Posted in

এরাউন্ড মি বিডি- একটি ইউটিউব গ্রাম

ঢাকা থেকে বাহাঊদ্দীন বাহার

প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। আর এই বদলের কাণ্ডারি হচ্ছে হাজারো মানুষ – যাদেরকে আমরা চিনি কিংবা চিনি না। তারা সবার অন্তরালে থেকে বদলে দিচ্ছে-  তার গ্রাম, এলাকা, বাংলাদেশ এমনকি পুরা পৃথিবী। আজ তেমনই কয়েকজনের কথা বলবো।

বদলে দেয়ার হাতিয়ারও কিন্তু নানা। কেউ রাজনীতি করে, কেউ সমাজসেবা, কেউ নতুন কিছু আবিস্কার কিংবা উদ্ভাবন করে কিংবা কেউ ইন্টারনেট এর মাধ্যমে লেখা এবং ভিডিও তৈরি করে। আজ যাদের কথা বলবো- তারা ভিডিও বানিয়ে ইউটিঊবে আপলোড করে একটি গ্রামকে সারা বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে দিয়েছে। পাশাপাশি, এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে- এখান থেকে উপার্জিত টাকা দিয়ে।

 বলছিলাম পৃথিবীর প্রথম ‘ইউটিঊব গ্রাম’ হিসেবে  স্বীকৃতি পাওয়া কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রাম। যে গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ভিডিও বানানোতে অংশগ্রহণ করেন। তুলে ধরেন গ্রামের সাধারণ জীবন-যাপন এবং রান্না-বান্না।  গ্রামের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রার উপরে ভিডিও তৈরি করে প্রচারিত হয় এই চ্যানেলে। শিমুলিয়া গ্রামটি এরই মধ্যে আলোচিত সংবাদ হয়ে উঠেছে।  এ গ্রামের লিটন আলী খান সহ আরো ২৫-৩০ জন মিলে একটা ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন স্থানীয় দেলোয়ার মাস্টারের নেতৃত্বে। গ্রামীণ জীবন, মূলত রান্না-বান্নাকে তারা তুলে ধরেছেন বিশ্ব দরবারে। শত শত মানুষের জন্য রান্না করা হয়। আর এ রান্নার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শৈল্পিকভাবে তুলে ধরা হয় ভিডিওতে। এখানে নেই কোনো উপস্থাপনা, নেই কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। গ্রামের মানুষের সহজাত কথা বার্তাগুলোই স্বাভাবিক সাউন্ড সহ হুবহু তুলে ধরা হচ্ছে।  প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ধারণ করা ইউটিউবের এ চ্যানেলের প্রতিটি ভিডিও’র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করে দর্শক। অনুভব করেন যেন নিজের চোখের সামনেই বড় কোনো উৎসবের রান্না চলছে। বর্তমানে ২৫ লাখেরও বেশি মানুষ এরাউন্ড মি বিডি’র সাবস্ক্রাইবার। যদি সাবস্ক্রাইবের ভিত্তিতে ‘এরাউন্ড মি বিডি’ এর অবস্থান  বাংলাদেশে চতুর্থ কিন্ত বৈচিত্রময় ইস্যু নির্বাচন এবং সহজ সরল সাধারণ উপস্থাপনের জন্য আর চ্যানেল গুলোর চেয়ে আলাদা। একইভাবে অন্য চ্যানেলগুলোর বেশিরভাগ কন্টেন্ট নগর এবং নতুন প্রজন্মের জন্য নির্মিত হলেও ‘এরাউন্ড মি বিডি’ গ্রামীণ এবং এর দর্শক সকল প্রজন্মের। অন্য একটা জায়গা থেকেও এই চ্যনেলটা আলাদা- আর সেটা হলো এর পিছনের কারিগর যারা তারা কখনই কোনো ভিডিওতে সামনে আসে না। যেখানে বাংলাদেশের অন্য চ্যনেলের কারিগরদের মাঝে নিজেদের শো-অফ এবং হিরোইজম এর একটা প্রচ্ছন্ন ছাপ থাকে।

প্রতি সপ্তাহে একটি বা দুটি ভিডিও আপলোড হয় ‘এরাউন্ড মি বিডি’ চ্যানেলে। ভিন্ন এবং আকর্ষণীয় থাম্বনেইলের কারণে যেকোন ব্যক্তির মনে হবে দেখি না একটু ভিডিওটা। এভাবেই চ্যনেলটি বাংলাদেশের চতুর্থ এবং সারা পৃথিবীর মধ্যে প্রথম ইউটিউব গ্রাম। এই ইউটিবের গড়ে মাসিক আয় প্রায় ৫ লাখ টাকারও বেশি। যে টাকাটা আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে পুরোটাই ব্যায় করা হয় গ্রামের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক এবং গ্রামের মানুষের আনন্দ এবং বিনোদনের কাজে।

কিন্তু যে বিষয়টি আমাকে এই প্রসঙ্গ নিয়ে লিখতে উৎসাহ জুগিয়েছে- সেটি হচ্ছে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ভিত্তিক এই কার্যক্রম যে গ্রামে চালানো হয় এবং যে গ্রামের জয়জয়কার সারা ইন্টারনেট দুনিয়ায়- সেই গ্রামে নেই কোন উচ্চ গতি সম্পন্ন ইন্টারনেট সেবাও। এমন প্রত্যন্ত গ্রাম এটি। সেই গ্রামটিই মাতাচ্ছে ইউটিঊব গ্রামের সকল মানুষকে সাথে নিয়ে। কিন্তু কিভাবে সম্ভব? সেই গল্পটি আরও বেশি আকর্ষণীয় এবং সেই সমস্ত গ্রামের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণারও। প্রতি সপ্তাহে এই গ্রামের যুবকেরা গ্রামের মানুষকে সাথে নিয়ে গড়ে প্রায় ৪টি ভিডিও বানায় এবং সেটি মেমোরি কার্ড বা পেন্ড্রাইভে করে বাসে ঢাকায় পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ঢাকায় সেই ভিডিওগুলো এডিট করে আপ্লোড করা হয়- ‘এরাউন্ড মি বিডি’ চ্যানেলে। এতো বেশি ঝক্কি-ঝামেলা পার করেই আজ এরাউন্ড মি বিডি এর জয়-জয়কার! যে সমস্ত গ্রামের মানুষ ভালো ইন্টারনেট সেবা নেই বলে বিশ্ব দরবারে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারছে না। তাদের জন্য এই গল্প সত্যিই অনুপ্রেণার।

একটি ভিডিও তে লিটন আলী খানকে জিজ্ঞাসা করা হয়- ‘এরাউন্ড মি বিডি’ নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? জবাবে লিটন বলেন, “আমার পরিকল্পনা এটির পরিধি আরও বাড়াতে হবে। তারপরে এর আয় থেকে আমার লোকদের সমর্থন করবো । আমি আমার গ্রামকে একটি পর্যটন স্থান করতে চাই। পর্যটকরা আমার গ্রাম পরিদর্শন করবেন। তারা রান্না সব দেখতে পাবেন। আমি আমার মানুষের জন্য আরও বিনিয়োগ করতে চাই। ফলে তাদের জীবন আরও ভাল হবে। এবং যদি আমি তাদের জীবনযাত্রার উন্নতিতে অবদান রাখি; এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে”।     

 ইতোমধ্যেই ‘এরাউন্ড মি বিডি’ টিম গ্রামে একটি পরিবেশ বান্ধব বিনোদন থিম পার্কও তৈরি করে ফেলেছে। গ্রামীণ জিনিসপত্র দিয়ে খোকসার শিমুলিয়া গ্রামে তৈরি করা হয়েছে ‘থিমপার্ক’। এই পার্ক কি ভাবে বানানো হয়েছে, তার উপরেও আছে ভিডিও। সহজ, সরল গ্রামীণ জীবনে আনন্দ দিতে গেলে নিজেদের চেষ্টায় যতটা করা সম্ভব, সবই যেন করা হচ্ছে এই ইউটিউব গ্রামে।

বদলে যাক হাজারো গ্রাম শিমুলিয়ার মতো। বদলের হাতিয়ার হোক নতুন নতুন প্রযুক্তিও- ইউটিউবের মতো। আর এই বদলের কান্ডারি হোক দেলোয়ার, লিটনের মতো নতুন প্রজন্মের হাজারো যুবক।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.