সাম্প্রতিক পোস্ট

পুকুর ফিরে পেলো সৈয়দালিপুরের আশ্রয়ন জনগোষ্ঠী

সাতক্ষীরা, শ্যামনগর থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল
প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুভিটা বিচ্ছিন্ন একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র নুরনগর ইউনিয়নের সৈয়দালিপুর গ্রামের আশ্রয়ন প্রকল্প। ২০০৭ সালের দিকে উপজেলা ও ইউনিয়ন দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অবহেলিত পরিবারদের আশ্রয়ের জন্য সরকারিভাবে ব্যারাকটি তৈরি করা হয় নুরনগর ইউনিয়নের সৈয়দালীপুর গ্রামে মাদার নদীর চরে এক একর জায়গার উপর। একটি শেডে ১০টি ঘর তৈরি করা হয় এবং ২ বিঘার একটি পুকুর খনন করা হয়, যা স্থানীয় ভাবে ১০ ঘর নামে পরিচিত।


২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে শ্যামনগর উপজেলার ২টি ইউনিয়নের ৩টি গ্রামের ১০টি পরিবারকে আশ্রয় দেওয়া হয়। আইলা ঘটে যাওয়ার এই দীর্ঘ সময় পরও নিজেদের বাস্তুভিটায় ফিরে যেতে না পেরে আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাস করছেন তারা।


আশ্রয়ন প্রকল্পে আশ্রয়ন জনগোষ্ঠীর সুষ্ঠুভাবে বসবাসের জন্য গৃহায়ন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে পানির সুব্যবস্থা, স্যানিটেশন ও যোগাযোগের রাস্তা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় সংস্কার বা মেরামতের অভাবে আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর, সুপেয় পানির পুকুর, স্যানিটেশন ও যোগাযোগের রাস্তা বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে, পুকুরটি প্রায় ভরাট অবস্থায় যে কারণে বর্ষা মৌসুমে আশ্রয়ন কেন্দ্রে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে করে ব্যারাকে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হতে থাকে এবং বসবাস অনুপোযোগী হয়ে উঠে।


একপর্যায় ২০১৫ সালের দিকে বারসিক কর্মকর্তারা মাঠ পর্যবেক্ষণে সৈয়দালিপুর আশ্রয়ন প্রকল্প পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করে। আলোচনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন যে, ‘আমাদের ব্যারাকে দীর্ঘদিন কাজ না হওয়াতে পুকুরের পাড়গুলো ভেঙে গেছে ভিটা অনেক নিচু হয়ে গেছে, পুকুর ভরাট হয়ে গেছে এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
তাছাড়াও ব্যারাক নির্মাণের পর থেকে ২ বিঘার যে পুকুর ছিলো সেটি নামে মাত্র ব্যারাকের ছিলো। সেটি শুরু থেকেই পাশ^বর্তী এক প্রভাবশালী দখল নেয়। এ বিষয় ঐ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় ইউপি সদস্যের সাথে আলোচনা করেও কোন লাভ হয়নি। একপর্যায়ে ব্যারাক জনগোষ্ঠী এ সমস্যা সমাধানের জন্য বারসিক’র নিকট সহায়তার দাবি জানান।
এ বিষয়ে ব্যারাক জনগোষ্ঠী জাহাঙ্গীর ও আশরাফ জানান যে, ‘এরপর আমাদের ব্যারাকের সার্বিক সমস্যা (ঘর, লেট্রিন, যোগাযোগের রাস্তা, বিদ্যুৎ, পুকুরের সীমানা নির্ধারণ ও পুকুর খনন, সোলার প্রাপ্তি) বিষয় নিয়ে বারসিক শ্যামনগর রিসোর্স সেন্টারের কর্মকর্তারা উপজেলা প্রশাসন, নুরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন পত্র লিখতে ও জমা দিতে আমাদের সহায়তা করেন। পাশাপাশি পুকুরের সীমানা নির্ধারণ বিষয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় সরকারের সাথে ধারবাহিকভাবে আলোচনা ও যোগাযোগ করা হয়।


এক পর্যায়ে ২০১৭ সালের দিকে উপজেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত হয় এবং প্রভাবশালীকে নোটিশ প্রদান করেন পুকুরের দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য। পরবর্তীতে প্রভাবশালী হাইকোর্টে আপিল করে পুনরায় আবারও পুকুর দখল নেয়। তারপরও আমরা আশা ছেড়ে দেয়নি সবসময় স্থানীয় সকরার, উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছি। পুনরায় ২০১৮ সালে আবারও বারসিক’র সহায়তায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের নিকট পুকুরের সীমানা নির্ধারণ ও খনন বিষয় আবেদন করা হয়। একপর্যায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের সহায়তায় ২০১৮ সালের শেষের দিকে ব্যারাকের জায়গা ও প্রভাবশালীর জায়গা আমিন দিয়ে মেপে ব্যারাকের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে পুকুরটি ব্যারাকের সীমানা নির্ধারিত হয় ১০ কাঠার মতো।’


ব্যারাকের অন্যরা জানান যে,‘ শুধুমাত্র ব্যরাকের সীমান নির্ধারণ হয়। কিন্তু সীমানা বরাবর কোন বাঁধ থাকেনা ফলে আমরা পুকুরের কোন অংশ ভোগ করতে পারিনা। কারণ তখন প্রভাবশালী ব্যক্তির মাছ ছেড়েছিলো। এরপর থেকে বিগত কয়েক বছর বেশ কয়েকবার পুকুরটির সীমানা বরাবর বাঁধ এবং পুকুর খননের বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোন সুফল হয়নি। তারা সব সময় বলতো এবছর না আগামী বছর এখন বাজেট নেই এসব কথা। আমাদের পুকুর খনন ও সীমানা বরাবর বাঁধ না থাকায় আমাদের গোসল, কাপড়-চোপড় পরিস্কার, থালা-বাসন ধোয়া, কৃষি কাজসহ প্রভৃতি কাজের খুব সমস্যা হচ্ছে। মাঝে মাঝে নদীর পানি ও অন্যের পুকুর ব্যবহার করতে হচ্ছে। সুপেয় পানি দূরের গ্রামের দেড় কিলোমিটার দূর থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এমতাবস্থায় ব্যারাকের পুকুরের সীমানা বরাবর বাঁধ নির্মাণ, পুনঃখনন, পাড় মেরামত না করা হলে আমাদের বসাবাস করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।’


ব্যারাক জনগোষ্ঠী জ্যোৎনা, ফিরোজারা জানান, ‘সবশেষ ২০২২ সালে এপ্রিল মাসের দিকে আমরা একটি সুখবর পেলাম যে, আগামী মে-জুন মাসের মধ্যে আমাদের পুুকুরের সীমানা বরাবর বাঁধ দেওয়া হবে। এপ্রিল মাসে বর্তমান সময়ের উপজেলা প্রশাসন আমাদের ব্যারাকের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছে। এবং ব্যরাকের ঘরের কাজ করার আশ^াস প্রদান করেন। এরপর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি সীমানা বরাবর তার অংশ বাঁধ নির্মাণ করেন এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমাদের পুকরের পাড় ও যোগাযোগের রাস্তাটি সংস্কার করে দেন। এতে করে আমরা একটি সম্পদ ফিরে পেলাম। পুকুরের পানি দিয়ে মাছ চাষ করতে পারবো,সবজি চাষ করতে পারবো। পুকুরটি এখন আমরা ব্যারাক জনগোষ্ঠী ইচ্ছে মতো ব্যবহার করতে পারবো। গতবার বৃষ্টিতে আমাদের যোগাযোগের রাস্তা এবং ব্যারাক পুরো পানিতে তলিয়ে ছিলো। আমরা পানিতে বন্দী ছিলাম। এবার হয়তোবা আমাদের এই জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হবে না।’


সৈয়দালিপুর ব্যারাকে বসবাসকারী আশরাফ, ফতেমা, ফিরোজা, জাহাঙ্গীর, ফজিলারা জানান, ‘বারসিকের সহযোগিতায় আগেই আমাদের বিদ্যুৎ এর সমস্যার সমাধান হয়েছে। আর এখন আমাদের পুকুর, যোগাযোগরে রাস্তা ও ভিটা উচুকরণ হয়েছে। এতে করে আমাদের সুপেয় পানির সমস্যা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। ধীরে ধীরে আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান হচ্ছে। আমারা চির কৃতজ্ঞ থাকবো বারসিক ও প্রশাসনের নিকট। তারা (বারসিক কর্মকর্তারা) পথ না দেখালে আমাদের পক্ষে কাজটি করা সম্ভব হত না। বর্তমান সব কিছু মিলে আমরা আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে পারবো বলে আশা করি।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: