Posted in

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও মানবস্বাস্থ্য

সিলভানুস লামিন

জলবায়ু বলতে সাধারণত ‘আবহাওয়ার গড়’কে বুঝানো হয়ে থাকে। এটি সাধারণত কোন নিদির্ষ্ট এলাকার তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত সংঘটন (বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত), বায়ু, সূর্যালোকের দিন এবং অন্যান্য বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন বলতে জলবায়ুতে পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। এই পরিবর্তনটি সময়ের পরিক্রমায় প্রকৃতিতে অনবস্থতা কিংবা মানুষ কর্তৃক সম্পাদিত বিভিন্ন কর্মকা-ের কারণে সংঘটিত হয়। বায়ুম-ল ও সামুদ্রিক বিভিন্ন উপাদানের মিথস্ত্রিয়ার কারণেও জলবায়ু পরিবর্তন হতে পারে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কোন বিষয় নয়। বস্তুত বিশ্বে মানুষ জাতির ইতিহাসের গতিপথ এবং বিকাশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই মানুষ এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে বা অভিযোজন করতে সমর্থ হয়েছে। অতীতে জলবায়ু মানুষকে পরিবর্তন করতো তবে বর্তমানে মানুষেরা এই জলবায়ুকে পরিবর্তন করছে অতি দ্রুত গতিতে। বর্তমানে আমরা যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা করছি সেটি আসলে মানুষের কর্মকা- বিশেষ করে কার্বনভিত্তিক জ্বালানি তথা কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর মানুষের মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দেখা দিয়েছে। এই জ্বালানিগুলো গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে মানুষের ওপর এই প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা বিশাল বন্যা, শক্তিশালী হারিকেন, সাইক্লোন এবং টাইফুন ও ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো ঘরবাড়ি, অবকাঠামো (রাস্তাঘাট বিদ্যুতিক সংযোগ বাঁধ, পুকুর) বনাঞ্চল, কৃষিজমি, শস্য-ফসল, পশুসম্পদ, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় সম্পদ ধ্বংস করে। মানুষের ওপর প্রভাব হিসেবে ‘শারীরিক বিচ্ছিন্নতা’ কে উল্লেখ করা যায়; বিশেষ করে বিশাল বন্যা ও ভূমিধ্বসের কারণে। শারীরিক ও ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এসব মানুষেরা তাদের শস্য-ফসল, পশুসম্পদ, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় সম্পদের ব্যবহার ও বাজারজাত করতে পারছে না।

Damage 1

পিতৃভূমি, ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারানো বা নষ্ট হওয়া, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষুধা, বিশুদ্ধ পানি ও শক্তি নিরাপত্তাহীনতা, মারাত্মক ও ছোঁয়াছে বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাণবৈচিত্র্য তথা উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে। পানির স্তর আরও নীচে নেমে যাওয়ায় খরা, মরুকরণ প্রক্রিয়া, লবণ পানির অনুপ্রবেশ বৃদ্ধির ফলে ক্ষুধা, দারিদ্র্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পানি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে অর্থনৈতিক সুযোগ, আয়, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক চর্চা অবলুপ্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় মানুষের জীবনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বসতভিটা হারিয়ে যাওয়ায় জলবায়ুু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেকের জীবনাবসান এই উদ্বাস্তু অবস্থায় ঘটেছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব মানুষের ভিটেমাটি ও জমি পানির তলে নিমজ্জিত হয়েছে কিংবা ভূমিধ্বসের কারণে তাদের এসব জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও মানব স্বাস্থ্য
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই তো বরফ গলেছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। নানান দুর্যোগ তো আছেই। বিশ্ব উষ্ণতার কারণে নানান রোগ বালাই বৃদ্ধি পেয়েছে। বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানব সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপাদানগুলো তথা বিশুদ্ধ বায়ু, সুপেয় পানি, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং নিরাপদ আবাসস্থল মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দিনকে দিন অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিই পেতে চলেছে। মারাত্মক ও ছোঁয়াছে বিভিন্ন রোগের বিস্তারও ঘটেছে। অধিক উষ্ণতার কারণে শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের শ্বাসকষ্টসহ নানান শ্বাসযন্ত্র বিষয়ক রোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৩ সালে অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে শুধুমাত্র ইউরোপে ৭০,০০০ অধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে শৈত্যপ্রবাহের কারণে ব্রংকাইটিস, নিউমেনিয়া, হাইপোথেরমিয়া জাতীয় রোগও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্রতিকূল আবহাওয়া মানুষের ঘরবাড়ি, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সুযোগ-সুবিধা এবং অন্যান্য সেবাসমূহ ধ্বংস করেছে। কারণ পৃথিবীর প্রায় ৬০ ভাগ মানুষই সমুদ্র থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে তাদের আবাসস্থল গড়ে তুলেছেন। স্বাস্থ্য বিষয়ক সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। যার কারণে মৃত্যুর হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সম্পদহানী, প্রিয়জনের বিয়োগ ও উদ্বাস্তু হওয়ার আংশকায় মানুষ নানান শারীরিক, মানসিক এবং পাানি, বায়ু ও পতঙ্গবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত মানুষের সুপেয় পানির উৎসগুলোকে অস্তিত্বহীন করে তুলেছে বিধায় মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবিত করে। ফলে মানুষ ডাইরিয়া, কলেরাসহ নানান রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পৃথিবী প্রতিবছর ২.২ মিলিয়ন মানুষ শুধুমাত্র ডাইরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এছাড়া সুপেয় পানির স্বল্পতা খরা এবং দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে। একটি প্রতিবেদন মতে, জলবায়ুজনিত পরির্তনের কারণে ২০৯০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অনেক এলাকার ভূমি খরায় আক্রান্ত হবে এবং চরম মরুকরণ প্রক্রিয়া দ্বিগুণে উন্নীত হবে।

বন্যা আরেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মানুষের প্রাণহানী ও সম্পদহানীর জন্য দায়ি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা হওয়ার হার ও আগ্রাসন দু’টিই বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যা সুপেয় পানির উৎসগুলোকে দূষিত করে এবং পানিবাহিত রোগ হওয়ার প্রবণতাকে বৃদ্ধি করে। এছাড়া বন্যা জীবাণু বহনকারী পোকা তথা মশার জন্মলাভের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। আমরা জানি, মশার কামড় থেকে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া রোগ হয়। বন্যার স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে মশার বংশবিস্তার বৃদ্ধি পায়। ফলে ম্যালেরিয়াসহ অন্যান্য মশাবাহিত রোগের প্রার্দুভাব বৃদ্ধি পায়। এছাড়া বন্যার পানিতে ডুবে অনেকের প্রাণহানী ঘটেছে এবং অনেকে আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করেছে।

অন্যদিকে তাপমাত্রার বৃদ্ধি ফসল উৎপাদনকে ব্যাহত করে। ফলে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কারণে অনেক মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে। পুষ্টিহীনতার কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এতে করে মানুষ সহজে বিভিন্ন রোগের আক্রমণের শিকার হয়। তাই তো দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাভাবিকের চেয়েও রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভার বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কতজন অতিরিক্ত মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে সে হিসাব দেওয়া কঠিন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ সালে শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই অতিরিক্ত আরও ১৪,০০০০ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

জলবায়ু দুর্যোগের কারণে যেসব রোগবালাই দেখা দিয়েছে সেগুলো সব বয়স ও স্তরের মানুষকে আক্রান্ত করলেও শিশু ও বৃদ্ধদেরকেই বেশি নাকাল করেছে। বিশেষ করে অনুন্নত ও উনয়নশীল দেশে যেসব শিশু ও বৃদ্ধ উপকূল অঞ্চলে, দ্বীপে ও পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে তারাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই এখন সময় এসেছে সচেতনতা তৈরির করার। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন যে মানবস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এ বার্তাটি সবার কাছে পৌছে দিতে হবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.