Posted in

প্রাণবৈচিত্র্য এবং নারীর সম্পর্ক

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির এক অনবদ্য সম্পর্ক রয়েছে। পৃৃথিবীতে শুধু মানুষ নয়, প্রতিটি প্রাণেরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আছে নিজেকে বিকশিত করার অধিকার। বিকাশ বা বিবতর্ন মানে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা নয়। প্রকৃতি এক সময় নিজে নিজেই বিবর্তিত হয়েছে এবং মানুষ প্রকৃতির অংশ হয়ে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক সভ্যতার বিকাশ ও নিত্য নতুন আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীতে প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রাণের বিকাশের প্রক্রিয়াই আজ ধ্বংসের সন্মূখীন।

মানুষ যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির বিপুল ভা-ারের সম্পদ ব্যবহার করে আসছে। সেগুলোর উপযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগি করে তুলছে। প্রাকৃতিক সম্পদ আর নিজের জ্ঞান-অভিজ্ঞতার ফসলকে একত্রিত করেই এগিয়ে চলছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বলেই তার পক্ষে এই চর্চা করা সম্ভব। ঈগল অনেক উঁচুতে উড়তে সক্ষম, বৃহৎ আকৃতির তিমি মাছ গভীর সমুদ্রে বিচরণ করে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা সৃজনশীলতা আছে কি? তারা প্রকৃতির অংশমাত্র। কিন্তু মানুষ প্রকৃতিমাত্র নয়, তার মাঝে সৃজনশীলতার স্বভাব আছে বলেই প্রাকৃতিক ইতিহাস ছাড়াও মানুষের নিজস্বতার একটা ইতিহাস আছে, যা প্রকৃতির অন্যান্য স্বত্তার মাঝে নেই। মানুষ সৃষ্টি করতে জানে, জানে নতুন করে গড়তে, ধারণ এবং লালন করতে। মানুষের সৃজনশীলতার জন্যেই আমাদের প্রাণবৈচিত্র্য এখনো টিকে আছে। আর এই প্রাণবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার পেছনে আমাদের দেশের নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পৃথিবী সৃষ্টির পর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেখানেও নারীদের দ্বারাই প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষিত হয়েছিল।

বীজেই প্রকৃতি, বীজেই সৃষ্টি
আমাদের মতো দরিদ্র জনগোষ্ঠী সাধারণত কৃষি প্রাণবৈচিত্র্যের উপরই নির্ভরশীল। পৃথিবী যখন থেকে মানুষের বসবাসের উপযোগী হয়েছে, তখন থেকেই তার জীবনধারণের জন্য প্রাণবৈচিত্র্যের বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে আসছে। হাজার বছর ধরে কৃষকের আবিষ্কারেই কৃষি ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলিয়ে যারা আমাদের অন্ন যুগিয়েছেন তাঁদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার উপর গড়ে উঠেছে কৃষি সভ্যতা। আর এই সভ্যতার মূল উপাদান হচ্ছে বীজ। বীজ সংরক্ষণের জ্ঞান এবং কৌশল অত্যন্ত মূল্যবান। আর এই মূল্যবান কাজটিই করে আসছেন আমাদের দেশের নারীরা।

Hap
কৃষাণীরা সারাবছর ধরে নানা জাতের বীজ (ধান ও বিভিন্ন প্রকার সব্জী) সংরক্ষণ করে আমাদের কৃষিকেন্দ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যকে করে তুলেছে সমৃদ্ধ। মাটির গভীর মমতায় বীজ থেকে চারা গাছের জন্ম হয়। সেই চারা গজানোর আগে পর্যন্ত বীজের সুরক্ষা দেন আমাদের নারীরা। তাঁরা পরম যত্নে, নিজের সন্তানের মতো মমতা দিয়ে বীজ সংরক্ষণ করেন। সেই বীজের ফসল খেয়েই আমরা বেঁচে থাকি। কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে তারা সব সময় অন্তরঙ্গভাবে জড়িত। কোন বীজ কখন রোপণ করতে হবে, কোন মাটিতে কেমন ফসল হবে এগুলোও তাদের তথ্য ভা-ারে আছে। শস্য কাটার পূর্ববতী সময় থেকে পরবতী সময় পর্যন্ত নারীরা ধৈর্য্য সহকারে প্রতিটি কাজের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। বীজ  রোপণ, শস্য মাড়াই, ঝাড়া, বাছা, সেদ্ধ করা, শুকানো এমনকি বীজ সংরক্ষণ, তথা কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার মতো গুরুত্ব¡পূর্ণ কাজ গুলো নারীরাই  যুগ যুগ ধরে করে আসছেন।

মাটির ঢেলায় গড়ি প্রাণের অবয়ব
প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্যতম উপাদান মাটি। এই মাটিতে আমরা শস্যদানা রোপণ করি, ঘর বানাই। আরো কতো কি ! আবার এই মাটি দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে এক শ্রেণীর জনগোষ্ঠী তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। নারীরা তাদের দুই হাতের ছোঁয়ায় মাটির ঢেলা ভেঙে তৈরি করেন প্রকৃতির অবয়ব। ছোট ছোট খেলনা পুতুল, পালকি, গরু, ষাঁড়, ঘর, নৌকা, বিভিন্ন রকমের ফল, গাছ, পাখি ইত্যাদি। প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম পরিবেশের এমন কোনো উপাদান নেই যে তারা তৈরি করেন না! মাটির তৈরি এই উপকরণগুলো আমাদের দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। এগুলো বিভিন্ন মেলায়, হাটে ও বাজারে বিক্রি করে তাঁদের সংসার চলে। বলা যায় প্রকৃতিই তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছে। আমাদের খাবার তৈরি করার জন্য যে চুলা তৈরি করা হয় সেটিও মাটি দিয়ে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল এখনো জ্বালানির জন্য জৈব উৎস বা প্রকৃতির উপাদানের উপর নির্ভরশীল। যেমন বিভিন্ন গাছের শুকনো পাতা, ডালপালা, খড়কুটো, গোবরের ঘুটি, বাঁশের কঞ্চি ইত্যাদি। এই উপাদানগুলোও সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা নারীর গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

গাছেই জীবন, গাছেই প্রাণ
মানুষের চার পাশের প্রকৃতির উদারতা, গ্রামীণ জনগণের চলার পথ বা বেঁচে থাকাকে আরো সহজ করে দিয়েছে। হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে আসে থানকুনি হেলেঞ্চা, গিমাইএর মতো অত্যন্ত মূল্যবান পুষ্ঠিকর সব শাকপাতা ও ঔষধি গাছ। যুগের পর যুগ ধরে এ সমস্ত অচাষকুত উদ্ভিদ একদিকে যেমন আমাদের খাদ্যের যোগান দিয়ে আসছে অন্যদিকে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। Hap-1আমদের চারপাশে জন্মানো প্রত্যেকটি বিভিন্ন বনজ গাছেরই রয়েছে ঔষধি গুণ। আজন্মকাল থেকেই মানুষ গাছের এই গুনাগুণ উদ্ভাবন করেছেন এবং ব্যবহার করে আসছেন। নিজের জন্য ও পশু পাখির চিকিৎসায় নানা প্রকার রোগ নিরাময় এবং বিভিন্ন পথ্য হিসাবে ঔষধি গাছের ব্যবহার ও চর্চা করে আসছেন গ্রামীণ নারীরা। পারিবারিক চিকিৎসার প্রাথমিক ধাপ শুরু হয় নারীর হাত ধরেই। এই কাজে নারীর জ্ঞানের সাথে যুক্ত হয় স্থানীয় জাতের বিভিন্ন ঔষধি গাছ। যেমন থানকুনি, দূর্বা, ভাইডেরা, দলকলস তুলসী, নিম, ঘৃতকুমারী, উলট কম্বল, পাথর কুচি, বেল, মনিরাজ ইত্যাদি। এই গাছের নানান অংশ ব্যবহার করে তাঁরা নিজের পরিবারের সদস্যসহ অন্যান্যদের চিকিৎসা করেন। এসব ভেষক চিকিৎসায় কোন পার্শ¦ প্রতিক্রিয়া নেই। খরচ কম, স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়। এর ব্যবহার মানুষজন বছরের পর বছর ধরে করে আসছে। এই গাছগুলো ব্যবহার করে যেহেতু বিভিন্ন ঔষধ তৈরি করা হয়, তাই এগুলো তারা সংরক্ষণ করেন।

বাঁশের বুননে সাজাই কৃষকের ঘর
প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ভরশীল মানুষের জীবন যাত্রা প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। প্রাণবৈচিত্র্যের আর একটি উপাদান হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ। পৃথিবীতে ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্ভিদ হচ্ছে বাঁশ। বহু বছর আগে থেকেই বাঁশের নানাবিধ ব্যবহার হয়ে আসছে। যেমন বাঁশের সাহায্যে ঘর তৈরি, মাচা, মই ইত্যাদি। তাছাড়া এই বাঁশের সাহায্যেই আমাদের দেশের কুটির শিল্পিীরা তৈরি করছে নানা প্রকার কৃষি ও গৃহস্থালী উপকরণ। খলই, চালুন, ডালা, কুলা, ধাড়ি, চুকরা, বাইর, পাখা ইত্যাদি। প্রতিটি উপাদানই একটি কৃষক পরিবারে ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আর এই উপাদানগুলো তৈরি করেন আমাদের নারীরা। এগুলো বিক্রি করে একটি সংসারের খরচ মেটানো যায়। এগুলো তৈরি করতে যেহেতু বাঁশের প্রয়োজন হয়, তাই তারা নিজেদের বাড়িতে বাঁশও রোপণ করেন।

Hap-2
প্রকৃতির মধ্যে প্রত্যেকেই একে অপরের সঙ্গে কোনো না কোনো সম্পর্কে আবদ্ধ বা নির্ভরশীল। প্রাণের বৈচিত্র্য ও পরষ্পরের বিচিত্র সম্পর্ক রক্ষা ও বিকশিত করাও নারীদের আরেকটি চর্চা। তাঁরা বিভিন্ন প্রাণীসম্পদ পালনের কাজটিও যত্ন সহকারে করে থাকেন।  প্রাণীগুলোকে নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবেই গণ্য করেন। স্থানীয় জাতের সকল ধরণের গৃহপালিত পশু পালন একদিকে যেমন লাভজনক তেমনি প্রত্যেকটি পরিবার প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও পরিগণিত হয়।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একজন নারী যতগুলো কাজের সাথে যুক্ত থাকেন তার প্রতিটিতেই আছে বৈচিত্র্য এবং প্রাণবৈচিত্র্য। আর এই বৈচিত্র্যতার সাথে আছে তাঁর স্থায়িত্বশীল চর্চা। কোনো সংজ্ঞার ভেতর দিয়েই নারীর কাজকে বাঁধা যাবেনা। নিজের অজান্তেই প্রাণবৈচিত্র্যের কতো উপাদান যে তাঁরা সংরক্ষণ ও ব্যবহার করছেন এটা বুঝতে পারেননা। নিজেদের প্রয়োজনেই বিভিন্ন প্রাণবৈচিত্র্যের উপাদান হাতে তুলে নিয়েছেন এবং টিকিয়ে রাখছেন। আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসকে সামনে রেখে সে সব অগণিত নারী যারা প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করছেন তাঁদের জানাই বারসিক’র পক্ষ থেকে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.