Posted in

প্রকৃতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে অমৃত সরকার

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একটি ব্যাপক আলোচনা। কিন্তু খুবই সাধারণভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই অসময়ে বৃষ্টি, অতি বৃষ্টি, খরা,অতিখরা, খরা বা বৃষ্টিতে ফসলহানি, শীতের দৈর্ঘ্য কম, প্রচন্ড গরম ও তাপমাত্রার তারতম্য। উল্লেখিত বিষয়ের বাইরেও জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতিতে প্রতিনিয়তই ঘটে যাচ্ছে ছোটখাটো অনেক পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে তা তাৎক্ষণিকভাবে দেখা না গেলেও আস্তে আস্তে ব্যাপক আকার ধারণ করে। রাজশাহীর তানোর অঞ্চলের গোকুল-মোথুরা, হাতিশাইল, দুবইল, বুরূজ, তালন্দ, মোহর ও হরিদেবপুর গ্রামের কৃষকদের সাথে আলোচনায় এই বিষয়টিই বেরিয়ে আসছে।

অসময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত
আমাদের দেশের প্রকৃতির গুনাগুন বিবেচনায় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কাঙ্খিত বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা। কিন্তু বিগত কিছু বছর থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বর্ষাকাল শুরু হওয়ার অনেক আগেই প্রচুর বৃষ্টিপাত। আর এর ফলে মাঠ-ঘাট ফসলের জমিসহ নিচু জায়গা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। অসময়ে এ বৃষ্টিপাতের কারণে অধিকাংশই সময়েই আমরা ফসল হানিকেই দেখতে পাই। কিন্তু এর কারণে প্রকৃতিতে নিরবে ঘটে আরো একটি পরিবর্তন। আর এ সম্পর্কে বিলকুমারী বিলের পাশের হাতিশাইল গ্রামের প্রবীণ কৃষক মো. রবমত মিয়া (৭২) বলেন, “সময়ের আগে বৃষ্টি হওয়ার ফলে মাঠে যখন পানিতে ভরে যায় আমাদের দেশীয় যে সকল মাছ আছে নতুন পানিতে তারা গর্ভধারণ করে কিছুদিন পর ডিমও ছাড়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এর কিছুদিন পরই যখন মাছের ডিম ছাড়ার সঠিক সময় আসে তখন আর বৃষ্টি হয় না। এর ফলে কিছু মাছের ডিম ছাড়লেও বাচ্চাগুলো পানির অভাবে মারা যায়। আর এর ফলেই আমাদের দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তি হয়ে গেছে।” অবশ্য এর পেছনে তিনি মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগকেও দায়ি করেন।

১ম ছবি
আবার আমরা বাংলা সাহিত্যর বিভিন্ন পুস্তকের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, বর্ষায় কদম ফুল প্রকৃতিতে নিয়ে আসে অনাবিল এক আনন্দের বার্তা। কিন্তু অসময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ার ফলে কদম ফুল আষাঢ় শুরু হওয়ার অনেক আগেই ফোটে আবা অনেক আগেই ঝরে পরে যায়। আর এর ফলে বাংলাদেশের হিন্দু সংস্কৃতির আষাঢ় মাসের ষষ্ঠী পুজোতে আর কদম ফুল পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে হরিদেবপুর গ্রামের কৃষাণী বানী রানী (৪৮) বলেন, “আমাদের জামাই ষষ্ঠী পুজোতে কমদ ফুল অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বিগত বছরে আমরা কদমের ফল দিয়ে পুজো সেরে নিচ্ছি। কারণ আগেই কদম ফুল ঝরে ফল হয়ে যায়। পাশাপাশি আগের বৃষ্টি শুরু হওয়ার কারণে শাপলা ফুল খুবই তারাতারি ফোটে আবার তারাতারি নষ্টও হয়ে যায়। যার ফলে শাপলার নীল রংয়ের প্রজাতি আজ বিলুপ্তির পথে।”

তাপমাত্রার তারতম্য
বাংলাদেশে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস গ্রীষ্মকাল হিসেবে এ সময় প্রচুর গরম অনুভূত হয়। গরম ও রোদের কারণে এসময় ঘরের বাইরে যাওয়াই কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু চলতি বছরের এই দুই মাসে তেমন গরম অনুভূত হয়নি। এ বিষয়ে তালন্দ গ্রামের কৃষক মো. আতাউর রহমান (৫৫) বলেন, “এবারে গরমের সময় বেশি গরম না অনুভূত হওয়ায় গ্রীষ্মকালীন সবজি যেমন-সজিনা, পটল, কাচাকলায় কোন স্বাদ ছিল না। পাশাপাশি মানুষের রোগ হয়েছে অনেক।”

৩য় ছবি
বুরুজ গ্রামের কৃষক মো. আ. রাজ্জাক (৪৮) সারাবছরই বাড়িতে বিভিন্ন মৌসুমি সবজী চাষ করেন। তিনি বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সবজির জমি কোদাল দ্বারা কর্ষণ করে মাটিকে রোদ পাওয়ার জন্য ফেলে রাখেন যেন রোদে ক্ষতিকর জীবাণুগুলো মারা যায়। তাঁর ধারণা রোদের তাপে মাটি শুদ্ধ হয়। এরপর যে কোন ফসল চাষ করলে ফলন ভালো হয়। কিন্তু এ সময়ে এবার তেমন রোদ না থাকায় মাটি জীবাণুমুক্ত করতে তাঁর খরচ হয় এক হাজার টাকা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের প্রকৃতিতে রোদ, বৃষ্টি, গরম বা ঠান্ডা সকল কিছুরই প্রয়োজন আছে। তবে তা সময় বিবেচনায় কিন্তু এখন আর সময় মত প্রকৃতি আচরণ করে না বলেই আমাদের মত কৃষকের অনেক সমস্যা হয়।”

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.