Posted in

একজন শামসুন্নাহারের পথচলা

কলমাকান্দা, নেত্রকোনা থেকে গুঞ্জন রেমা

কলমাকান্দা উপজেলার বরখাপন ইউনিয়নের বরখাপন গ্রামে বাস করেন মোছাম্মদ শামসুন্নাহার আক্তার। স্বামী-স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। ছেলে মেয়েরা কেউ লেখাপড়া করছে কেউ আবার চাকুরি করছে। স্বামী মনোয়ারী দোকানের ব্যবসা করেন। বড় ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ডিপ্লোমা শেষ করে এখন চাকুরির অপেক্ষায় আছেন। ছোট ছেলে এইচ.এস.সি পাশ করার পর এখন পুলিশে চাকুরি করছেন। বড় মেয়ে দশম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছেন, ছোট মেয়ে নবম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছেন। অনেক কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হয়েছে তাকে। এখন ছোট ছেলে পুলিশে চাকুরি পাওয়ার পর থেকে কিছুটা কষ্ট লাঘব হয়েছে।


২০১৫ সালে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান দুটি বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করেন একটি হলো সেলাই আরেকটি হলো পুটির কাজ। শামসুন্নাহার আক্তার সেলাই কাজটি করার জন্য সেলাই প্রশিক্ষণে ভর্তি হন। দুটি প্রশিক্ষণ পাশপাশি স্থানে হওয়ায় তিনি দুপুরের খাবারের বিরতির সময় পুটির কাজও দেখে দেখে শিখতে শুরু করেন। এমন করে তিনি নিজ উদ্যোগে দুটি প্রশিক্ষণই আয়ত্ব করে ফেলেন। তারপর শুরু করেন কাজ করা। যখন কাজ করেন তখন খুবই মনোযোগ দিয়ে কাজ করতেন যার ফলে কাজের কোন ক্রটি বিচ্যুতি থাকতো না। খুব শিঘ্রই প্রচার হতে থাকে তার হাজের কাজের পণ্যটির। এভাবে তিনি প্রতিদিনই পুটির কাজের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। একদিকে মনোবল অন্যদিকে অভাব দূর করার প্রাণপণে চেষ্টা সব মিলিয়ে তার কাজের স্পৃহা বাড়তে থাকে। কাজের মান ভালো হওয়ায় পণ্যের চাহিদাও দিন দিন বাড়তে থাকে। পণ্য বিক্রির টাকায় ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের খরচ মিটাতে সক্ষম হন তিনি।
২০১৬ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষক হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় এক মাসের জন্য। তারপর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি দিন দিন পরিচিতি পেতে থাকেন এলাকায়। তারপর তিনি উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে পারি ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট, পপি সৌহার্দ্য-৩ এর নিয়মিত প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান। এখন তিনি পপি সৌহার্দ্য ৩ প্রকল্পের একটি খন্ডকালীন প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। বছরে প্রায় ৭-৮ মাস প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি কাজ করেন। এ পর্যন্ত তিনি ১৩৫ জনকে পুটি ও বাঁশ বেতের কাজ শিখিয়েছেন। কাজ শিখে এখন প্রায় ৪০ জনের মত নারী নিজ নিজ উদ্যোগে কাজ করে সংসারের খরচ কিছুটা হলেও মিটাতে সক্ষম হচ্ছেন।


বাকি অবসর সময়ে তিনি পুটির কাজ করেন। পুটি দিয়ে তিনি তৈরি করতে পারেন প্রায় ১৬ ধরণের জিনিসপত্র। যেমন, মেয়েদের ব্যাগ দুই ধরণের, আপেল, কমলা, আঙ্গুর, ডালিম, কলা, বেগুন, আনারস, স্ট্রবেরি, পুতুল, চাবি রিং, ব্যাগ রিং, চুলের খোপার বেন, ক্লিপ, মালা, টিস্যু বক্স ইত্যাদি। বাঁশ দিয়ে তিনি বিভিন্ন ধরণের উপকরণ তৈরি করতে পারেন যেমন, ৫ ধরণের পাখা, চুকরা, চালুন, ডালা, খাচা, মোড়া ইত্যাদি। সেলাই কাজেও রয়েছে তাঁর দক্ষতা। জামাকাপড় ও নকশিকাঁথা তৈরিতেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এলাকার মানুষের কাছে।


শামসুন্নাহার তাঁর ভালো লাগার বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেন, ‘আমি একদিন বেকার ছিলাম কোন হাতের কাম কাজ জানতাম না তারপর প্রশিক্ষণ নিয়া হাতের কাম কাজ শিখলাম এখন আর আমি বেকার নাই। একটা না একটা কাজ করে আয় রোজগার করতে পারি, তেমনি যে নারীরা এখনো হাতের কাম কাজ না পারাতে বেকার হইয়া আসে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়া দক্ষ মানুষ হিসেব গড়ে তুলতে মন চাই। যারা আমার কাছ থেইকা কাজ শিখসিলো তারা এহন অনেকে কাজ কইয়া টাকা আয় করতে পারতাসে এইডা দেইখা আমার অনেক ভালো লাগে’।


শামসুন্নাহারের একটি দল আছে যারা এমন হাতের কাজে অনেক দক্ষ। তাদের দক্ষতা, জনবল ও শ্রমশক্তি সবই আছে কিন্তু নেই মূলধন। যার ফলে তাদের এই কাজের পরিধি বৃদ্ধি করতে পারছেন না। মূলধন থাকলে উপজেলা শহরে একটি দোকান নিয়ে পণ্য বিক্রি করার পরিকল্পনা আছে তাদের।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.