সাম্প্রতিক পোস্ট

শ্যামনগরে দখলমুক্ত খাল ও জনগোষ্ঠীর সফলতা

সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে গাজী আল ইমরান

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলী খাল উন্মুক্ত হওয়ায় সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে এলাকাবাসী। দীর্ঘদিন পরে খালের মিষ্টি পানি দিয়ে মাঠে হরেক রকমের চাষে অংশ নিতে পারায় এনিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে উৎসব আমেজ বিরাজ করছে। খালটি একসময় ভরাট হয়ে গেলে সিএমসি কমিটি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দাবিতে গভর্ন্যান্স ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিএনআরএস এর সহযোগিতায় সাতক্ষীরা সহ-ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটি গত এপ্রিল ২০১৮ মাসে কুলতলী খালের উল্লেখিত ভরাট অংশটির প্রায় অর্ধ কিমি অংশ পূনঃখনন করে দেন। এসময় শ্যামনগরের সহকারী কমিশনার (ভুমি), সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, ৭নং মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং ৯নং বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এই খালের পূনঃখনন কাজ উদ্বোধন করেন ও খালটি পূনঃখনন করা হয়। এরপর থেকে স্থানীয় সাধারণ মানুষেরা ভোগদখল করতে থাকলেও একদিন একটি স্বার্থানেষী মহল খালটি তাদের দখলে নিয়ে নেয়। এলাকার সাধারণ মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে গত জুন মাসে শ্যামনগরে এনজিও প্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিডিও ইয়ুথ টিম, জলবায়ু পরিষদ এর সদস্য, সাংবাদিকদের নিয়ে অলোচনার মাধ্যমে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর কুলতলী ও আশেপাশের গ্রামের লোকজন কর্তৃক কুলতলী খাল থেকে অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদের জন্য আবেদন করেন। এরপর প্রশাসন খালটি উন্মুক্ত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।


দীর্ঘদিন দখলদারিত্ব থাকা খালটি উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উন্মুক্ত হয়ে জাল যার জলা তার সৃষ্টি হয়। এদিন উন্মুক্ত হওয়ার সময় সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার জন্য একজনকে ৭ দিনের জেল দেন ভ্রাম্যমান আদালত। খালটি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই এলাকার মানুষ প্রতিনিয়ত মাছ আহরণের মাধ্যমে নিজ পরিবারের পুষ্টি যোগানে সচেষ্ট হতে পেরেছেন। জনগোষ্ঠী তাদের ভাগ্য উন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোনো বিষয়ে উদ্যোগ নিলে তা সফল হওয়া সম্ভব তা প্রমাণ করেছে কুলতলীবাসী। তাদের চেষ্টার সাথে কিছু মানুষের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সেটা হয়ে উঠেছে আরো সফল থেকে সফলতর। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, খালটি উন্মুক্ত করতে তারা বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান সিএনআরএস এবং বারসিক’র কাছে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি দপ্তরে যোগাযোগে সহযোগিতা চাইলে উভয় প্রতিষ্ঠান খালটি উন্মুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে ধারাবাহিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। এলাকাবাসী খালটি উন্মুক্ত করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর আবেদন জানালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাৎক্ষণিক সহকারি কমিশনার ভূমিকে তদন্তপূর্বক খালটি উন্মুক্তের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলেন। সহকারি কমিশনার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন সহকারি ভূমি কর্মকর্তারকে অতিদ্রæত বিষয়টি তদন্ত পূর্বক প্রতিবেদন পাঠাতে বলেন। স্থানীয়রা বিভিন্ন সময় সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্নভাবে মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাহায্য কামনা করেন। ইউনিয়ন সহকারি ভূমি কর্মকর্তা সরজমিনে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন পাঠালে সহকারি কমিশনার ভূমি সরজমিনে গিয়ে এলাকাবাসীর জন্য খালটি উন্মুক্ত করে দেন। এসময় অনেক উৎফুল্লতার সাথে খাল থেকে এলাকাবাসীর মাছ ধরতে দেখা যায়। খালটি উন্মুক্ত হলেও কিছুদিন পরে একরাতে এলাকার একটি প্রভাবশালী মহল খালটি আবারো দখল করে নেন। এসময় প্রশানের হস্তক্ষেপে একদিন পরে খালটি আবার উন্মুক্ত করা হয়। খালটি উন্মুক্ত হওয়ার কিছুদিন পরেই ভারি বর্ষণ হলেও ডুবে যায়নি এলাকার শতশত বিঘা ধান ক্ষেত। এলাকাবাসী এসময় খালপাড়ে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতে শুরু করেন, যা নিজের পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মিটিয়েও বাইরে বিক্রয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পেরেছেন অনেকেই।


সরজমিনে খাল পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, আমন মৌসুমে ধান কাটার সাথে সাথেই বোরো মৌসুমের জন্য খাল পাড়ে পাতার চাতর করেছে এলাকাবাসী যা পূর্বে দখল থাকার কারণে পানির অভাবে সম্ভব হতো না। শুধু ধানের চাতর নয় এলাকার মানুষেরা এখানে রোপণ করেছে সরিষা, বিনা চাষের আলু, ওলকপি, পুইশাক, মূলা, গম, ভূট্টাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি। এলাকার একাধিক চাষীর সাথে কথা বলে জানা যায়, এবারের বোরো মৌসুমে এই খালকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩০০ বিঘার অধিক জমিতে ধান চাষ করা হবে। আর এই জমিতে পানির প্রয়োজন মেটানো হবে উন্মুক্ত হওয়া খাল থেকে। এলাকার চাষী পরিমল কর্মকার বলেন, ‘খালটি দখল থাকায় আমরা দীর্ঘ বছর এই বিলে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করতে পারতাম না, কিন্তু এবছর আমিসহ এলাকার অধিকাংশ কৃষক ধান করার জন্য পাতার চাতর করেছেন। এছাড়া অনেকেই খাল পাড়ে এবং খারের পাশে তাদের জমিতে শীত কালনি বিবিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছে।’


খাল পাড়ে গিয়ে দেখাযায় এলাকার নারী ও পুরুষেরা স্বাধীনভাবে মাছ আহরণ করছেন। এসময় শান্তা রানী নামে মাছ ধরতে আসা এক নারী বলেন, ‘দু একদিন পর পর এসে এখানে মাছ ধরি, যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যায় তা আমাদের সংসারের মাছের প্রয়োজন মিটে যায়।’ এসময় স্থানীয় আরো অনেকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা ধান করতে গিয়ে খালের পানি একেবারে শুকিয়ে ফেলবো না। কারণ আমরা খাল একেবারে শুকিয়ে ফেললে স্থানীয় প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধি অর্থাৎ এই বিলে স্থানীয় মাছের সংকট দেখা দিতে পারে। এজন্য আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি খালের নিচের অংশের পানি রেখে দেওয়া হবে।’ তারা খালটিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্থানীয় মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করতে চান। স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে আরো জানা যায়, খালটি যদি এভাবে উন্মুক্ত থাকে এবং কোনো স্বার্থন্বেষী মহল যদি আর এই খালে দখলের রামরাজত্ব না করে তাহলে খালটি এলাকার মানুষের জন্য পাথেয় হবে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: