Posted in

মানিকগঞ্জে ‘তামাক’ চাষ বৃদ্ধি: হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য ও জমির উর্বরাশক্তি

মানিকগঞ্জ থেকে আব্দুর রাজ্জাক

যে বিস্তীর্ণ জমিতে কয়েক বছর আগেও ধান, গম, ভুট্টাসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য চাষ হতো তা এখন পরিণত হয়েছে মারাত্মক ক্ষতিকর তামাক চাষে। বিভিন্ন টোবাকো কোম্পানির কূটকৌশলের কাছে কৃষকরা হেরে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অধিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ধানসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে করানো হচ্ছে তামাক চাষ। এতে তামাক চাষীসহ তাদের পরিবারের শিশুরাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে, অসুস্থ হচ্ছে অনেকেই।

মানিকগঞ্জে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে এ তামাক চাষ। প্রথমদিকে স্বল্প পরিসরে স্বল্পসংখ্যক কৃষক তামাক চাষ করলেও দিন দিন আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি বিধি নিষেধ জোরদার না থাকায় ফসলী জমিতে কৃষিজাত শস্য বাদ দিয়ে চাষীরা তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। সামান্য পুজিতে বেশি মুনাফার ফাঁদে উৎসাহিত হয়ে ক্রমেই বেড়ে চলেছে তামাকের আবাদ। এতে এক দিকে নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরাশক্তি, অপরদিকে স্থানীয় কৃষক পরিবারে দেখা দিয়েছে নানা রোগব্যাধি।

manikgonj-1
জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে এ বছর পরিবেশ বিনষ্টকারী ও স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর নিকোটিন বিষবৃক্ষ বলে খ্যাত তামাক গাছের চাষ করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, চলতি বছর জেলার ঘিওর, দৌলতপুর, সাটুরিয়া ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় কয়েকশ একর জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে। বিভিন্নি টোবাকো কোম্পানির আগ্রাসী তৎপরতা আর অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে কৃষিজপণ্য উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে তামাক উৎপাদন আর কমে যাচ্ছে ধানসহ কৃষিপণ্যের চাষ। শুরুতে তামাকের চারা জমিতে রোপণ করে সামান্য পরিচর্যায় ৬ মাসেই পরিপক্ব তামাক পাতা উৎপন্ন হয়। চাষীরা সে পাতা সংগ্রহ করে ঝুলিয়ে রাখেন বাড়ির উঠানে। তামাকপাতা সংগ্রহ, শুকানো এবং বান্ডিল করার কাজে কৃষক পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েরাও কাজ করছে। এতে অসুস্থ হয়ে পড়ছে অনেক শিশু। এভাবে তামাক চাষ বাড়তে থাকলে খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করছেন মানিকগঞ্জের বিশিষ্টজনরা। তাদের আশঙ্কা, এ বিষাক্ত তামাক চাষের লাগাম যদি টেনে ধরা না হয় তাহলে খুব শিগগিরই মানিকগঞ্জের ধান, পাট, গম, ভুট্টাসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য ও শশ্য উৎপাদনে ব্যাপক বাধা সৃষ্টি হবে। খাদ্যঝুঁকির সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিতো রয়েছেই। তাই তারা সরকারি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় ২১৬৬ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। অতি মুনাফা পাওয়ার আশায় স্থানীয় কৃষকেরা তামাক চাষে ঝুকে পড়ছেন। তামাক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর, এটি মানুষের কোন উপকারেই আসেনা। জেলার দৌলতপুর, ঘিওর, সাটুরিয়া ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তামাক চাষ হয়। এভাবে তামাক চাষ বৃদ্ধি পেলে খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ঝুকিতে পড়ার আশংকা করছেন সমাজের বিশিষ্টজনরা।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের শুরুতে তামাকের চারা জমিতে রোপণ করে সামান্য পরিচর্যাতে ৬ মাসে পরিপক্ক তামাক পাতা উৎপাদন হয়। চাষীরা সে পাতা সংগ্রহ করে ঝুলিয়ে রাখেন বাড়ির উঠানে। এসময় বাতাসে তামাকের নেশাজাতীয় যে গন্ধ ছড়ায় তা একজন সুস্থ মানুষের জন্য শুধু বিরক্তিকরই নয় রীতিমত স্বাস্থ্যহানীর বিপর্যয় ঘটার আশংকা করছে স্থানীয়রা। তামাক পাতা সংগ্রহ, শুকানো এবং বান্ডিল করার কাজে কৃষক পরিবারের চাপের মুখে ছোট ছেলে-মেয়েরা জড়িত রয়েছে। এতে অসুস্থ হয়ে পড়লেও প্রতিবাদের কোন উপায় নেই শিশুদের। তামাক উৎপাদনকৃত বাড়ির প্রতিবেশীরা পড়ছেন চরম ভুগান্তির শিকার। তামাক চাষ করেন না এমন প্রতিবেশীর বিরক্তিকর আপত্তি থাকলেও প্রতিবাদের উপায় না পেয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে অসংখ পরিবার।

দরিদ্র ও হতাশাগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোকে ধান, ভুট্রা, আলু, গম-সহ নানা কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করতে টোব্যাকো কোম্পানিগুলো তামাক চাষে বিনে পয়সায় বীজ, সার কীটনাষক ও সেচ দিয়ে উৎসাহিত করছে। এরপরও চাষীদের জন্যে রয়েছে বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা। রয়েছে নির্ধারিত মূল্যে তামাক ক্রয়ের কোম্পানির নিশ্চয়তার বিশেষ কার্ড। আর এ কারণেই উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকায় দু’চোখ যে পর্যন্ত যায় শুধু তামাক আর তামাকের আবাদ। মনে হয় একেকটি ইউনিয়ন যেন তামাকের রাজ্য। সাটুরিয়ার নাসুরপুরের আঃ হালিম, উত্তর ছনকার তামাক চাষী মনু মিয়া জানান, এ বছর তিনি ২শ’ শতাংশ জমিতে মটর কালাইয়ের পরিবর্তে তামাক চাষ করেছেন। সব মিলে খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। খরচ ছাড়াও দেড় লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।

অবাধে তামাক চাষের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল এসোসিয়েশনের অতিরিক্ত মহাসচিব ডা. মোঃ আবুল হাসান বলেন, ‘তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়াও যে এলাকায় তামাক চাষ হয় তার আশেপাশের মানুষেরও শ্বাস কষ্ট, চর্ম রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ উজ্জামান বলেন, ‘ক্ষতিকর তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার জন্য মাঠ র্পযায়ে কর্মকর্তারা নিয়োমিত কাজ করে যাচ্ছেন। তারা কৃষকদের এর ক্ষতিকর দিক সর্ম্পকে বুঝাচ্ছেন। যাতে তারা তামাক চাষ বাদ দিয়ে কৃষিপণ্য চাষে ফিরে আসেন।” তিনি আরো বলেন, তামাক চাষের ফলে জমির উর্বরতা কমে যায়।”

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.