Posted in

বাঙালির প্রাণে স্পন্দন দেয় পহেলা বৈশাখ

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী
বাঙালির অন্যতম প্রধান উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাংলা নতুন বছর শুরু হয় পহেলা বৈশাখে। তাই পহেলা বৈশাখকে বরণ করতে এ দিনটিতে আনন্দ মেতে উঠে সমগ্র বাঙালি জাতি। বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বহন করে আসছে যুগ যুগ ধরে এ বৈশাখ। দিনটিতে বাংলার গ্রামে, গঞ্জে ও শহরাঞ্চলে বাঙালি ও বিভিন্ন জাতিস্বত্তার জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এই দিনে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগুলো তুলে ধরতে গ্রামীণ ঐতহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শিশু, কিশোর, যুব, নারী, পুরুষ ও প্রবীণরা বাহারী সাজে সেজে বাহাড়ী পিঠা, পুলি, নারু, চিড়া, মুড়ি, দই, পান্তা ভাত খেয়ে দিনটিকে উদ্যাপন করে। বিভিন্ন পেশাজীবী জনগোষ্ঠী নিজেদের জীবিকার সাথে সম্পর্কিত হাতের তৈরি উপকরণ গ্রামীণ খাদ্য, খেলনা ও তৈজসপত্র মেলায় প্রদর্শন ও বিকিকিনি করে। প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো প্রকাশ পায় এখানে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল পেশার মানুষ গ্রামীণ সংস্কৃতি প্রাণভরে উপভোগ করে।

20190414_075231-W600
বাংলাদেশের সকল অঞ্চলেই অঞ্চলভিত্তিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী বৈশাখী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে সকল অঞ্চলে উৎসবের ভিন্নতা আসলেও নেত্রকোনায় বৈশাখী মেলায় গ্রামীণ লোক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকা এখনও রয়ে গেছে।

পহেলা বৈশাখ আর বৈশাখী মেলা যেন নেত্রকোনা অঞ্চলের মানুষের নিকট প্রাণের স্পদন নিয়ে আসে। সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁচা পেয়াজ, কাঁচা মরিচ আর পান্তা ভাত খেয়ে বাঙালি জনগোষ্ঠী বর্ণাঢ্য শোভা যাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য বেরিয়ে পড়ে। ভোর থেকে শুরু হয় বৈশাখী মেলা। মেলায় নানান স্বাদের বিন্নি ধানের খই, লাড়– মুড়ি মুড়কি আর পিঠা পুলি, জিলাপি, মিষ্টি, দই, সন্দেশ জাতীয় খাবার ও খেলনা মেলায় প্রচুর পরিমানে কোনা বেচা হয়। এক খন্ড মাটি ও এক টুকরো লোহাকে হাতের স্পর্শে ও হাতুড়ির শৈল্পিক রুপ দিয়ে পরিবেশবান্ধব নিত্য প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র ও ঘর সাজানোর উপকরণ তৈরী করে মেলায় বিক্রি করে বাঙালি ঐতিহ্য বহনকারী কুমার সম্প্রদায়। কুমার জনগোষ্ঠী কয়েক মাস ধরে বৈশাখী মেলাকে উদ্দেশ্য করে তৈরি করেন বিভিন্ন ধরণের মাটির পুতুল, মাটির ব্যাংক, ফল (আম, কাঁঠাল, পেঁপে), পশু-পাখি (হরিণ, হাতি, ঘোড়া, ময়ুর, টিয়া), চেয়ার, খাট, পালকি, হাড়ি-পাতিল, চুলা, কড়াই, শিল পাটা, কলস, বালতি, বাহারী ধরণের খেলনা, ফুলদানি, টবসহ নানান ধরনের জিনিস। কুমার শিল্পীদের বাৎসরিক আয়ের একটা বড় অংশ উপার্জিত হয় বৈশাখী মেলায় বেচাকেনা থেকে। কুটির শিল্পরা বৈশাখী মেলার জন্য বাঁশ ও বেত সামগ্রী, রঙ্গিন হাত পাখা, মোড়া, চালনি, মাছ ধরার উপকরণ, ফুলদানি, ঘুড়িসহ গৃহস্থালির নানাবিধ উপকরণ তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করেন। নেত্রকোনা অঞ্চলের কয়েক হাজার কুটির শিল্পীরা তাদের তৈরী জিনিস বৈশাখী মেলায় প্রদর্শন এবং মেলার বিক্রি করেন।

20190414_102028-W600

মাসজুড়ে নেত্রকোনা বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় ছোট ছোট মেলা, যা’ বারুনী মেলা নামে পরিচিত। বৈশাখ মানে কুমার, কামার ও কুটির শিল্পী সম্প্রদায়ের সমাবেশ। এদের উৎপাদিত পণ্য গ্রাম বাংলার সকল শ্রেণীর জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলা নববষের্র বৈশাখী মেলা। প্রতিবছরের মত এবছর শুরু হয় ভোর থেকে পহেলা বৈশাখী মেলা নেত্রকোনার মধুমাছি স্কুলের মাঠে। অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও মেহেদী উৎসব। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে ও নারীরা মেহেদী উৎসবে মেতে উঠে। আয়োজিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত আসনের মাননীয় সাংসদ হাবিবা রহমান খান শেফালি এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল খালেক।

মাননীয় সাংসদ হাবিবা রহমান খান শেফালি প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বৈশাখী মেলা হত নেত্রকোনা বড়বাজার বটতলায়। এসব মেলায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামতো। মেলায় পাওয়া যেত কাঁচের রেশমি চুরি। রঙ বেরঙের ফিতা, কামারদের হাতের তৈরি মাটির হরেক রকমের জিনিস। সবাই দল বেঁধে কেনাকাটা করতাম। এখন বাচ্চরা ব্যস্ত সময় পার করে মোবাইল ফোন, টিভি অনুষ্ঠান দেখে ও পড়াশূনায়। আগের পহেলা বৈশাখ মানে ছিল প্রাণের মেলা।’

জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ মানে গ্রামীণ সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখে মেতে উঠে প্রবীণ, নবীন, শিশু, ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যাক্তিসহ সকল পেশার মানুষ। নতুন প্রজন্ম এই উৎসবের মাধ্যমে নিজস্ব সংস্কৃতি সর্ম্পকে জানতে পারবে ও শিখতে পারবে।’ তিনি নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শুধু পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ধারণ করলে চলবে না, তার আগে নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে তোমাদেরকে জানতে হবে। সর্বদা নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা ও ধারণ করতে হবে, তবেই নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিতে পারবে।’

20190402_113902-W600

পহেলা বৈশাখের আলোচনা শেষে অনুষ্ঠিত হয় শিশুদের অংশগ্রহণে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা। শিশুরা তাদের ইচ্ছামত ছবি আঁকা ও নাটকের মধ্যে দিয়ে নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়গুলো তুলে ধরে। নারী-পুরুষ, শিশু, প্রবীণ, নবীন ও শিক্ষার্থীসহ সকল বয়সের প্রায় ৪,০০০ লোক মেলায় অংশগ্রহণ করে পরস্পরের সাথে আনন্দ সহভাগিতা করে নেয়। বারসিকের সহযোগিতায় নেত্রকোনা সদরের দু’টি কিশোরী সংগঠন বৈশাখী মেলায় কবিতা আবৃত্তি ও গান পরিবেশন এবং নাটকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছে। এছাড়াও নেত্রকোনা শিক্ষা সংস্কৃতি কমিটি মেলা বইয়ের স্টল প্রদর্শন করে কমিটির কার্যক্রম সকলের নিকট তুলে ধরেছে।

IMG_20190414_180120-W600
কিশোরী সংগঠনর প্রতিনিধি মিস লাবণী আক্তার বলেন, ‘নেত্রকোনা কত মেলায় কত অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু আমরা সেসব মেলায় বা অনুষ্ঠানে এর আগে কখনো অংশগ্রহণ করতে পারতাম না। এখন বারসিক’র সহযোগিতায় বিভিন্ন মেলা, দিবস উদ্যাপনের অনুষ্ঠানে এবং জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে এখন আমরা অংশ্রগহণ করা সুযোগ পাই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে পেরে আমরা কিশোরীরা খুবই আনন্দিত।”

উৎসবের দেশ বাংলাদেশ। আসে নববর্ষ, আসে উৎসব এবং আসে নানান পার্বণ। পুরাতন দিন ও পুরানো ঘটনাগুলো ভুলে উদিত হয় নতুন বছরের নতুন সূর্য। বৈশাখী মেলার পাশাপাশি বাউল, মূর্শিদী, মারফতী গান ও আরো কত কি গানের আসর বসে গ্রামেগঞ্জে। বাঙালি যেন সারাটা দিন মেতে থাকে এসব বাহারী আয়োজনে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.