সাম্প্রতিক পোস্ট

একটি শ্মশান: শত মানুষের প্রশান্তিতে শক্ত হয়েছে সামাজিক সম্প্রীতি

20170226_112542মানুষের মৃত্যু সব সময়ই দুঃখ, কষ্ট ও বেদনার। যে বয়সেই মানুষের মৃত্যু হোক না কেন। কিন্তু ২০১৭ সালের আগে মোহর গ্রামের ৭৫টি পরিারের মানুষের ভাবনায় সব সময় বিরাজ করত মৃতদেহ সৎকার করার জন্য তাঁদের গ্রামে কোন নিদিষ্ট জায়গা না থাকার মনোকষ্ট। গ্রামের গরিব মানুষরা মৃতদেহ সৎকারের এক টুকরো জায়গার জন্য ঘুরতো মানুষের দ্বারে দ্বারে। অতপর গ্রামের “স্বপ্ন আশার আলো যুব সংগঠনে”র প্রচেষ্টা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ভূমি অফিস ও উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় গ্রামের ৫২ শতাংশ খাস জমি শ্মশানের কাজে ব্যবহারের জন্য স্থায়ীভাবে পত্তন পায়। সম্প্রতি গ্রামের একজন প্রবীণ নারী নিরূবালা সূত্রধর (৯৫) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সৎকারের দিনে গ্রামের প্রবীণ কৃষক, নারী ও যুবকদের সাথে গ্রামের শ্মশান প্রাপ্তির আগে ও পরের বিষয় নিয়ে কথা বলেন স্থানীয় যুবক ও সংগঠনের সদস্য উত্তম সূত্রধর ও বারসিক নিউজের পক্ষে অমৃত সরকার

20170226_112627

দুপুর গরিয়ে বিকেল সময় ৪.৩০ মিনিটের কাছোকাছি মোহর হিন্দুপাড়া গ্রামের অধিবাসীদের মধ্য পুরুষ সদস্যরা কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউবা পাট দিয়ে দড়ি তৈরি করছেন, আবার কেউবা পরিকল্পনা করছে কখন মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে। আর নারী সদস্যরা সবাই মাতৃবিয়োগ নারীদের স্বান্তনা দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ দেখে চলেও যাচ্ছেন। যাওয়ার সময় কেউ কেউ বলছেন নিরূবালার ভাগ্য ভালো “নতুন শ্মশানে শান্তির ঘুম দিতে পারবে, বাড়ির মানুষকে আর সৎকারের জন্য বাড়ি বাড়ি জমির জন্য ঘুরতে হবে না”। মানুষের কথাগুলো শোনার পরই শ্রী উত্তম সূত্রধর আমাকে ফোন করে বলে দাদা আমাদের গ্রামের একজন মারা গিয়েছেন আপনি একটু আসুন। ফোন পেয়ে গেলাম, গিয়ে দেখি সবাই ব্যস্ত, প্রবীণদের কেউ শ্মশানের উন্নয়নের কথা বলছেন। কেউবা বলছেন শ্মশানে গাছ লাগানের কথা। বারসিক নিউজের পক্ষে জানতে চাইলাম শ্মশানে কি গাছ লাগানো যায়। এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন গ্রামের শ্রী ক্ষিতেন সূত্রধর (৮৫), শ্রী নরেন সূত্রধর (৮০), শ্রী জতিন্দ্রনাথ সূত্রধর (৭২), শ্রী নিপেন্দ্রনাথ সূত্রধর (৮০)। প্রবীণদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন অমৃত কুমার সরকার।

বারসিক নিউজ: শ্মশানে কি গাছ লাগানো উচিত বা হলে ভালো হয়?
গ্রামবাসী: শ্মশানে নিম, বট, বেল, হরিতকী, চন্দন কাছ লাগানো ভালো। কারণ এগুলোর শাখা প্রশাখা কাজে লাগে।

বারসিক নিউজ: আগে তো আপনাদের শ্মশান ছিলো না, তখন কি কি সমস্যা হতো?
গ্রামবাসী: সমস্যার কোন শেষ ছিলো না। কারণ আমরা সবাই গরিব। আমাদের সৎকার করার জায়গা ছিলো না। আমরা কখনো নিজের উঠানের পাশে বা মানুষের জমিতে সৎকার করতাম। মৃত মানুষটি অভিশাপ নিয়ে মরত। কারণ মৃত ব্যাক্তিকে নিজের বা সার্বজনিন জায়গায় সৎকার না করলে আমাদের ধর্মে মহাপাপ। যে পরিবারগুলো খুব গরিব তাঁরা সারাদিন মৃত ব্যাক্তির দেহ নিয়ে বসে থাকত।

বারসিক নিউজ: শ্মশানের কাজটি কখন এবং কিভাবে আপনারা করতে পারলেন?
গ্রামবাসী: আমাদের গ্রামে “স্বপ্ন আশার আলো” নামে একটি যুব সংগঠন আছে। সে সংগঠনের সদস্যরা ও বারসিক মিলে প্রথমে আমাদের সাথে একটি সভা অয়োজন করে। সেখানে আমরা আমাদের শ্মশান কেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরি। এরপর সেখান থেকে সিদ্ধান্ত হয় গণস্বাক্ষরসহ একটি আবেদনপত্র উপজেলা নির্বাহী অফিস দেওয়া হবে। সংগঠনের সদস্য ও গ্রামের জনগণ মিলে নির্বাহী অফিসারের কাছে আবেদনপত্রটি জমা দিয়ে সমস্যার কথাটি তুলে ধরা হয় হয়। সমস্যার কথা শুনে তিনি উপজেলা ভূমি অফিসে কাজটি সমাধান করার নির্দেশ দেন। এরপর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে মোহর মৌজার একটি খাস জমি মোহর শ্মশানের নামে স্থায়ী পত্তন দেওয়া হয়।

বারসিক নিউজ: আজকে শ্মশান যাত্রা ও শ্মশান প্রাপ্তি বিষয়ে কিছু বলবেন কি?
গ্রামবাসী: যে পরিবারে মানুষ মারা যায় তারাই ভালো বোঝেন স্বজন হারানোর বেদনা কতটুকু। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে আমাদের গ্রামের মানুষের শ্মশান না থাকার মানুষিক কষ্ট যে কি রকম ছিলো তা বলে বোঝানো যাবে না। আজকে শ্মশান যাত্রাকালে সবার মনেই একটি মানুষিক শান্তি বিরাজ করছে। আজকে এই পরিবারটির যে কত বড় উপকার হয়েছে এই শ্মশান। কারণ এই পরিবারের বাড়ির ভিটা ছাড়া কিছুই নেই। শ্রী কালিপদ সূত্রধর (৬৫) বলেন, “এই শ্মশান যদি না পেতাম তাহলে আমার ঘরের পাশে বা অন্য মানুষের থেকে চেয়ে নেওয়া জমিতে আমার মায়ের সৎকার করতে হতো। এতে আমার ও মায়ের দুজনেরই পাপ হতো। শ্মশান প্রাপ্তিটি এক কথায় সবার মনেই একটি প্রশান্তির ছায়া ফেলেছে।

বারসিক নিউজ: আপনাদের গ্রামের ধনী-গরিব সবার এই শ্মশান সম্পর্কে বর্তমানে কি ধারণা?
গ্রামবাসী: একটি সমাজের ধনী গরিব সবারই শেষ যাত্রা হচ্ছে শ্মশান না হয় কবরস্থান। আমাদের এই শ্মশানটি পাওয়ার ফলে গ্রামের সবারই একটি চিন্তাগত পরিবর্তন হয়েছে। যার ফলে আমাদের সমাজে সামাজিক সম্প্রীতির ভিত আরো মজবুত হয়েছে। সামাজিক কাজে সবার মাঝে একাত্মতা বৃদ্ধি হয়েছে।

বারসিক নিউজ: আপনারা নতুন শ্মশানটির উন্নয়নে কি কি চিন্তা করেছেন?
গ্রামবাসী: শ্মশানটি পাওয়ার পর আমরা গ্রামের সবাই মিলে কিছু মাটি কেটে পরিষ্কার পরিছন্ন করে শ্মশানটি উদ্বোধন করি। আবার শ্মশানটির মাঝে একটি পুকুর ছিলো সেখানে আমরা সেচ্ছাশ্রমে সংষ্কার করে গ্রামের সবাই মিলে মাছ চাষ করি। আবার ইউনিয়ন পরিষদে যোগাযোগের মাধ্যমে “কাবিখা” প্রকল্পের জন্য যোগাযোগ করি। প্রথমবার মাছ চাষ করে আমাদের আট হাজার টাকা লাভ হয়। সে টাকা দিয়ে পুকুরের পাড় বাঁধাই করার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি আমরা প্রতিটি পরিবার থেকেও টাকা উত্তোলন করে উন্নয়ন করার চিন্তা করছি। পাশাপাশি এবার বারসিক থেকে আমরা নিম, হরিতকি, অর্জুন ও মেহগনি গাছের চারা পেয়েছি, যা শ্মশানে লাগানো হয়েছে।

গ্রামের এরকম অনেক সমস্যাই আছে যে সমস্যাগুলো সমাধানে রচনা করতে হয় না অনেক বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প। গ্রামের বসবাসকারী মানুষের মধ্য সমস্যাগুলো সমাধানে যদি তাঁদেরই নেতৃত্বে সহযোগিতা করা যায় তাহলে সমস্যাগুলো দ্রুতই সমাধান করা যায়। আর এর মাধ্যমেই গ্রামের মানুষের মাঝে তৈরি হয় ভাতৃত্ববোধ। মোহর হিন্দুপাড়া গ্রামই হতে পারে সমস্যাকবলিত হাজারও গ্রামের উদাহরণ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: