সাম্প্রতিক পোস্ট

খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষক নেতৃত্বে এগ্রোইকোলজির অভিজ্ঞতা ও রূপান্তর

মো. শহিদুল ইসলাম, রাজশাহী থেকে

বর্ষার সকাল। রাতভর বৃষ্টির পর বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটিতে জমে থাকা পানির ছোট ছোট রেখা ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার খরিবোনা গ্রামের দিকে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বরেন্দ্র অঞ্চলকে যারা শুধু খরা, অনাবৃষ্টি আর পানির সংকটের ভূখন্ড হিসেবে চেনেন, তাদের জন্য এই দৃশ্য কিছুটা বিস্ময়ের। গ্রামের প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে বাড়ির আঙিনাজুড়ে সবুজের সমারোহ। বাঁশের মাচায় ঝুলছে দেশি শিম, উঠানের এক পাশে পেঁপে, অন্যপাশে কাসাভা, কোথাও সজিনা, কোথাও দেশি মরিচ, আবার ছোট ছোট কৌটায় শুকানো হচ্ছে পরবর্তী মৌসুমের বীজ। একটি বাড়ির পাশে কয়েকজন কৃষাণী ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি করছেন। অন্য একটি উঠানে বড় ড্রামের ভেতর নিমপাতা, মেহগনির ফল, গোমূত্র ও স্থানীয় ভেষজ উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে জৈববালাই। আশপাশে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশি মুরগি। দৃশ্যগুলো আলাদা আলাদা নয়; যেন একটি সুসংহত কৃষি-বাস্তুতন্ত্রের অংশ।

২০২৬ সালের জুন মাসে তিন দিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার খরিবোনা, নুরপুর, গোলাবাড়ি, বেলপুকুর, পাইকড়া ও কসবা গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয়। উদ্দেশ্য ছিল মাঠ পর্যায়ে কৃষক নেতৃত্বে এগ্রোইকোলজির বাস্তব চর্চা পর্যবেক্ষণ করা। এই সফর কোনো প্রকল্প মূল্যায়ন ছিল না; বরং একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা খরাপ্রবণ অঞ্চলে কৃষকেরা নিজেদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় সম্পদের ওপর ভর করে কীভাবে একটি বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলছেন?

তিন দিনের এই পর্যবেক্ষণ আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। কারণ এখানে আমি কোনো প্রস্তুত প্রযুক্তি দেখিনি; দেখেছি একটি দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়া। দেখেছি কৃষকের জ্ঞানকে কেন্দ্র করে কৃষির পুনর্গঠন। দেখেছি হারিয়ে যাওয়া বীজের ফিরে আসা। দেখেছি নারীর হাতে খাদ্য সার্বভৌমত্বের নতুন ভিত্তি নির্মাণ। দেখেছি গ্রামের মানুষ নিজেরাই প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার পুনরুদ্ধার করছেন। সবচেয়ে বড় কথা, দেখেছি কৃষকেরা আবার নিজেরাই নিজেদের পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এই পরিবর্তনের পেছনে একজন গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রীর নাম বারবার উঠে এসেছে-গাইবান্ধার কৃষক গবেষক মো. রায়হান কবির রঞ্জু। কিন্তু খুব দ্রুতই বুঝলাম, এই গল্প একজন মানুষের নয়। এটি শত শত কৃষক-কৃষাণীর সম্মিলিত গল্প, যেখানে একজন কৃষক গবেষক কেবল একটি প্রক্রিয়ার সূচনা করেছেন; আর সেই প্রক্রিয়াকে নিজের করে নিয়েছেন স্থানীয় মানুষ।

খরার বাস্তবতা থেকে বিকল্প পথের সন্ধান

বরেন্দ্র অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে খরাপ্রবণ কৃষি অঞ্চলগুলোর একটি। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং মাটির জৈব পদার্থের ঘাটতি এখানকার কৃষিকে ক্রমশ অনিশ্চিত করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকেরা জানালেন, একসময় মৌসুম সম্পর্কে তাদের যে অভিজ্ঞতা ছিল, এখন তা আর কাজ করে না। কখন বৃষ্টি হবে, কখন বীজতলা তৈরি করতে হবে, কখন চারা রোপণ করলে ভালো হবে সব হিসাব যেন বদলে গেছে। জলবায়ুর এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারনির্ভর কৃষির চাপ। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড বীজের বিস্তারের ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে স্থানীয় খরাসহনশীল বহু জাত। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষকের ঝুঁকি কমেনি।

খরিবোনা গ্রামের প্রবীণ কৃষকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বারবার ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া বীজের স্মৃতি। তারা বলছিলেন, একসময় প্রতিটি পরিবারেই নিজস্ব বীজ সংরক্ষণের সংস্কৃতি ছিল। এক বাড়িতে এক ধরনের ধান, অন্য বাড়িতে আরেক ধরনের শিম বা মরিচ। মৌসুম শেষে বীজ বিনিময় ছিল সামাজিক সম্পর্কের অংশ। সেই ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার ফলে কৃষকেরা শুধু বীজ হারাননি; হারিয়েছেন কৃষি সম্পর্কে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ২০১৩ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলের খরিবোনা গ্রামে কাজ শুরু করেন কৃষক গবেষক রায়হান কবির রঞ্জু। তিনি কোনো নতুন প্রযুক্তির প্রচার দিয়ে শুরু করেননি। বরং কৃষকদের সঙ্গে বসে জানতে চেয়েছেন-কোন বীজগুলো হারিয়ে গেছে, কোনগুলো এখনো কারও ঘরে টিকে আছে, কোন জাত খরা ভালো সহ্য করত, কোন শিমের স্বাদ ভালো ছিল, কোন ধানের খড় গবাদিপশুর জন্য উপযোগী ছিল। এই প্রশ্নগুলোই পরে কৃষক নেতৃত্বে গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে।

গবেষণাগার নয়, কৃষকের মাঠই গবেষণার ক্ষেত্র

ঞ্জুর কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো-তিনি গবেষণাকে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গন্ডি থেকে বের করে কৃষকের মাঠে নিয়ে এসেছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা দেশি ধান, শিম, মরিচ, বেগুন, মসলা ও অন্যান্য ফসলের বীজ কৃষকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। একজন কৃষক একটি জাত, অন্যজন আরেকটি জাত পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করেন। মৌসুম শেষে সবাই মিলে ফলাফল বিশ্লেষণ করেন। কোন জাত খরা সহ্য করেছে, কোনটিতে রোগ কম হয়েছে, কোনটির স্বাদ ভালো, কোনটি পরিবার পছন্দ করেছে-এসব মূল্যায়ন করেছেন কৃষকেরাই।

ই প্রক্রিয়াটি আসলে কৃষক নেতৃত্বে প্রায়োগিক গবেষণার একটি বাস্তব উদাহরণ। এখানে কৃষক কোনো প্রযুক্তির গ্রহীতা নন; তিনি গবেষক, উদ্ভাবক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। গত এক দশকেরও বেশি সময়ে কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে প্রায় ৩০টি দেশি ধানের জাত নিয়ে মাঠ গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে জামাই সোহাগী, রাধুনিপাগল এবং সোহাগ-৪ স্থানীয়ভাবে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। খরা সহনশীলতা, রোগ-পোকার তুলনামূলক কম আক্রমণ এবং স্বাদের কারণে কৃষকেরা এই জাতগুলোকে নিজেদের সংগ্রহে ফিরিয়ে এনেছেন। রহনপুর এলাকার কৃষক আশরাফুল ইসলাম চার বিঘা জমিতে জামাই সোহাগী ধানের চাষ করেছেন। চাষের অভিজ্ঞতায় তিনি বললেন, “এই ধানের চালের সুগন্ধ আলাদা। খেতেও খুব সুস্বাদু। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের এলাকার খরার মধ্যেও ভালো হয়। তাই এখন আমি শুধু নিজের জন্য নয়, অন্য কৃষকদের দেওয়ার জন্যও বীজ রেখে দিই।” আশরাফুলের এই বক্তব্যে বীজ সার্বভৌমত্বের মূল দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বীজ এখানে আর বাজারের পণ্য নয়; এটি কৃষকের নিজের সম্পদ।

বীজের সঙ্গে ফিরে এসেছে আত্মবিশ্বাস

খরিবোনা ও আশপাশের গ্রামগুলো ঘুরে আমার কাছে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক যে বিষয়টি মনে হয়েছে, তা হলো-কিছু বীজ আবার মানুষের ঘরে ফিরছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছোট ছোট কৌটায়, কাপড়ের থলেতে কিংবা কাঁচের বোতলে যতœ করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ধান, শিম, মরিচ, মসলা ও সবজির বীজ। এগুলো শুধু পরবর্তী মৌসুমের জন্য নয়; এগুলো একটি কৃষি-ঐতিহ্যের ধারক।

খরিবোনা গ্রামের কৃষক আজিজুল রহমান শুরু থেকেই দেশি মসলা নিয়ে কৃষক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। তার বাড়িতে গিয়ে দেখি, এখনও তিনি মেথি, জোয়ান, কালোজিরা, মিষ্টি সজ, সলুকসহ ছয় ধরনের দেশি মসলার বীজ সংরক্ষণ করে রেখেছেন। শুধু নিজের জমিতে চাষই করেন না, প্রতিবছর এলাকার কৃষকদের মধ্যেও বীজ বিনিময় করেন। তিনি বললেন, “একসময় মনে হয়েছিল এই বীজগুলো আর থাকবে না। এখন আবার মানুষ খুঁজে আসে। আমি বীজ দিই, তারা চাষ করে, পরে আবার অন্যদের দেয়। এভাবেই বীজ বেঁচে থাকে।” এই কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল, বীজ আসলে শুধু একটি কৃষি উপকরণ নয়; এটি একটি সামাজিক সম্পর্ক। একজন কৃষকের ঘরে সংরক্ষিত বীজ আরেকজন কৃষকের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি হতে পারে। এভাবেই গড়ে ওঠে সম্প্রদায়ভিত্তিক বীজ ব্যবস্থা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সময় স্থানীয় অভিযোজন ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।

আঙিনার কৃষি, পরিবারের খাদ্য

এই সফরে আমার সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল বাড়ির আঙিনাগুলো। উন্নয়ন পরিকল্পনায় যেসব আঙিনাকে প্রায়ই গুরুত্ব দেওয়া হয় না, সেই আঙিনাই এখানে খাদ্য, পুষ্টি, বীজ সংরক্ষণ এবং কৃষি জীববৈচিত্র্যে কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। খরিবোনা গ্রামের কৃষাণী শাহানা বেগম আমাকে তার উঠান ঘুরে দেখালেন। পেঁপে, শাকসবজি, দেশি শিম, মসলা-সব মিলিয়ে যেন একটি ছোট কৃষি-বাস্তুতন্ত্র।

হেসে তিনি বললেন, “আমি দুই বিঘা জমিতে সম্পূর্ণ জৈবসার আর জৈববালাই ব্যবহার করে পেঁপে চাষ করেছি। বাড়িতেই জৈবসার বানাই। নিজের জমিতে ব্যবহার করার পর অতিরিক্ত সার বিক্রি করেও মাসে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হয়। আগে বাড়ির আশপাশের জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকত। এখন দেখেন-কত দেশি সবজি করেছি। এগুলো আমরা নিজেরা খাই, আবার বিক্রিও করি।” শাহানার এই কথার মধ্যে এগ্রোইকোলজির একটি মৌলিক দর্শন লুকিয়ে আছে। এখানে উৎপাদনের প্রথম লক্ষ্য বাজার নয়; পরিবারের পুষ্টি। উদ্বৃত্ত অংশ বাজারে যায়। অর্থাৎ খাদ্য আবার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ফিরে এসেছে।

জৈবসার, জৈববালাই মাটির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন

শাহানা বেগমের উঠান থেকে বেরিয়ে আমরা পাশের আরেকটি বাড়িতে যাই। সেখানে একটি বড় ছাউনির নিচে সারি সারি ভার্মিকম্পোস্টের বেড। কেঁচো নড়াচড়া করছে, পাশে শুকিয়ে রাখা হয়েছে প্রস্তুত জৈবসার। অন্য পাশে একটি নীল রঙের ড্রামে নিমপাতা, নিমবীজ, মেহগনির ফল, বিষকাটালি, গোমূত্র এবং স্থানীয় আরও কয়েকটি উদ্ভিদের নির্যাস মিশিয়ে জৈববালাই প্রস্তুত করা হচ্ছে। কৃষকেরা বললেন, এগুলো এখন আর কোনো পরীক্ষামূলক বিষয় নয়; তাদের দৈনন্দিন কৃষি ব্যবস্থার অংশ। কৃষি গবেষক রঞ্জুর তথ্য এবং পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, বর্তমানে প্রায় ৪০ জন কৃষক নিয়মিতভাবে ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন করছেন। অনেকেই নানা ধরনের কম্পোস্ট, কুইক কম্পোস্ট এবং অন্যান্য জৈবসারও তৈরি করেন। নিজের জমিতে ব্যবহার করার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সার বিক্রি করেন অথবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিনিময় করেন। একইভাবে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কৃষকেরা স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের জৈববালাই তৈরি করছেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। আগে কৃষকেরা পোকা দেখা মাত্র বাজার থেকে রাসায়নিক কীটনাশক কিনে আনতেন। এখন তারা প্রথমে নিজের তৈরি জৈববালাই ব্যবহার করেন। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় কমেছে, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষিত হচ্ছে, মাটির জীববৈচিত্র্য ফিরে আসছে এবং কৃষকেরা বাইরের বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পেরেছেন।

বরেন্দ্রের মতো খরাপ্রবণ অঞ্চলে এই পরিবর্তনের আরেকটি বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য রয়েছে। জৈবসার মাটির জৈবপদার্থ বৃদ্ধি করে, মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং অণুজীবের কার্যক্রমকে সক্রিয় করে। ফলে দীর্ঘ সময় মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখা সম্ভব হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যখন খরার সময়কাল দীর্ঘ হচ্ছে, তখন এই ধরনের কৃষি ব্যবস্থাই অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ জৈবসার এখানে কেবল সার নয়; এটি জলবায়ু অভিযোজনের একটি কার্যকর স্থানীয় কৌশল।

কৃষি প্রাণবৈচিত্র্যএকই জমিতে বহু জীবনের সহাবস্থান

এই অঞ্চলের এগ্রোইকোলজি চর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কৃষি প্রাণবৈচিত্র্যে পুনরুদ্ধার। রঞ্জু ও স্থানীয় কৃষকদের উদ্যোগে গত এক দশকের বেশি সময়ে শুধু ধান নয়, বিভিন্ন দেশি শস্য ও সবজির ওপরও কৃষক নেতৃত্বে গবেষণা হয়েছে। প্রায় ১০ জাতের দেশি মসলা, ৫টি দেশি শিম, ২০টি দেশি বেগুন, ২০টি দেশি মরিচ এবং ৭টি কাসাভা ছাড়াও বিভিন্ন দেশি সবজির চাষ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক চাষ করা হয়েছে। সব জাত সমানভাবে সফল হয়নি, কিন্তু যেগুলো স্থানীয় পরিবেশে ভালো অভিযোজিত হয়েছে, সেগুলো কৃষকেরা নিজেরাই নির্বাচন করে বিস্তার করেছেন। গোলাবাড়ি গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম এখন নিয়মিত লাল মটরি, সবুজ মটরি ও ঘিত্তকলী জাতের দেশি শিম চাষ করেন। তার উঠানের মাচা দেখিয়ে তিনি বললেন, “এই শিমগুলো ধরে বেশি, খেতেও ভালো। সবচেয়ে বড় কথা, আমি নিজের বীজ নিজেই রাখি। প্রতিবছর আর বাজার থেকে বীজ কিনতে হয় না।” মনিরুলের কথায় শুধু উৎপাদনের হিসাব নেই; আছে স্বাধীনতার অনুভূতি। কৃষকের কাছে বীজের মালিকানা ফিরে আসা মানে কৃষকের কাছে ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসা। একইভাবে কাসাভা, দেশি বেগুন, দেশি মরিচ, গড় আলু, সজিনা, মিষ্টিকুমড়া, ওল ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন দেশি ফসল আজ ২৬টি গ্রামের প্রায় চার হাজার পরিবারের খাদ্য তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। এই বৈচিত্র্য শুধু খাদ্যের স্বাদ বাড়ায় না; জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও কমায়। কারণ একটি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য ফসল পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে পারে। এগ্রোইকোলজির ভাষায় একে বলা হয় বৈচিত্র্যের মাধ্যমে স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলা।

দেশি মুরগিছোট উদ্যোগ, বড় পরিবর্তন

গ্রামের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে পর্যবেক্ষিত প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একটি বিষয় চোখে পড়ে-দেশি মুরগির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন জাতের দেশি মুরগি, কোনটির গলাছিলা, কোনটির পা ছোট, কোনটির পা বড়, পাল লম্বা আবার কোনটির মাথায় খোপা। রঞ্জু গাইবান্ধা থেকে খোপানাশি দেশি জাতের মুরগি এনে প্রথমে কয়েকজন কৃষকের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে পালন শুরু করেন। পরে কৃষক-থেকে-কৃষকে বাচ্চা বিনিময়ের মাধ্যমে এই জাতটি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় শতাধিক পরিবার এই জাতের মুরগি পালন করছে। খরিবোনা গ্রামের রুবিনা বেগম মুরগিগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই মুরগির রোগ কম হয়, ডিমও বেশি দেয়। আমাদের এলাকার আবহাওয়া ভালো সহ্য করে। তাই এখন এই জাতই বেশি পালন করি।” প্রথম দৃষ্টিতে এটি হয়তো একটি ছোট উদ্যোগ মনে হতে পারে। কিন্তু কৃষি-বাস্তুতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশি মুরগি পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করছে, অতিরিক্ত ডিম বিক্রির মাধ্যমে নারীর হাতে নগদ অর্থ আসছে, একই সঙ্গে মুরগির বিষ্ঠা আবার কম্পোস্ট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ একটি উদ্যোগ আরেকটি উদ্যোগকে শক্তিশালী করছে। এটাই এগ্রোইকোলজির বৈশিষ্ট্য, কোনো উপাদান আলাদা নয়; সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

কৃষকের অধিকার জলবায়ু ন্যায্যতার বাস্তব চর্চা

এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। অনেক সময় এগ্রোইকোলজিকে শুধু জৈব কৃষি বা রাসায়নিকবিহীন চাষাবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এসে স্পষ্ট হয়েছে-এগ্রোইকোলজি মূলত অধিকার, ন্যায্যতা এবং স্থানীয় সম্পদের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। নাচোলের কয়েকটি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের পুকুরগুলো বাইরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা লিজ নিয়ে ব্যবহার করতেন। ফলে গ্রামের মানুষ নিজেদের পুকুরে মাছ ধরতে পারতেন না, অনেক ক্ষেত্রে সেচ কিংবা গৃহস্থালির কাজেও বাধার মুখে পড়তেন। প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রামের ভেতরে থাকলেও তার নিয়ন্ত্রণ ছিল গ্রামের বাইরে। স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত প্রচেষ্টা, আলোচনা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে নুরপুর, বেলপুকুর, পাইকড়া ও কসবা গ্রামের চারটি পুকুরের ব্যবহারিক অধিকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে ফিরে আসে। নুরপুর গ্রামের সালাউদ্দিন পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “আগে নিজের গ্রামের পুকুরে আমরা মাছ ধরতে পারতাম না। এখন নিজেরাই মাছ চাষ করি, নিজেরা মাছ খাই, পানি ব্যবহার করি। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সুবিধা।” সালাউদ্দিনের কথায় শুধু একটি পুকুরের গল্প নেই; আছে সামষ্টিক প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মানুষের অধিকার ফিরে পাওয়ার গল্প। জলবায়ু ন্যায্যতা শুধু বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ নিয়ে নয়; এটি স্থানীয় মানুষের পানি, জমি, বীজ, বন ও জলাশয়ের ওপর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও। বরেন্দ্রের এই অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে

একটি সামাজিক আন্দোলনের বিস্তার

২০১৩ সালে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে, আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে ২৬টি গ্রামে। প্রায় চার হাজার পরিবার অন্তত নিজেদের পরিবারের জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করছে। শত শত পরিবার দেশি বীজ সংরক্ষণ করছে। কৃষকেরা নিজেরাই বীজ বিনিময় করছেন, জেবসার তৈরি করছেন, স্থানীয় জাত নির্বাচন করছেন, নতুন কৃষকদের শেখাচ্ছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই পরিবর্তন কোনো ভর্তুকিনির্ভর বা প্রকল্পনির্ভর ব্যবস্থা নয়। এটি মানুষের জ্ঞান, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক শেখার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই কারণেই এর স্থায়িত্বের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

কৃষকের নেতৃত্বে এগ্রোইকোলজিএকটি বিকল্প উন্নয়ন দর্শনের বাস্তব রূপ

খরিবোনা, নুরপুর, গোলাবাড়ি, পাইকড়া কিংবা কসবা-যে গ্রামেই গেছি, একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে। এখানে কৃষকেরা কোনো প্রকল্পের ‘বেনিফিশিয়ারি’ নন। তারা উন্নয়নের দর্শকও নন। তারা নিজেরাই গবেষক, শিক্ষক, উদ্ভাবক এবং পরিবর্তনের নেতৃত্বদানকারী। আজ আন্তর্জাতিক পরিসরে কৃষক নেতৃত্বে এগ্রোইকোলজি নিয়ে যে আলোচনা চলছে, বরেন্দ্রের এই অভিজ্ঞতা তার একটি বাস্তব উদাহরণ। এখানে কৃষকরা শুধু প্রযুক্তি গ্রহণ করেন না; নিজেরা পরীক্ষা করেন, ফলাফল মূল্যায়ন করেন, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেন, নতুন জাত নির্বাচন করেন এবং সেই জ্ঞান অন্য কৃষকের কাছে পৌঁছে দেন। জ্ঞান এখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পদ নয়; এটি একটি সামাজিক সম্পদ, যা ক্রমাগত বিনিময়, পরিমার্জন এবং সম্প্রসারিত হয়। কৃষক গবেষক রায়হান কবির রঞ্জুর ভূমিকা এখানেই অনন্য। তিনি কোনো প্রযুক্তি বিক্রি করেননি, কোনো প্রস্তুত সমাধানও চাপিয়ে দেননি। বরং তিনি এমন একটি শিক্ষণ-প্রক্রিয়া তৈরি করেছেন, যেখানে কৃষকের নিজস্ব জ্ঞানকে সম্মান করা হয়েছে। কৃষকেরা নিজেদের বাস্তবতা থেকে শিখেছেন, নিজেরাই পরীক্ষা করেছেন, নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই আজ যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, সেটি মূলত কৃষকদেরই অর্জন। এই প্রক্রিয়ায় কৃষক ও কৃষাণীদের মধ্যে পারস্পরিক শেখার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এক গ্রামের সফল অভিজ্ঞতা অন্য গ্রামে পৌঁছেছে। একজনের ঘরে সংরক্ষিত বীজ আরেকজনের মাঠে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একজন কৃষাণীর তৈরি জৈবসারের অভিজ্ঞতা আরেকজনকে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই জ্ঞান প্রবাহই একটি জীবন্ত এগ্রোইকোলজি আন্দোলনের ভিত্তি।

এগ্রোইকোলজি মানে শুধু রাসায়নিকমুক্ত কৃষি নয়

বাংলাদেশে এখনো অনেকের কাছে এগ্রোইকোলজি মানেই রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া কৃষিকাজ বা জৈব কৃষি। কিন্তু বরেন্দ্রের মাঠে কৃষকদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর উপলব্ধি হয়, এগ্রোইকোলজি আসলে তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত একটি সামাজিক, পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া। এখানে এগ্রোইকোলজি শুরু হয় মাটির স্বাস্থ্য পুনর্গঠনের মাধ্যমে, কিন্তু সেখানেই শেষ হয় না। এটি হারিয়ে যাওয়া দেশি বীজ ও স্থানীয় জাতের পুনরুদ্ধার, কৃষি প্রাণবৈচিত্র্যের সংরক্ষণ, স্থানীয় জ্ঞান ও কৃষকের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করা, এবং কৃষক-কৃষাণীদের পারস্পরিক শেখার একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া। এই চর্চার মধ্য দিয়ে নারীরা শুধু পরিবারের সহায়ক নন; তারা বীজ সংরক্ষণ, জৈবসার ও জৈববালাই প্রস্তুত, পুষ্টিবাগান গড়ে তোলা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমছে, রাসায়নিক উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, মাটির উর্বরতা ও প্রাণবৈচিত্র্যের পুনরুদ্ধার হচ্ছে এবং স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের সংস্কৃতি শক্তিশালী হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষক আবার নিজের কৃষি সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছেন, কোন বীজ ব্যবহার করবেন, কীভাবে উৎপাদন করবেন এবং কীভাবে সেই জ্ঞান অন্যদের সঙ্গে ভাগ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত এখন ক্রমেই কৃষকের হাতেই ফিরে আসছে। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, এগ্রোইকোলজি কেবল একটি কৃষি প্রযুক্তি বা উৎপাদন পদ্ধতির নাম নয়; এটি মানুষ, প্রকৃতি এবং ন্যায্যতার পারস্পরিক সম্পর্ককে পুনর্গঠনের একটি উন্নয়ন দর্শন। বরেন্দ্র অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, কৃষকের জ্ঞানকে সম্মান করা, স্থানীয় সম্পদকে মূল্য দেওয়া এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এগ্রোইকোলজি জলবায়ু অভিযোজন, খাদ্য ও বীজ সার্বভৌমত্ব এবং টেকসই জীবিকার একটি কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এগ্রোইকোলজি কেবল একটি কৃষি প্রযুক্তি নয়; এটি একটি উন্নয়ন দর্শন। এই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষ-সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং ন্যায্যতার সম্পর্ক।

খাদ্য সার্বভৌমত্বউৎপাদনের অধিকার থেকে খাদ্যের মর্যাদা

এই সফরে যেসব বাড়িতে গিয়েছি, প্রায় প্রতিটি পরিবারই বলেছে-আগের তুলনায় এখন বাজার থেকে সবজি অনেক কম কিনতে হয়। বাড়ির আঙিনায় উৎপাদিত শাকসবজি, দেশি মসলা, ফল, ডিম এবং মৌসুমি ফসল তাদের পরিবারের খাদ্যতালিকাকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। এটি কেবল অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় নয়। খাদ্য সার্বভৌমত্ব এমন একটি ধারণা, যেখানে মানুষ নিজের খাদ্যব্যবস্থা সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। কী উৎপাদন করবে, কী খাবে, কীভাবে উৎপাদন করবে এবং কোন বীজ ব্যবহার করবে-এই সিদ্ধান্ত কৃষকের নিজের। খরিবোনা গ্রামের কৃষাণীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তাদের কাছে নিরাপদ খাদ্য এখন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ। শিশুদের জন্য আলাদা করে বিষমুক্ত সবজি রাখা, বীজ সংরক্ষণ, বাড়িতে উৎপাদিত খাদ্যের বৈচিত্র্য-এসব তাদের কাছে এখন স্বাভাবিক অভ্যাস। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি খাদ্যের মান, বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বীজ সার্বভৌমত্বভবিষ্যতের ভিত্তি

বরেন্দ্রের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, যে কৃষক নিজের বীজ সংরক্ষণ করতে পারেন, তিনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। আজ এই অঞ্চলে বহু পরিবার নিজেরাই ধান, শিম, মরিচ, মসলা ও বিভিন্ন সবজির বীজ সংরক্ষণ করছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিনিময় করছে। নতুন কৃষকদের দিচ্ছে। এটি কেবল একটি কৃষি অনুশীলন নয়; এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। কারণ বীজের ওপর কৃষকের অধিকার মানে কৃষির ওপর কৃষকের অধিকার। যে কৃষক প্রতিবছর বাজার থেকে বীজ কিনতে বাধ্য হন, তিনি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যে কৃষক নিজের বীজ নিজেই সংরক্ষণ করেন, তিনি অনেক বেশি স্বাধীন। গ্রামগুলোতে দেখা গেছে, শাকসবজি এবং কিছু শস্য ফসলের বীজ তারা নিজেরাই নিয়মিত রাখেন। বিশেষ করে করে শাকসবজির বীজ তারা নিজেরাই রাখেন। এই পর্যায়ে কৃষকরা কিছুটা স্বাধীন। জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে এই স্বাধীনতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত দেশি জাতগুলো দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গ্রিন কোয়ালিশনস্থানীয় অভিজ্ঞতা থেকে বৈশ্বিক সংলাপ

বরেন্দ্রের এই অভিজ্ঞতা শুধু কয়েকটি গ্রামের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের কৃষি, জলবায়ু অভিযোজন এবং ন্যায্য উন্নয়ন নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও অংশ। গ্রিন কোয়ালিশন দীর্ঘদিন ধরে যে বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসছে, কৃষক নেতৃত্বে এগ্রোইকোলজি, খাদ্য সার্বভৌমত্ব, বীজ সার্বভৌমত্ব, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু ন্যায্যতা, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার এবং স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক সমাধান,বরেন্দ্রের এই গ্রামগুলোতে তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। এখানে কৃষকেরা শুধু উৎপাদক নন; তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অভিযোজনের অগ্রভাগের মানুষ। তারা কেবল সহায়তা গ্রহণ করেন না; তারা জ্ঞান সৃষ্টি করেন। তারা শুধু নিজেদের পরিবারকে রক্ষা করেন না; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থানীয় বীজ, মাটি, পানি এবং কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করেন। বিশ্বজুড়ে যখন শিল্পভিত্তিক কৃষির পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, তখন নাচোলের কৃষকেরা দেখিয়ে দিচ্ছেন-স্থায়িত্বশীল কৃষির পথ কেবল উন্নত প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেই পথ স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, সহযোগিতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মধ্যেও নিহিত।

উপসংহারপরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষ

তিনদিনের এই সফর শেষে ফেরার পথে মনে হয়েছে, শেষ হলোনা জানা। আরো জানতে হবে, আবারো আসতে হবে। ফেরার পথে বারবার মনে হচ্ছিল, বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি এলাকার এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি কোন প্রকল্প নয়, কোনো অর্থায়ন নয়, এমনকি কোন একক ব্যক্তিও নন। সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষ। একজন কৃষক যখন নিজের বীজ নিজে সংরক্ষণ করেন, তখন তিনি ভবিষ্যৎকে রক্ষা করেন। একজন কৃষাণী যখন নিজের উঠানে জৈবসার তৈরি করে পরিবারের জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করেন, তখন তিনি শুধু একটি পরিবার নয়, একটি প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত করেন। জাতি গঠনে ভূমিকা রাখছেন। একটি গ্রাম যখন নিজের পুকুরের অধিকার ফিরে পায়, তখন তারা শুধু মাছ চাষের সুযোগ পায় না; তারা নিজেদের সম্পদের ওপর নিজেদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। একজন কৃষক যখন নিজের অভিজ্ঞতা আরেকজন কৃষকের সঙ্গে ভাগ করে নেন, তখন তিনি শুধু জ্ঞান দেন না; তিনি একটি আন্দোলনের বীজ বপন করেন। বরেন্দ্র খ্যাত নাচোলের এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই অনিশ্চিত সময়ে অভিযোজন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; এটি মানুষের সক্ষমতা, স্থানীয় জ্ঞান, প্রাণবৈচিত্র্য, সামাজিক সংহতি এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে নতুন কৃষি-ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশ্ন।

মো. রায়হান কবির রঞ্জুর সঙ্গে পথচলা কৃষক-কৃষাণীদের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাই কেবল একটি সফল কৃষি উদ্যোগের গল্প নয়। এটি এমন এক সামাজিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতা ও গল্প, যেখানে কৃষকের জ্ঞান আবার কৃষির কেন্দ্রে ফিরে এসেছে; যেখানে বীজ আবার মানুষের ঘরে ফিরেছে; যেখানে খাদ্য আবার পরিবারের হাতে ফিরে এসেছে; এবং যেখানে খরাপ্রবণ বরেন্দ্রের লাল মাটিতে নতুন করে জন্ম নিয়েছে আশা, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিরোধের সবুজ অঙ্কুর। হোকনা সেটা সংখ্যায় কম, কিন্তু এই যাত্রার পথ দিনে দিনে বাড়বে বলে বিশ^াস করি। আজ যখন জলবায়ু সংকট, প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস এবং খাদ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্ব উদ্বিগ্ন, তখন বরেন্দ্র অঞ্চলের নাচোলের এই নীরব কৃষকরা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরছেন-স্থায়িত্বশীল ভবিষ্যতের পথ প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়; প্রকৃতির সঙ্গে, কৃষকের সঙ্গে এবং মানুষের অধিকারকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হতে পারে।

happy wheels 2