Posted in

‘চলো আমরা সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে যায়’

সাতক্ষীরা থেকে মনিকা রানী

নাম তার চাম্পা। সুন্দরবনের চুনা নদীর তীরে জীর্ণ কুঠিরে তার বাস। মাত্র ৮ বছরের শিশু চাম্পা নিজের চোখে দেখলেন প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড় বুলবুল এর নির্দয় তাণ্ডব। সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কলবাড়ী গ্রামের চুনা নদীর চরে জেলে পাড়ায় ছোট্ট ভাঙাচোরা বাড়ীতে তার বাস। বাবা মায়ের সাথে ছোট ঘরে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছে তারা। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাÐবলীলায় তাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

চাম্পার পরিবার দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে জীবিকা সংগ্রহ করে চলেছে নিরন্তর। চাম্পার বাবা নিমাই বিশ্বাস সুন্দরবনে কাঠ ও মধু সংগ্রহ করে অর্থ উপার্জন করেন। ১৫ থেকে ১৬ দিন কখনো বা ১ মাস তাদের বনে থাকতে হয়। অভাবের তাড়নায় তার পরিবারের খবর তিনি রাখতে পারেন না। চাম্পার মায়ের নাম রিতা রানী। চাম্পার বাবা যখন বনে যায় তখন তার মা অনেক কষ্ট করে নদীতে জাল টেনে কোন রকমে তাদের সংসার চালায়। চামাপারা এক ভাই ও এক বোন। সে ৮২ নং কলবাড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণীতে পড়ালেখা করে ও তার ভাই প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। কখন আনন্দ ও কখন দুঃখ এর মধ্যেই তার কৈশোর কাল বেশ কেটে যাচ্ছিল।

ছোট্ট শিশু চাম্পার চোথে বুলবুল এর তান্ডব (4)

চাম্পার শিশুকাল নদীর চরে কাদা ও রাস্তার ধুলো বালি মেখে কেটে গেছে। অত্যন্ত কষ্টের তাদের জীবন। সমাজের অন্যান্য মানুষের থেকে তারা অনেক পিছিয়ে। অভাব অনটন তাদের যেন পিছু ছাড়ে না। তার মধ্যে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দুর্যোগের সম্মুখীন তাদের হতে হয়। নদীর চরে অল্প জায়গায় অনেকগুলো পরিবার তারা বসবাস করে। নদীতে জোঁয়ার আসলে তাদের ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। চাম্পা চোখের সামনে তার বাবা মায়ের হাহাকার ও আর্তনাদ শুনেছে ও দেখেছে। এখন সে দেখে বুঝেছে যতদিন বেঁচে থাকবে এসব সাথে নিয়েই বাঁচতে হবে। পরপর সে মহাসেন, ফনীর কথাও বলল।

চাম্পা’র ঘূর্নিঝড় বুলবূল দেখা সবথেকে বড় ঝড়। সে আগে কখনও এমন ঝড় দেখেনি। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের দিন চাম্পা বাড়িতেই ছিল, সে মাইকিং এবং বিভিন্ন মানুষের মুখে সংকেত ও ঝড়ের কথা শুনে খুব ভয় পেয়েছিল। সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল ও সেই সাথে আকাশ কালো মেঘে ঢাকা ছিল। যত দিন গড়ায় ততো আকাশ আরও মেঘে ঢেকে যায়। সে প্রথমে তার বইগুলো বস্তায় মুড়িয়ে বাস্কের ভিতরে রাখে। যখন ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সংকেত ৭ থেকে ১০ নং শোনা যায়, তখন সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে কারো যেন কোন ক্ষতি না হয় এবং সে তার মাকে বলে ‘চলো আমরা সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে যায়’। যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে তার ভয় ততো বেড়েই চলেছে। হালকা ঝড় হাওয়া যখন শুরু হয় তখন চাম্পার মা রান্না শেষ করতেই পারছিল না।

ছোট্ট শিশু চাম্পার চোথে বুলবুল এর তান্ডব (1)

চাম্পা তার মার হাতে হাতে তাড়াতাড়ি করে ভাত, ডাল ও ডিম রান্না করে। এত সময় তাদের ঘরে পানি ঢুকে তাদের জামাকাপড় সব ভিজে যায় এবং চাম্পার কয়েকটি বই বাইরে ছিল তার থেকে একটি বই ভিজে যায়। সে তখন বই ও জামা কাপড়গুলো একটি বস্তার ভিতরে ঢুকায়। তার মা তাকে ভাত খাওয়ার জন্য ডাকলে সে দ্রæত ভাত খাওয়া শেষ করে এবং বার বার সে ঈশ্বরকে ডাকতে থাকে। চাম্পা বলতে থাকে ফনী ঝড়ে যেমন কোন ক্ষতি হয়নি তেমনি ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে যেন আমাদের কোন ক্ষতি না হয়।

তাদের আশ্রয়কেন্দ্র তো কাছে ছিল না ৩ কিলো:মি: দূরে। কাছে ছিল চাম্পাদের স্কুল। তাদের গ্রামের সবাই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিল। চাম্পা তার পরিবার নিয়ে তাদের প্রাইমারি স্কুলে অবস্থান করে। তারপর চাম্পা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সে ভাবে আমাদের আর কোন ভয় নেই, আমরা নিরাপদ জায়গায় আছি। কিন্তু যত রাত গভীর হয় তার ধারণা ততো বদলাতে থাকে। স্কুলের ভিতরে চর্তুদিকে মানুষ, গরু, ছাগলে পা দেয়ার জায়গা ছিল না। চাম্পা তার পরিবার নিয়ে যে ঘরে ছিল,তার ভিতরে কিছু ছাগল ছানাও ছিল। বৃষ্টি ক্রমশ বাড়তে থাকে সেই সাথে ঝড়। স্কুল ঘরের জানালা দরজাগুলো ভাঙা ছিল। তারা যে ঘরে ছিল বৃষ্টির পানিতে ভরে গিয়েছিল। সবাই ঠান্ডায় কাঁপতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরে চাম্পা দেখল ছাগলছানাগুলো পানিতে ভিজে গেছে এবং ঠান্ডায় সেগুলো কাঁপছে। চাম্পার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। সে ছাগলছানার গায়ে হাত দিয়ে দেখল। এবং কিছু কাপড় চোপড় নিয়ে ছাগলছানার গায়ে দিল। কিন্তু ছাগলছানাগুলো এক পর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে মারায় গেল। এর পরে হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে একরাস ধুলো,বালি ও পাতা উড়ে তাদের গায়ে পড়ল। চাম্পা জানালাগুলো আটকানোর চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। আস্তে আস্তে রাত গভীর হতে লাগল ঝড়ের গতিও বাড়তে লাগল। চারিদিকে গাছ পালা পড়ার শব্দ শোনা যায়, মানুষের চিৎকার শোনা যায়। সারারাত তারা দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি। সারারাত বসেই কেটে গেল।

ছোট্ট শিশু চাম্পার চোথে বুলবুল এর তান্ডব (2)

চাম্পা বার বার ঈশ্বরকে বলতে থাকে ঝড় যেন এবার থেমে যায়। কারো যেন কোন বিপদ না হয়। ঝড়ের পরে সবাইকে যেন সুস্থ দেখতে পায়। ১০ নভেম্বর রবিবার সকালে ঝড় থেমে গেলে বাড়ীতে চলে যায় সে। গিয়ে দেখে বাড়ীর গাছপালা ভেঙে ও আসবাসপত্র কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও ঘরটি নতুন বাঁধা থাকায় ঘরটি ঠিক ছিল। সৃষ্টি কর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাবা মায়ের সাথে ঘরবাড়ি পরিস্কারের কাজে সহযোগিতা করে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.