Posted in

মানিকগঞ্জের ভেজালমুক্ত মুড়ির কারিগররা

মানিকগঞ্জ থেকে আব্দুর রাজ্জাক ॥

মানিকগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের গৃহিণীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মুড়ি তৈরির কাজে। রমজান মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে তাদের এই ব্যস্ততা বেড়েছে কয়েক গুণ। গৃহিনীদের হাতে ভাজা স্বাদে ভরপুর ও সুগন্ধ এই মুড়ি কদর  সারাবছরের চাইতে রমজানে অনেক বেশি। বিশেষ করে মানিকগঞ্জের নবগ্রাম, ধলাই, উপাজানি ও সরুপাই গ্রামের গৃহবধুরা পরম মমতা দিয়ে এই মুড়ি মুড়ি তৈরি করছে।

সম্প্রতি সরজমিন মানিকগঞ্জ-হরিররমাপুর সড়ক সংলগ্ন সরুপাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, হাজেরা বেগম বাড়িতে হাতে ভাজা ভুষিভাঙ্গা মুড়ির সুবাস। পরিবারের সবাই ব্যস্ত মুড়ি তৈরির কাজে। প্রথম রজমানের দুই এক দিন আগে থেকে প্রতি দিন তারা দুই থেকে চার মণ মুড়ি মাটির চুলোয় ভেজে বিক্রি করছে। পাইকাররা এখান থেকে মুড়ি ক্রয় করে জেলা শহরের বড় বড় দোকানে নিয়ে বিক্রি করে থাকে। এছাড়া এই অঞ্চলের সু-স্বাধু মুড়ির কদর এতোই বেশি যার ফলে জেলার গন্ডি পেরিয়ে তা চলে যাচ্ছে ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। শুধু হাজেরা বেগমের বাড়িতেই নয় এই গ্রামের কমপক্ষে আরও ১০টি বাড়িতে চলছে মুড়ি তৈরির ধুম।
2
অপর মুড়ি কারিগর গৃহবধূ আনোয়ারা বেগম বললেন, স্বামীর সংসারে যেদিন পা রেখেছি সেদিন থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি মুড়ি তৈরিতে। ৩৫ বছরের অধিক সময় ধরেই মিশে আছি মুড়ি ভাজার কাজে। ফলে মুড়ি তৈরি ও বিক্রি করে সংসারে স্বচ্ছলতা পেয়েছি। আমার বাড়ির হাতে ভাজা মুড়ির নাম ডাক অনেক জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়েছে।

ইউনুছ মিয়া নামের এক মুড়ি তৈরিকারী ও বিক্রেতা পাইকারী বলেন, “হাতে ভাজা মুড়ির কদর সব চাইতে বেশি থাকে রমজান মাসে। এই মাসে প্রতিদিনই পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে মুড়ি কিনে তা শহরে বেশি দামে বিক্রি করে আসছে। আমরা যে মুড়ি তৈরি করি তাতে কোন ধরনের ভেজাল নেই। নেই কোন  কোন রাসায়নিক ক্ষতিকার পদার্থ। যার কারণে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। তবে সারাবছরের চাইতে রোজার সময় এর চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। প্রতি কেজি বিক্রি করি ৮৫-৯০ টাকা। অনেক কষ্ট হয় তার পরও পূর্ব পুরুষের  এই পেশাকে ছাড়তে পারি না।

মুড়ি তৈরির কারিগর আব্দুল মান্নান জানান, ভুষিভাঙ্গা মুড়ির ধান আনতে হয় বরিশাল থেকে। সেখান থেকে প্রতি মণ ধান আনতে খরচ পড়ে যায় ১২শ’ টাকার ওপরে। এক মণ ধানে ২২ থেকে ২৪ কেজি মুড়ি হয়। হাতে ভেজে মুড়ি তৈরি করতে খুবই পরিশ্রম হয় ঠিকই কিন্ত এই মুড়ি বিক্রি করেই আমাদের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। সারাবছরের চাইতে প্রতিবছর রমজান মাসে মুড়ির কদর বেশি থাকে।
1
পাশের এলাকার ধলাই গ্রামের সকিনা বেগম জানান, সারাবছরের চাইতে রমজান মাসে আমাদের তৈরি হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা অনেক বেশি। মুড়ি ভেজে সারা যায় না। মাথার উপর পাইকাররা দাড়িয়ে থাকে। তবে বরিশাল থেকে চড়া দামে ধান কিনে আনার কারণে লাভ  কম হয়।

আব্দুস সালাম জানান, বাজারে মেশিনে সার দিয়ে ভেজাল মুড়ি তৈরি করায় আমাদের মুড়ি উৎপাদন অনেক কমে গেছে। কারণ ঐসব মুড়ি প্রতিকেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় পাওয়া যায়। আর আমাদের কাছ থেকে এক কেজি মুড়ি কিনতে হলে কমপক্ষে ৮৫-৯০ টাকা লাগে।

পার্শ্ববর্তী দিঘুলিয়া গ্রামের মোঃ মজনু বিশ্বাস জানালেন, একসময় এই গ্রামগুলো মুড়ির গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রত্যেকটি বাড়িতে মুড়ি তৈরি করা হতো। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আধুনিক মেশিন দিয়ে রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে মুড়ি উৎপাদন করায় এ অঞ্চলের মানুষ হাতে ভাজা মুড়ি তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে গেছে। এছাড়া সরুপাই গ্রামের তাহের আলী, আকবর ও আফজাল হোসেনের বাড়িতে চলছে হাতে ভাজা মুড়ি তৈরির ধুম।

মানিকগঞ্জ বাসষ্ট্যান্ড বাজারের পাইকার দোকানি মোঃ শাহ আলম জানান, প্রায় এক যুগ ধরে মুড়ি ব্যবসার সাথে রয়েছি। তবে  গ্রামের  হাতে ভাজা মুড়ি শহরের মানুষের কাছে কদর বেশি। সেখান থেকে ৮৫ থেকে ৯০  টাকায় কিনে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি করি। কারণ এই মুড়িতে কোন ভেজাল নেই। আর রমজান মাসে ইফতারের জন্য এই মুড়ির চাহিদা বেশি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.