Posted in

নাটোরের একটি যুব সংগঠনের গল্প

নাটোর থেকে ফিরে, অমিত সরকার

সমৃদ্ধ সমাজ বলতে আমরা বোঝাতে চাই এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা যেখানে মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করবে, প্রতিটি শিশুর জীবন হবে নিরাপদ, যেখানে মানুষের কর্মসংস্থান থাকবে, মানুষ হবে সুশিক্ষিত, বাল্য বিবাহ ও যৌতুক প্রথার মত ব্যবস্থা মানুষ নিজেই পরিত্যাগ করবে। সমৃদ্ধ সমাজে সবাই বড়দের সম্মান ও ছোটদের ¯েœহ করবে এবং অধিকার বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। সমাজের মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর সকলে যতœশীল ও শ্রদ্ধাশীল হবে। এমন সমাজ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার জোয়াড়ীয়া ইউনিয়নের চর-নটাবাড়িয়া গ্রামের এক দল তরুণ একত্রিত হয়ে গড়ে তুলেছেন জনসেবামূলক অরাজনৈতিক ও অলাভজনক “ঐক্য সভা” নামক যুব সংগঠন।
you-1
তরুণরা এমন সংগঠন গড়ে তুলেছেন গত ২০১২ সাল থেকে। ওই সময় থেকেই তারা শিক্ষা, বাল্যবিবাহ, মাদক, ইভটিজিংসহ অন্যান্য সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন, সচেতনতা তৈরির জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ান। ওই সময় থেকে তারা গ্রামের বয়স্ক দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে ঈদে সেমাই, চিনি, দুধ, বাদাম এবং শীতবস্ত্র বিতরণ করেন! তাদের কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়ে তারা জন্ম ও মৃত্যুর তারিখসহ অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের জন্য গ্রামের সকল পরিবারের ভূমিষ্ট শিশু ও মৃত্যু বরণকারী ব্যক্তিবর্গের জন্ম ও মৃত্যু সনদ তৈরি ও প্রদানে সহযোগিতা করেন। গ্রামের  কোন মানুষের রক্তের সমস্যা হলে তারা এগিয়ে আসেন। এভাবে তারা বিনামূল্যে গ্রুপ নির্ণয় ও ব্লাড ইউনিট গঠন করেন। শিক্ষা সম্প্রসারণ ও সচেতনতা তৈরির জন্য তারা সংগঠনের সদস্যদের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণের আয়োজন তরেন। এছাড়া গ্রামের মধ্যে শান্তি শৃঙ্খলা আনয়ন, সৌহার্দ্য সম্পর্ক তৈরি ও সংঘাত নিরসনের জন্য ছোট ও বড় সবাইকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করেন।
Presentation1
‘ঐক্য সভা’ সংগঠন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে সংগঠনের সভাপতি মো. হাফিজুল ইসলাম বলেন, “তরুণ ও যুবকদের একত্রিত উদ্দেশ্য নিয়েই সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমরা বিশ্বাস করি তরুণ সমাজ সুপথে চললে সে সমাজ, জাতি বা রাষ্ট্র উন্নত হয়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা মনে করি তরুণদের হাতেই আছে একটি সমাজকে পরিবর্তনের মূলমন্ত্র যা গঠন করতে পারে একটি সমৃদ্ধ সমাজ। তাই আমরা এই তরুণ ও যুব সমাজ একত্রিত করি যাতে তারা দল, মত, পথ, ধর্ম, বর্ণের বিবেচনা না করে সবাই উপকারে কাজ করে যায়।” এই সংগঠনের ৩৫ জন সদস্য রয়েছে। এলাকায় সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই সংগঠনের জন্ম হয় বলে তিনি জানান।

এই সংগঠনের সভাপতি তাদের কাজের ক্ষেত্র বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “এলাকার কোন প্রসুতি মা বা অসুস্থ ব্যক্তি যাতে রক্তের অভাবে মারা না যান বা কষ্ট না পান সেজন্য চর নটাবাড়িয়া গ্রামে “জীবন্ত ব্লাড ব্যাংক-১” এবং জোয়ারী গ্রামে “জীবন্ত ব্লাড ব্যাংক-২” নামে দুইটি স্বতন্ত্র ব্লাড ইউনিট গঠন করেছি। প্রতিবছর বিভিন্ন একটি করে ব্লাড ইউনিট গঠনের লক্ষে কাজ করে চলেছি।” অন্যদিকে শিক্ষার হার বাড়ানো ও শিক্ষার মান উন্নয়নে এ সংগঠন প্রতিবছর জেএসসি, পিএসসি, এসএসসি, এইচএসসি  শিক্ষার্থীদের পুরুষ্কিত করা এবং শিক্ষার্থীদের এবং অভিভাবকদের নিয়ে গ্রাম পর্যায়ে ও স্কুল পর্যায়ে সমাবেশের আয়োজন করে। তিনি বিশ্বাস করেন প্রতিটি সমাজে যদি তরুণদের নিয়ে একটি করে ‘ঐক্য সভা’ সংগঠনের তৈরি হয় তাহলে দেশের সমাজব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে। মূলত এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তারা নিজ গ্রামের পাশাপাশি অন্য গ্রামগুলোতেও কাজ করে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।
you
তরুণদের গড়া ‘ঐক্য সভা’ সংগঠনটির কার্যক্রম নিয়ে গ্রামের মানুষ বেশ সন্তুষ্ট। তারা তরুণদের এ ভূমিকা দেখে আশাবাদী হচ্ছেন যে, ভালো কিছু হতে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে চর-নটাবাড়িয়া গ্রামের কৃষক মো. কলিমুল্লা বলেন, “আমারে গ্যেরামের ছাওয়ালপাল একসাথে মেলা ভালো কাম করতিচে। গ্যেরামে আমারে বিপদে কাছে থাকে, একটা কতা কইলে শুনে। গ্যারামের প্রধান মাতবরেরা যদি তারে পাশে থাকতে তারা আরো অনেক দূর আগাইত”। একই গ্রামের আর একজন কৃষক মো. মাহাবুব বলেন, “আমার দুই ছাওয়াল এই সংগঠনে আছে। তারা আমাদের সবার ভালো করার জন্য কাজ করতেছে। যারা ভালো করে কাম করে আল্লাহ তার কাছে থাকে। এখন গ্যারামে কোন মারামারি নাই, আমরা সবাই সকলের দুর্দিনে আগাই। রাতে রক্তের জন্য কাউরে না পাইলেও এই ছাওয়ালেরা পাশে থাকে। সবাই মুরুব্বি দেখলে সালাম দেয়। গালাগালি, তাস খেলায় কিনবা রাইত করি ছালপাল বাইরে থাকে না। বাহির গ্যেরামের ছাওয়াল পাওয়াল এই গ্যারামে আড্ডা দিতে পারে না”। একই গ্রামের মো. দেলোয়া হোসেন (৪৫), মো. আনারুল্লা (৫৫), মোছা সেলিনা আক্তার (৪২) মোঃ আমিনুল (৪৫) সহ আরো অনেকেই এই সংগঠন সম্পর্কে কলিমুল্লা ও মাহাবুবের কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলান।

ঐক্যসভা সংগঠনের তরুণদের সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামের মানুষের কাছে উদাহরণ হতে পারে। সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে দূর হবে সমাজের সকল অপরাধ, রক্ষা পাবে প্রকৃতিক সম্পদ, নিশ্চিত হবে সকল প্রাণের বেঁচে থাকার অধিকার। এমন সমাজই সবাই আশা করেন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.