Posted in

বাদাবন সম্ভার: বন ও বনজীবীর স্বপ্নযাত্রা

সাতক্ষীরা থেকে বাবলু জোয়ারদার. রামকৃষ্ণ জোয়ারদার ও মননজয় মন্ডল

অতি সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকারের পুষ্টি বিজ্ঞান ইন্সিটিউট দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে। পরীক্ষায় মিষ্টি জাতীয় খাবার, দুধ, আটা, ময়দা, সূজি, চিনি ও অন্যান্য খাবারের প্রতিটিতে ভেজাল প্রমাণিত হয়েছে। কোন কোন পণ্যে প্রায় শতভাগই ভেজাল পাওয়া গেছে। তাহলে ভেবে দেখুন আমরা প্রতিদিন কি খাচ্ছি? শহরের বড় বড় শপিং মল ও ব্যাকারিতে ওই সমস্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত ভেজাল পণ্যের পসরা সাজানো। ভেজাল পণ্য খেয়ে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, তাহলে ভেজাল মুক্ত পণ্য কোথায় পাওয়া যাবে? বর্তমানে সারা পৃথিবীতে মানবদেহকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে অর্গানিক পণ্য বিক্রি হচ্ছে। কোন প্রকার রাসায়নিক কেমিক্যাল মুক্ত এ সকল পণ্যের বাজার দিন দিন জনিপ্রয় হচ্ছে। অর্গানিক পণ্যের দাম সাধারণ পণ্যের চেয়ে বেশি। কারণ অর্গানিক পণ্যে মানবদেহের ক্ষতিকর কোন উপাদান নেই। প্রাকৃতিক পণ্যই মানবদেহের বড় চিকিৎসক। প্রতিদিন সকালে এক চামচ মধু খেলে আপনি নিজেই সুস্থতা উপলব্ধি করতে পারবেন। ভারত, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া দেশের প্রতি ৬০ গ্রাম মধু বিক্রি হচ্ছে ২ ডলারে। তাহলে ভাবুন যে, আমাদের সুন্দরবনের মধু যদি ওই বিশ্ব প্যাকেজে অর্ন্তভূক্ত করতে হয়, তাহলে কি হবে? ক্ষুদ্র হলেও বনজীবী মৌয়াল জনগোষ্ঠী বিগত ৭ বছর নিজেরা সংগঠিত হয়ে সুন্দরবন মধুর ন্যায্য বাজার সৃষ্টিতে সংগ্রাম করছে। বাদাবন সম্ভার ব্যান্ডডিং করে বিক্রি করছে মধু, কেওড়ার আচার, জেলি, চকলেট, নুড়া, প্রাকৃতিক মোমবাতি এবং সুন্দরবন খচিত হস্তশিল্প। বাদাবন সম্ভারের সরকারী নিবন্ধন রয়েছে। আছে স্যানেটারি সাটিফিকেট ও ট্রেড লাইসেন্স। তবে, চেষ্টা চলছে বিশ্ব বাজারের মানসম্মত করার।

1কেওড়া সুন্দরবনের ঔষধিগুণ সমৃদ্ধ একটি খাদ্য উপযোগী ফল। বনের এই ফল নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে সুন্দরী, গেওয়া, পশুর ধুন্দল, বাইন, গোলাপাতা, গরান, কাকড়া ইত্যাদি মূল্যবান বৃক্ষের মধ্যে কেওড়া অন্যতম। কেওড়া গাছে যে ফল হয় তার নাম কেওড়া ফল। আমাশয়, ক্ষুধামন্দা, হজম শক্তি বৃদ্ধি, বমিভাব দূর, মুখে রুচি ফিরিয়ে আনাসহ ঔষধিগুণ সম্পন্ন এই কেওড়া ফল জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সুন্দরবন সংলগ্ন স্থানীয় বাজারের পাওয়া যায়। বাদাবন সম্ভারের পণ্য তৈরির এক প্রধান উপাদান এই কেওড়া ফল। কেওড়ার সাথে লবঙ্গ, দারুচিনি, এলাচ, ঝাল গুড়া, মরিচ গুড়া, জিরা, চিনি, তৈল সংমিশ্রণে তৈরি হয় ৫ স্বাদের কেওড়ার আচার, নুড়া, চকলেট। এ বছর (৮ আগষ্ট ২০১৬) সকাল ১০টায় বাদাবন সম্ভারের পণ্য উৎপাদন শুরু হয়। প্রথমদিন টক ঝাল মিষ্টি স্বাদের ২০ বোতল কেওড়ার আচার তৈরি করা হয়। পণ্য উৎপাদনে দায়িত্ব পালন করেন বাদাবন সম্ভারের শেফালী বেগম, বাবলু জোয়ারদার, রামকৃষ্ণ জোয়ারদার। এ বছর কেওড়ার চকলেট, শুকনা আচার, জেলী (টক, ঝাল, মিষ্টি) জেলী (টক, মিষ্টি) ও কেওড়ার নোড়া) এবং সুন্দরবনের সংগৃহীত মধু পরিশুদ্ধ করে বোয়ামজাত হচ্ছে। মোম দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের মোমবাতি, শোপিচ, সীট তৈরি হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে অর্গানিকভাবে প্রস্তুতকৃত এসব পণ্য আধুনিকতার ছোঁয়ায় বোয়াম/প্যাকেট জাত করছে বাদাবান সম্ভার কর্তৃপক্ষ। বাদবন সম্ভারের পণ্য উৎপাদনে বাঘ বিধবা ও বনজীবী নারীরা কাজ করছেন। প্রতিটি পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার কথা চিন্তা করেই পণ্যের মূল্য নিধারণ করা হয়েছে। বাদাবন সম্ভারের লভ্যাংশ সরাসরি বনজীবীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় হয়। বাদাবন সম্ভারের পণ্য আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টারে, স্থানীয় গ্রামীণ হোটেল, চায়না বাংলা শপিং সেন্টার, বারসিক শ্যামনগর ও সাতক্ষীরা রিসোর্স সেন্টার, দাঁতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনে প্রদর্শনী ও বিক্রি হবে জানান বাদাবন সম্ভার কর্তৃপক্ষ।
1212
বাদাবন সম্ভারের চেয়ারম্যান বনজীবী নারী শেফালী বেগম বলেন, “আমরা বারসিক সহযোগিতায় ভারতের তামিলনাড়– থেকে হাতে কলমে পণ্য উৎপাদনের প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাকৃতিক পণ্যের বাজারজাত করে যাচ্ছি। এ বছর আমরা নতুন উদ্যমে পণ্য উৎপাদন শুরু করেছি। আমাদের ইউএনও স্যার আকাশলীনায় পণ্য বিক্রির জন্য ঘর ব্যবস্থা করেছেন। ক্ষতিকর রঙ ও কেমিক্যালমুক্ত আমাদের বাদাবন প্রাকৃতিক পণ্য এ বছর উপজেলা, জেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ, বিক্রি ও প্রচার করা হবে। পরিকল্পনা করে কাজ শুরু করেছি”। বাদাবন সম্ভারের সহায়ক বারসিক’র বাবলু জোয়াদার বলেন, “বাদাবন সম্ভারের পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে আমরা সরাসরি তাদের সাথে থেকে সহযোগিতা করছি। প্রতি পণ্য বিশ্ব মানের করার চেষ্টা চলছে। সুন্দরবননির্ভর বনজীবীদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ সার্বিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাদাবন সম্ভার স্বপ্নযাত্রা শুরু করেছে।” তিনি আরও বলেন, “বাজারে নানান রঙের ও ধরনের শিশু কিলার পণ্যের চেয়ে আমার আপনার সন্তানকে সুন্দরবনের অর্গানিক কেওড়া চকলেট, জেলি ও আচার খাওয়ানোর অভ্যাস করতে পারলে, দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হবে। ক্ষতিকর কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি মোমবাতি জ্বালানোর চেয়ে বাদাবন সম্ভারের অর্গানিক মোমবাতি ঘরে জ্বালালে দীর্ঘক্ষণ আলো পাওয়া, ঘরকে সুগন্ধি করে তোলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝূঁকি থেকে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে”।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.