Posted in

প্রকৃতির কোন সৃষ্টিই অমূলক ও অবান্তর নয়

মানিকগঞ্জ থেকে শিমুল কুমার বিশ্বাস

সম্প্রতি সিংগাইর উপজেলায় অনুষ্ঠিত ফল ও বৃক্ষ মেলায় প্রথমদিন থেকেই দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে কৃষক ইব্রাহিম মিয়ার ঔষধি বৃক্ষ। বাড়ির আঙ্গিনায়, ঝোপঝাড়ে আপনা আপনি জন্মানো ঔষধি গুল্মলতা মেলার প্রদর্শনী স্টলে দেখে অভিভুত হয়েছেন অনেক দর্শনার্থী। অনেক দর্শনার্থী ছিলেন, যারা  গাছগুলো চেনেন তবে নাম জানেন না। আবার কেউ নাম জানেন তো গুণ জানেন না।  তাই মেলায় এসে কৃষক ইব্রাহিম মিয়ার কাছ থেকে শিশু কিশোর, শিক্ষার্থী, যুবক, কৃষক, বিভিন্ন পেশাজীবীসহ সহশ্রাধিক নারী-পুরুষ দর্শনার্থী এ সব গাছের নাম ও উপকারিতা জানার চেষ্টা করেছেন। আর এই  জানার মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীগণ ঔষধি বৃক্ষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করেন। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন। বন-বাদারে, জঙ্গলে এমনকি মানুষের আঙিনায় যেসব উদ্ভিদ ও প্রাণ রয়েছে সেগুলো কোন না কোনভাবে মানুষের উপকারে আসে। মেলায় কৃষক ইব্রাহিম মিয়ার স্টলটি কিছুটা হলেও দর্শনার্থীদের চিন্তা ও চেতনায় প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির গুরুত্ব ও উপকারিতার বার্তাটি দিতে পেরেছে।

Tree-1
ডন্ড কলস, আষটে গাছ, পিপুল পাতা, শতমুলী, অগ্নিশ্বর, দুধ কচু, অগ্নিশ্বর কলা, থানকুনি পাতা, পাথরকুচি প্রভৃতি গাছ মেলার প্রদর্শনীতে থাকবে এটা হয়তো অনেকের ভাবনাতে ছিল না। যে কারণে অপ্রত্যাশিতভাবে মেলার প্রদর্শনী স্টলে গাছগুলো দেখে বিষ্মিত হয় ছোট শিশু সৌরভ। মায়ের সাথে মেলাতে এসে দেখে, নিজের বাড়ির পাশের অনেক গাছ। যেগুলো অনেক সময় খেলার ছলে তুলে ফেলে সে। মায়ের কাছে জানার চেষ্টা করে গাছগুলোর নাম। মা সুবর্ণা রাজীব তাই ছেলেকে যতœ করে বুঝিয়ে দেন গাছের গায়ে লেখা নাম ও উপকারিতা দেখে।

সিংগাইর উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে অনুষ্ঠিত এই মেলায় মোট ২৬টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেন। বন বিভাগ স্কুল পড়–য়া ছাত্রদের মাঝে বিতরণ করেছেন নানা প্রজাতির বৃক্ষ। এলাকার ছোট খাটো ৫টি নার্সারি তাদের পরিচিতি বাড়ানোর জন্য প্রদর্শনীতে এনেছেন নিজ নিজ নার্সারির সেরা গাছের চারাটি। সেখানে কৃষক ইব্রাহিম মিয়া তুলে এনেছেন তার বাড়িতে সংরক্ষিত নানা জাতের ঔষধি গুল্ম ও লতা। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, শুধু ফল ও কাঠ গাছই আমাদের জীবনের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং আমাদের ভালোভাবে বাঁচার জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব আছে বাড়ির আশেপাশে জন্মানো গাছ, লতাপাতাসহ নানা জাতের উদ্ভিদের। এ গুলোকে আমরা যেন আগাছা মনে করে নষ্ট করে না ফেলি নেই আহ্বান তাঁর। তাঁর মতে, আমাদের আশে পাশে যে সব গাছগুলো আপনা-আপনি জন্মে ,সেই গাছ কখনো আমাদের নিরাপদ খাদ্যের যোগানদাতা আবার কোন কোন গাছ আমাদের রোগমুক্ত রেখে শরীরকে করে তোলে স্বাভাবিক কর্মপোযোগী।

Tree-2কৃষক ইব্রাহিম মিয়ার নিকট থেকে প্রতিদিন ঔষধি গাছের গুনাগুণ ও উপকারিতা জানার চেষ্টা করেছেন ২০০ শতাধিক স্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থী। জানার আগ্রহে কমতি ছিল না বায়রা, তালেবপুর, জামসা, গোবিন্দল, জয়মন্টপ, ধল্লা হ বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত শতাধিক কৃষক, কৃষাণী, পেশাজীবীসহ সাধারণ নারী-পুরুষের। শিক্ষার্থী, যুবক, কৃষক, চাকুরীজীবীসহ ৫০ জন দর্শনার্থী ইব্রাহিম মিয়ার ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন, চাহিদা দিয়েছেন নানা ধরনের ঔষধি গাছের। মন্তব্য খাতায় প্রকাশ করেছেন তাদের ভালো লাগার অনুভুতি। আগ্রহ তৈরি হয়েছে ঔষধি গাছ আলাদাভাবে সংরক্ষণ করার। তাইতো বেগুনটিউরি গ্রামের নবীন কৃষক ইস্্রাফিল মিয়া মন্তব্য খাতায় লিখেছেন, “আমার বাড়ির আশেপাশে অনেক গাছ আছে। আমি সে গুলো কেটে ফেলি। এখন এর গুণ জানলাম তাই আর কাটবো না। আমি এগুলো আলাদাভাবে সংরক্ষণ করবো।” ইব্রাহিম মিয়ার স্টল পরিদর্শন করে ইতিবাচক অনুভুতি প্রকাশ করেছেন সিংগাইর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ারা খাতুন। তিনি বলেন, “ঔষধি গাছের উপকারিতা জানানোর জন্য এ স্টলটির উদ্যোগটি যথেষ্ট প্রসংশনীয়। এ স্টল থেকে দর্শনার্থীদের অনেকে গাছের নাম ও গুণ জানার সুযোগ রয়েছে।” উপজেলা নির্বাহী অফিসারও ঔষধি বৃক্ষের গুরুত্ব তুলে ধরেন তার আলোচনায়।

একসময় বাংলাদেশে ৪৫০ থেকে ৫০০ প্রজাতির ঔষধি লতাগুল্ম থাকলেও আমাদের চেনা ও জানার সীমাবদ্ধতার কারণে আজ তা কমতে বসেছে। স্বাভাবিকভাবে আমরা কাঠ এবং ফল গাছের প্রতি গুরুত্ব দিলেও অবহেলা করি আমাদের বাড়ির পাশে জন্মানো ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ লতাগুল্মকে। ফল ও বৃক্ষ মেলায় তাই কৃষক ইব্রাহিম মিয়া সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন দেশী ফল যেমন আমাদের পুষ্টি দেয়, ফলজ এবং বনজ গাছ যেমন আমাদের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে, তেমনি ঔষধি গুল্ম লতা রোগ মুক্ত করে ফিরিয়ে দিতে পারে স্বাভাবিক জীবন। তাই এ গাছগুলোর প্রতি সকলেরই আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.