সাম্প্রতিক পোস্ট

আমার বিলের অধিকার চাই, সবাই মিলেমিশে বাঁচতে চাই

রাজশাহী থেকে অমিত সরকার

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কসবা ইউনিয়নের খরিবোনা গ্রাম এবং রহনপুরে বহিপাড়া গ্রাম দুটি অবস্থিত। গ্রাম দুটির পাশে হাজার বিঘা বিলের অবস্থান। হাজার বিঘারও বেশি জমির কারণে বিলটির নাম হয়েছে হাজার বিঘা বিল। স্থানীয় বসবাসকারী মানুষের মতে, এই বিলটি নিকট অতীতে স্থানীয় মানুষের নানা উপকারে আসতো। কিন্তু ১৯৯৬ সালের পর সরকার থেকে বিলটি লিজ দেবার কারণে সেখানে সর্ব সাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত হয়েছে। যার ফলে বিলের উপর নির্ভরশীল পেশাগুলো আজ পরিবর্তন হয়েছে। কৃষকরা বর্ষা মৌসুমে ধান চাষ করতে পারছেন না। বিল প্রভাবশালীরা লিজ নিয়ে মাছ চাষ করার কারণে বর্ষার সময় পানি আটকে রাখে। যার ফলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। এতে করে বিলের আশপাশের প্রায় ৫০০ বিঘারও বেশি জমির ফসল আবাদও বিঘিœত হয়েছে। এ সমস্যা সমাধান চেয়ে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে খড়িবোনায়, কৃষক, সাংবাদিক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং গ্রামের মোড়লসহ নানা পেশার মানুষ নিয়ে “হাজার বিঘা বিলে সর্ব সাধারণের  প্রবেশাধিকার বিষয়ক জনসংলাপ আয়োজন করা হয়।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, ১৯৯৬ সালের আগে বিলটিতে তারা মাছ ধরতেন এবং বিলের দল পদ্ম, দলদাম, শাপলাসহ নানা জলজ উদ্ভিদ নানা কাজে ব্যবহার করতেন। সেমসয় বিলটির অনেক খাস জমিতে স্থানীয় গরিব এবং ভুমিহীনরা ফসল ফলাতো। এখন আর আগের মত বিলে কেউ মাছ শিকার করতে পারে না। প্রভাবশালী মহল বিলটি লিজ নিয়ে নামমাত্র মাছ ছেড়ে সারাবছর বিলটি থেকে মাঝ আহরণ করে বিক্রি করে। বিলটিতে একসময় ৭-৮ ফিট পানিতেও নানা জাতের জলি আমনের চাষাবাদ করা হত। জলি আমনে জাতগুলোর মধ্যে ছিল-কালিরাই, শিরহাইল, যাত্রা মটর, বলাকা। চাষবাস বন্ধা হওয়ায় এসব জাত প্রায় আজ প্রায় বিলুপ্ত বলা চলে। গ্রামের বয়জ্যোষ্ঠ মোজাম্মেল হক (৬২) এই প্রসঙ্গে বলেন, “সবজাত আর পাওয়া যায় না, তবে খুব অল্প, কয়েকজন বলাকা ধানটি করেন, মাঝে মাঝে দেখা যায়।”

?

বর্তমান বিলটির খাস জমিগুলোতে আমন মৌসুমে পানি থাকার কারণে কোন চাষাবাদ করা হয় না। তবে বিলের চারপাশের ব্যক্তি মালিকানা জমিগুলোতে ধানচাষ করা গেলেও কয়েক বছর ধরে মাছ চাষীরা পানি ধরে রাখার কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর ফলে সেই জমিগুলোও পতিত পড়ে থাকে। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিলটি বিগত ১৯৯৬ সালের পর লিজ গ্রহণকারীরা আর ধান লাগাতে দেয় না। এর ফলে পানিসহনশীল জাতগুলো চাষ না করার কারণে হারিয়ে গেছে। এছাড়া বিগত ১৯৮৭ সালে মহানন্দা নদীর পাশে (বিলটির পানি নিষ্কাশন এলাকা) সøুইস গেট দেবার কারণে সেখানে বন্যার সময় পানি প্রবেশ করতে না পারায় বর্তমান একটু উচু জমিতে সরনা, বিআর জাতের আমন ধানের চাষ করা হয়। এই ব্যাপারে স্থানীয় কবির আলী (৫৫) বলেন, “আমাদের আশপাশের গ্রাম মিলে সবাই একসময় এই বিলটি পরিষ্কার করে ধান চাষ করতাম।” কিন্তু যখন পরিষ্কার শেষ হল কয়েকবছর পরেই এটি সরকার লিজ দেয়া শুরু করলো। লিজ নেয়ার পর থেকে আর কোন ফসলের চাষ করতে দেয় না। সেখানে লিজ গ্রহীতারা মাছের চাষ করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, “আগে আমাদের এলাকার প্রতিটি বাড়িতে বর্ষার সময় প্রতিদিন বিলের দেশী মাছ দেখা যেতো। এখন আর তা দেখা যায় না। এখন বিলের মাছ খাইতে মন চাইলে বাজার থেকে টাকার বিনিময়ে এনে খাইতে হয়। যে বিলের উপর প্রায় হাজার হাজার মানুষের নির্ভরতা ছিলো বিভিন্ ভাবে সেই বিল সরকার কিছু প্রভাবশালীদের কাছে লিজ দিয়ে এতগুলো মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো। এইটা মেনে নেওয়া যায় না।” তিনি আরও বলেন, “আমরা এই বিষয়ে একটি গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে ডিসি স্যারের কাছে জমা দেবো। এই বিল যেন কখনোই লিজ দেওয়া না হয় এবং সর্ব সাধারণের যেনো বিলে প্রবেশাধিকার ফিরে পায় সেই জন্য আমরা সবাই এক সাথে কাজ করবো”।

happy wheels 2
%d bloggers like this: