Posted in

একজন রফিকুল খানের মহানুভবতা

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ থেকে

সারাদিন রিকশা চালিয়ে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর রাতে ঘুমাবার মতো কোনো ঘর নেই চল্লিশোর্ধ্ব জমির আলির। ঘর বলতে এক পাশের খুঁটি ভাঙা পরিত্যক্ত একটি ঝুপড়ি, ১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল প্রলংকরী ঘুর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশ সেনা বাহিনী তা করে দিয়েছিল। দীর্ঘ ২৭ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর এ ঘরটি বর্তমানে বসবাসের সম্পূর্ণ অনপুযোগী। রোদ-বৃষ্টি কিংবা ভোরের প্রথম আলো অনায়াসেই খেলা করে তাতে। এই রকম ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে স্ত্রী ও ৩ সন্তানের সংকুলান হয় না। তাই তিনি দুয়ারের এক কোণে পলিথিন টাঙিয়ে ঘুমাবার আয়োজন করে আসছেন দীর্ঘ দিন ধরে। আকাশের তারারাও এক সময় নিভে যায়, কিন্তু থেকে যায় হতদরিদ্র রিকশা চালক জমিরের বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস। পরিবারটির রাত্রি যাপনের এই ত্রাহিবস্থা মানবিকতার একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছে। ৫ সদস্যদের এই পরিবারের একমাত্র আয় রিকশার পেডেলের ওপর। যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকম দিন চলে যায়। বাড়ি-ঘর করার কোনো সামর্থ্য নেই। জমির আলীর বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দক্ষিণ পাড়-তিল্লি গ্রামে। কিন্তু দুঃখের দিন শেষ হয় কোন একদিন! কেউ না কেউ এসে দাঁড়ায় পাশে, দেখায় নতুন করে বাঁচার, নতুন করে স্বপ্ন দেখার। এই অসহায় ও হত দরিদ্র পরিবারটির পাশে পরম যতনে সহায়তার হাত বুলিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মো. রফিকুল ইসলাম খান। নিজ অর্থায়নে করে দিয়েছেন ঘর। ফুটিয়েছেন মুখে অকৃত্রিম হাসি। নয়া টিনের চালার ঘরে এখন অন্তত দীর্ঘশাস আর হতাশায় ভরে উঠে না। রাতে প্রশান্তির তন্দ্রাদেবী একটু হলেও নামে এ ঘরে।

m2
শুধু জমির আলীই নয়, রফিকুল খানের সহায়তায় মাথা গোঁজার ঠাই পেয়েছে সাটুরিয়ার এরকম নিস্ব ৭টি পরিবার। জমি আছে অথচ থাকার ঘর নেই এমন ৭টি অস্বচ্ছল পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ালেন সাটুরিয়া উপজেলার নওগাও গ্রামের প্রবাসী মো. রফিকুল ইসলাম খান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যেমে খোঁজ করা হয় এরকম অসচ্ছল লোকদের। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কারও সন্তান থাকতেও বিয়ে করে বৃদ্ধ পিতা- মাতাকে ফেলে রেখে গেছেন। কেউ বিধাব, কেউ ঝি এর কাজ করে খায়, কারো বা সাধ আছে কিন্তু সামর্থ নেই; এমনই ৭টি দুঃস্থ পরিবারের দু’চালা ঘরে একটু হলেও মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিলেন রফিকুল ইসলাম খান।

ফুকুরহাটি ইউনিয়নের শাহনাজ বেগমের স্বামী বাবুল হোসেন শারিরিক অসুস্থতার কারণে ঠিকমত কাজ করতে পারে না। সংসার চালাতে শাহনাজ স্থানীয় একটি খাবার হোটেলে ঝিয়ের কাজ করেন। এমন অবস্থায় পৈত্তিক সূত্রে পাওয়া একটি ছাপড়া ঘরে কোন রকম থাকেন। আকাশে মেঘ দেখলেই ভয়ে আঁতকে উঠে তারা। বৃষ্টি শুরু হলে অপেক্ষায় থাকতে হয় কখন থামবে বৃষ্টি। তাকেও একটি ঘর তৈরি করে দেন রফিকুল।

m31
হরগজ ইউনিয়নের গোসাইনগর গ্রামের মৃত ছবেদ আলির স্ত্রী ময়ুরজান (৬৫)। পুত্র সন্তান আছে কিন্তু কিন্ত ছেলের আয়ে মুখে ভাত জুটে না আবার থাকার ঘর! স্বপ্নের ঘোরপ্যাঁচে আটকা। একটি ভাঙা ঘর, দু’পাশে বেড়া নেই। কত রাত-কত দিন যে ঝড়-বৃষ্টি-খড়তাপ অতিক্রম করে এসেছেন এই বিধবা বৃদ্ধা। তার পরিসংখ্যান যাই হোক, তা অনেক কষ্টের। অনেক দুঃখের স্তম্ভগাঁথা। প্রবাসী রফিকুলের দেওয়া ঘর পেয়ে আনন্দে দুচোখর পানি আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি। শিশুদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। এ কান্না আনন্দের, এ কান্না মানবতার বিজয়ের।

দরগ্রাম ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের মৃত ইয়াদ আলির পুত্র মুকছেদ আলী (৬৫) বলেন, “বয়স হয়ে গেছে, শরীরে বাসা বানছে বিভিন্ন রোগ-শোক। তাই বাধ্য হয়ে স্ত্রী মাটি কাটে। এটিই আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস। ধানের খড়ের বেড়া আর পাঠকাঠির ছাউনীর ঘরে কোন রকম দিন কাটত। রফিক চাচা আমাদের ঘর করে দিয়েছে, সেই ঘরেই থাকি। আল্লায় তারে হায়াত দিক, দোয়া করি আল্লা তারে ভালো করুক।”

বালিয়াটী ইউনিয়নের রহিমা বেগম (৬০) বলেন, “স্বামী মারা যাবার পর ছাগল পেলে সংসার চালাই। কোন রকম দিন চলে যাচ্ছে। থাকার ভাঙা ঘর অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। আমাকেও একটি দু’চালা ঘর করে দিছে।” আবেগে আপ্লুত ছলছল নয়নে বললেন, “আমাগো কতা কেউ চিন্তা করেনা। রফিক কাক্কু (চাচা) ঘর দিছে, হেই ঘরের দিকে যতবার চাই, ততবার তার জন্য মন থেইক্যা দোয়া আসে।”

m1
ফুকুরহাটি ইউনিয়নের জান্না গ্রামের আমির আলী (৭০) এবং সাটুরিয়া উপজেলার বৈলতুলা গ্রামের মৃত নিজাম উদ্দিনের পুত্র জয়েলে রানার (৪০) থাকার ঘর নেই। স্ত্রী নিয়ে আমির আলী আর দুই সন্তান নিয়ে জয়েলের ঠাঁই হতো ভাঙা ঘরে। রোদ বৃষ্টি ও ঝড়ে নিদারুণ কষ্ট করতে হত।  রফিকুল খান তাদেরও ঘর করে দেন।
এ ৭টি ঘর তৈরি করে দেওয়া কাজের সম্বন্নয়ক প্রবাসীর ভাতিজা মাহফুজুল ইসলাম খান রতন জানান, ২০ ফিট বাই ১২ ফিট করে দুচালা টিনের ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এ ৭টি ঘর নির্মাণে খরচ হয়েছে মোট ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

এ ব্যাপারে বালিয়াটী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুস সোবহান বলেন, “এ বছরের শুরুতে নওগাও গ্রামের আমেরিকা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম খান আমাকেসহ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিকে বলেন, শুধুমাত্র সাটুরিয়া উপজেলায় জমি আছে কিন্তু থাকার ঘর নেই, কিংবা ঘরটি ব্যাবহারের অনপুযোগী, এমন অসহায় পরিবারকে ঘর তৈরি করে দেওয়া হবে।” পরে চলতি বছরের অক্টোবর মাসে উপজেলার ৭টি পরিবারকে টিনের ঘর করে দিয়েছেন তার মায়ের নামে “রাবেয়া ফাউন্ডেশনের ব্যানারে”। এছাড়াও তিনি রোজার মাসে বিভিন্ন পরিবারের এক মাসের ইফতার সামগ্রী, দুই ঈদে কয়েক হাজার কাপড় বিতরণ করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে প্রতি হজ্জ মৌসুমে মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলা থেকে হজ্জ করতে ইচ্ছুক কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য নেই, এমন একজন করে প্রতিবছর হজ্জ করার সমস্ত খরচ বহন করেন তিনি। তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ১০ জন মানুষকে হজ্জ করিয়েছেন।

rafikul-khan

এই প্রসঙ্গে আমেরিকা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, মানব সেবার ওপরে কোন কিছু নেই। ব্যক্তি উদ্যোগে চেষ্টা করি মানুষের জন্য কিছু করতে। আমার ইচ্ছা সাটুরিয়া উপজেলায় ঘরহীন মানুষদের ঘর তৈরি করে দেওয়ার। নতুন ঘরে, নতুন স্বপ্ন দেখুক তারা। এগিয়ে যাক সামনের দিকে।” তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতে তাদের সামর্থ হলে তারাও মানবতার কাজে আত্মনিয়োগ করবেন। ধীরে ধীরে এ কর্ম পরিধি বেড়ে হয়তো একসময় আর কেউ নীড়হীন থাকবে না।” তিনি বলেন, “আমার জন্মস্থান সাটুরিয়াবাসীকে বলছি, অসহায়- দুঃস্থ ও সম্বলহীন মানুষের মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই নেই যার, আমি তাদের ঘর করে দিব। মানবতার সেবায় অল্প একটু করলেও যেন মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠে। অসহায় মানুষের মুখের একটু হাসি অন্তরাত্মাকে করে তোলে উজ্জীবিত।”

রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা যে যার অবস্থান থেকেই যদি এমন দরিদ্র-অসহায় মানুষের পাশে একটু দাঁড়াই তাতেই আশায় বুক বাঁধবে তারা। মানবিকতা দুনিয়ার এখনো রয়েছে এ বিশ্বাস আরো দৃঢ় হবে তাদের মনে। আপনারা দোয়া করবেন, যেন এভাবেই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে কিছু করে যেতে পারি।”

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.