাই উদ্ভিদের নানান ধরনের ও রঙের ফল, ফুল। বৈচিত্র্য বলতে যেমন সৃষ্টির ভিন্নতাকে বুঝায়, জীবনের গঠন ও জীবনপ্রণালীর পার্থক্য বুঝায়, প্রকৃতির পরতে পরতে পরিলক্ষিত পরিবর্তন বুঝায় ঠিক তেমনি মানুষের চিন্তা-ভাবনা, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, অনুধাবনের পার্থক্যকেও বুঝায়। প্রকৃতপক্ষে, বৈচিত্র্যকে সংজ্ঞার ভেতরে আটকে রাখা যায় না, ভাষায় বর্ণনা করা যায় না, একে কেবল অনুভব করা যায়। এই বৈচিত্র্যের গুণেই আজ আমরা মানুষেরা বেঁচে আছি, সুস্থ আছি এবং ক্রমান্বয়ে উন্নতি করছি। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই এই বৈচিত্র্যকে সুরক্ষা করা প্রয়োজন। এ কাজ কোনভাবেই কষ্টসাধ্য নয়। কেননা, আমাদের সৃষ্টিই হয়েছে ভালোবাসা দিয়ে। আমাদের পরম ভালোবাসায় ও মমতায় পৃথিবীর অসংখ্য বৈচিত্র্যময় প্রাণ ও স্পন্দন রক্ষা পেতে পারে। আমরা যদি বৈচিত্র্যকে ভালোবাসি, বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যকে আরাধনা করি তাহলে এসব বৈচিত্র্য নিধনে আমরা অংশ নেব না। কেউ যাতে এ বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি ও প্রাণকে ধ্বংস করতে না পারে সেদিকেও নজর দেবো। আসুন আমরা বৈচিত্র্যকে আরাধনা করি, বৈচিত্র্যময় প্রাণ, সৃষ্টি ও স্পন্দকে রক্ষা করি। আমরা যদি বৈচিত্র্যকে আরাধনা করি, সুরক্ষা দিই তাহলে মানুষসহ প্রতিটি প্রাণ ও প্রকৃতিতে আমরা ভালোবাসার এক একেটি বিন্দু অংকন করি; ভালোবাসায় স্নাত হবো আমরা ও প্রকৃতি।

ইতিবাচক হই
অনেকে অভিযোগ করেন যে তাদেরকে কেউ ভালোবাসে না। ভালোবাসা না পাওয়ায় তারা ক্রমশই হিংস্র হয়ে উঠেছেন, হিংসুটে হচ্ছেন এবং হতাশ হচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃতিতে অনেক প্রাণ ও সৃষ্টি আছে যারা কোনদিনও ভালোবাসা চায়নি মানুষের কাছে বরং অকাতরে তারা মানুষকে ভালোবাসা দিয়েছে। তাদের দিকে আমরা তাকাতে পারি না? অন্যদিকে আমি যখন বলি যে, আমাকে কেউ ভালোবাসে না তখন আমি কি কোনদিন আত্মসমালোচনা করে দেখেছি যে আমি কাউকে ভালোবাসা দিয়েছি? আমি ভালোবাসা পেতে চাই অথচ আমি নিজে দেবো না তা কি করে হয়? আমিই ভালোবাসতে শুরু করি না কেন? আমি যদি ভালোবাসতে শুরু করি একদিন না একদিন আমি ভালোবাসা পাবোই। মাদার তেরেসা যর্থাথই বলেছেন, “তুমি ভালোবাসো, ভালোবাসা পাবে”। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আমরা শিখতে পারি। প্রকৃতির গাছপালা, ঝরনা, নদী কোনদিনও ভালোবাসা চায়নি কারও কাছে। তারা কি ভালো আছে না? বরং আমরা মানুষেরাই তাদের ভালো থাকাকে নষ্ট করেছি। প্রকৃতির পাখি, উদ্ভিদ আমাদের নানান উপকার করে গেছে কিন্তু বিনিময়ে আমাদের কাছে তারা কোনকিছু প্রত্যাশা করে না। তারা নিরন্তর আমাদের সেবা করে গেছে। তাই আমাদের ইতিবাচক হতে হবে। কেউ ভালো না বাসলেও আমরা ভালোবেসে যাবো সবাইকে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে ভালোবাসবো, সুরক্ষা দেবো। ভালোবাসা নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত। তাই স্বার্থ হাসিল বা শর্ত আরোপ করে কাউকে ভালোবাসা যায় না; এটা প্রকৃত ভালোবাসাও নয়। প্রকৃত ভালোবাসা কোনকিছু প্রত্যাশা না করে অন্যের মঙ্গল, কল্যাণ ও শুভ কামনা করে। যেমন মানুষের প্রতি প্রকৃতির ভালোবাসা। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রকৃতি নিঃশর্ত ও নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে ভালোবেসে গেলেও আজ মানুষ সেটা উপলদ্ধি করতে শুরু করেছে! তাই বন রক্ষা, নদী রক্ষা, পাখি রক্ষা, জলাভূমি রক্ষা, গাছ রক্ষাসহ নানান উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী মানুষ নিচ্ছে। তাই আসুন কোনকিছু আশা না করে ভালোবেসে যাই। কে জানে, একদিন না একদিন হয়তো এই ভালোবাসার প্রতিদানও পেতে পারি।

সুরক্ষা করি প্রতিটি সৃষ্টিকে
আমরা মানুষ বাঁচতে চাই। উন্নতি চাই। চাই সফলতাও। আমরা স্বপ্ন দেখি, কল্পনা করি এবং প্রত্যাশা করি একটি সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন। এই স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দেওয়ার জন্য, কল্পনাকে রূপায়ন করার জন্য কিংবা প্রত্যাশার ফুলকে প্রষ্ফুটিত করার জন্য্ আমরা নানান কাজ করি। কখনও সফল হই, কখনওবা ব্যর্থ হই। সফলতা আমাদেরকে উৎসাহিত করে সামনে এগুনোর, আরও সফল হওয়ার এবং আরও উন্নতি করার। অন্যদিকে ব্যর্থতা আমাদেরকে কুড়ে কুড়ে আঘাত করে, হতাশাগ্রস্ত করে তুলে এবং আমাদের ভেতরের সম্ভাবনাকে ভোঁতা করে দেয়। সফল হতে গেলে ব্যর্থতার সাথে সন্মুখ সমরে যুদ্ধ করতে হয়। কিছু মানুষ আছেন যারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেন, অন্যদের জীবনকেও ঝুঁকিগ্রস্ত করে তুলেন। আবার কিছু মানুষ আছেন যারা ব্যর্থ হলেও কখনও ক্ষান্ত হন না, পিছপা হন না এবং নিরুৎসাহিত হন না! আমরা সেই মানুষের দলে থাকতে চাই, যারা হতাশ হলেও হতাশাকে ঝেড়ে ফেলে সামনে এগুতে চান। আমরা সেই মানুষের তালিকাভুক্ত হতে চাই যারা অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রাণপন চেষ্টা করেন, যারা দুর্ভেদ্যকে ভেদ করার জন্য প্রয়োজনীয় পন্থা বের করার প্রচেষ্টা চালান, যারা অসম্ভব সাহসে দুর্গমকে জয় করতে চান এবং প্রতিকূলতাকে আলিঙ্গন করেই সামনের পথে এগিয়ে যান। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি আমরা মানুষ যে উন্নতি সাধন করেছি অন্য আর কোন ‘সৃষ্টি’ সেটা করতে পারেনি। এই উন্নয়ন কিন্তু আমরা মানুষ শক্তির জোরে করিনি, করেছি বৃদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এবং আমাদের ভালোবাসা ও মমতার অস্ত্রকে প্রয়োগ করে। তাই তো আমরা জীবনযাত্রাকে সহজ করার জন্য যেমন সৃষ্টি করেছি অসংখ্য ‘সৃষ্টি’, উদ্ভাবন করেছি নানান প্রযুক্তি ঠিক তেমনি পরম মমতা ও ভালোবাসায় পোষ মানিয়েছি অসংখ্য হিংস্র প্রাণীকেও! বস্তুত, আমরা মানুষ ইচ্ছা করলে কঠিনকে যেমন সহজ করতে পারি ঠিক তেমনি সহজকেও হীরকের মতো কঠিন করে তুলতে পারি। আমরা ইচ্ছা করলে, মানুষসহ অন্য প্রাণসমূহের জীবনকে সুখ, আনন্দ ও ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলতে পারি। আমরা ইচ্ছা করলে, দানবের রূপ ধারণ করে সৃষ্টির সবকিছুকে তছনছ করতে পারি। তবে আমাদের সৃষ্টির পেছনে ভালোবাসার অবদান সবচে’ বেশি। তাই আসুন আমরা ভালোবাসি, কঠিন মন ও হৃদয় যাদের তাদের কোমল করি। ভালোবাসার বিন্দু অংকন করি তাদের হৃদয়ে। ভালোবাসার এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা এই পৃথিবীকে ভালোবাসায় ভরপুর করে তুলি। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়েই মানুষসহ প্রতিটি সৃষ্টি ও প্রাণ উপভোগ করুক পৃথিবীর সুধা।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: