Posted in

ভুতছাড়া থেকে মঙ্গা ছাড়া

রংপুর থেকে ফিরে মো. জাহাঙ্গীর আলম

সততা সংঘের কর্মসূচীতে বিগত ১০ মার্চ ২০১৭ তারিখে আমার রংপুর যাওয়ার সুযোগ হয়। বছর চারেক আগে সর্বশেষ রংপুরে গিয়েছিলাম আর তার ঠিক চার বছর পর এবাবের রংপুর যাওয়া। Jahaএই চার বছরে বদলে যাওয়া রংপুর আমাকে দারুণভাবে অবাক করেছে। রংপুর শহর আর গ্রামের সেই জরাজীর্ণতা আর আগের মতো চোখে পড়ে না। চওড়া সুন্দর পাকা রাস্তা, রাস্তায় চলমান অসংখ্য ইজিবাইক, মহেন্দ্র, হোন্ডা, রিকশা আর সুন্দর সুন্দর গাড়ি মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে গতিময়তা। যানজট নেই, আছে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রতিযোগিতা। ইতিমধ্যে শহরে নতুন নতুন বিল্ডিং মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তায় সোডিয়াম বাতি, রাস্তার পাশে সুন্দর সুন্দর দোকান আর বড় বড় হোটেল, বিদেশী গাছের জায়গায় দেশী গাছের জায়গা দখল, এ যেন এক অন্যরকম বদলে যাওয়া রপুর জেলা। শহরতলী এবং গ্রামের অধিকাংশ বাড়িই এখন পাকা। প্রতিটি বাড়িতেই কমপক্ষে রয়েছে একটি করে পুকুর যেখানে তারা সারাবছর মাছ চাষ করে থাকেন।

রংপুর শহর থেকে সহকর্মী উজ্জলকে নিয়ে কাজের জন্য কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ স্কুলে যাচ্ছিলাম গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিয়ে। সাজানো বাড়িঘর, ফসলের মাঠ ভরা ধান আর লাইন ধরে নারী-পুরুষের আলু তোলার দৃশ্য দেখে খুবই ভালো লাগছিল আমাদের। এই সময় আলু তোলার ভরা মৌসুম হওয়ার কারণে গ্রামের সকল মানুদের ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে আলু তোলা এবং তা বস্তা ভরার কাজে। শহীদবাগ স্কুল থেকে রিকশায় করে কাউনিয়া উপজেলায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটু এগিয়ে আসলেই আমাদের চোখ আটকে যায় ভুতছাড়া পোস্ট অফিসের সাইনবোর্ডের দিকে। ভূত ছাড়ার নাম সম্পর্কে জানতে চাইলেই রিকশা চালক আহম্মেদ আলীর (৫০) বলেন, “এই নামটি অনেক পূরানো।

Jaha-1মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি, এই এলাকায় একসময় অনেক বড় জঙ্গল ছিল এবং এই জঙ্গলের পাশ দিয়ে একা কেউ একা গেলেই তাকে ভূতে ধরতো এবং কবিরাজরা তা ছাড়াতো। তারপর থেকেই এই গ্রামের নামকরণ করা হয় ভূত ছাড়া।” তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধের সময় পাক সেনারা একদিনে এই গ্রামের ১৭৫ জনকে গুলি করে মারার কারণে এই গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় শহীদবাগ গ্রাম। তারপরও এই গ্রামটা ভূতছাড়া গ্রাম হিসেবেই বেশি পরিচিত।” রংপুর জেলার এই উন্নয়নের কারণ জিঞ্জাসা করতেই তিনি বলেন, ”ছোটকালে ভাতের খুবই কষ্ট করছি। খিদার জ্বালায় যে কত কষ্ট করেছি তা বলে শেষ করা যাবে না। ছোট বেলায় খিদার জ্বালায় পায়রায় ছাতু খেয়ে দিন পার করেছি। কখনও খাবার পেয়েছি কখনও পায়নি। আমি যে কষ্ট করিছি তা আমাগ সন্তানেরে করতে দিমু না। এই এলাকার মানুষ সবাই কষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। আগে বোনা ধানের চাষ হতো, চৈত্র-বৈশাখ মাসের খরা আর পশ্চিমে বাতাসে অধিকাংশ ফসলই পুড়ে যেত। তিনি আরও বলেন, “প্রতিবছর বন্যায় ফসল নষ্ট হতো। তার উপর ছিল নদী ভাঙন। তিস্তা নদীর এই নদী ভাঙনের কারণে এই গ্রাম তছনছ হয়ে গেছে। এই গ্রামে কোন ফসল তেমন একটি হতো না বললেই চলে। ফসল হতো না বলে কারো কোন কাজ ছিল না। ফলে অভাব লেগেই থাকতো। আগে বোনা ধানের ফল খুবই কম হতো আর এখন একদন (২৫ শতক) জমি চাষ করলেই সারাবছরের খাবার হয়ে যায়।”

Jaha-2শহীদবাগ স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ তোফাজ্ঝল (৫০) বলেন, “আলু চাষই এই এলাকার মানুষের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিয়েছে। প্রতি দন জমিতে  গড়ে ৩০-৩৫ বস্তা আলু হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই যেহেতু আলু খায় ফলে আলুর দামও কৃষকরা ভালো পাচ্ছে। প্রতি কেজি আলু ১০-১৫ টাকা করে কৃষকরা বিক্রি করে। তাছাড়া অতিরিক্ত আলু তারা কোল্ড স্টোরেজে রেখে দেয়। ইতিমধ্যে কাউনিয়াতে বড় বড় চারটি আলু স্টোরেজ তৈরা হয়েছে যেখানে হাজার হাজার মণ আলু রাখা হয়।” তিনি আরও বলেন, “এই এলাকায় চার ধরণের আলু হয়। যেমন কার্ডিনাল, গ্রানডুলা, কার্টিজ ও সীল আলু। সীল আলু সাধারণ ভর্তা খাওয়ার জন্য ব্যবহার করা এবং কার্ডিনাল এবং কাটিংজ আলু দিয়ে তরকারী রান্না করলে খেতে খুব স্বাধ হয়। আলু মাত্র ৯০ দিনের ফসল এবং যে বছর এই সময়ের মধ্যে শীত এবং কুয়াশা বেশি হয় সেই বছর আলুর ফলন ভালে হয়।” তিনি জানান, আলু চাষের মৌসুমে বৃষ্টি হলে আলুতে পচন ধরে এবং আলুতে দাগ হয়ে যায়। আলু চাষ এলাকা ভেদে কম বা বেশি হয়ে থাকে। চর এলাকার মোট জমির ৪০ ভাগ জমিতে আলু আর ৬০ ভাগ জমিতে ধান ও ভুট্টা চাষ করে তবে সমতল এলাকায় সাধারণত ৬০ ভাগ জমিতে আলুর চাষ হয়ে থাকে। এই আলুই এই এলাকার উন্নয়নে ক্ষেত্রে বড় ভুমিকা পালন করেছে।

একই এলাকার কৃষক সাইফুল্লাহ বলেন, “মঙ্গা দূরীকরণের জন্য এই এলাকায় বিভিন্ন এনজিও গ্রামীণ দরিদ্র পুরুষ-নারীদের বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নগদ টাকা, রিকশা, ভ্যান, গরু ছাগল, হাঁস মুরগিসহ বিভিন্ন ধরণের উপকরণ ও ক্ষদ্র ঋণ এলাকার মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছে।” তিনি জানান, সরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের আয় বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে এবং এলাকার মানুষকে উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ফলে এই এলাকার নারীরা পুরুষের পাশাপাশি বাড়িতে বসে বিভিন্ন ধরণের পণ্য তৈরি এবং বিক্রি করে আয় করছেন। ফলশ্রুতিতে তাদের আর্থিক সমস্যা দুর হতে থাকে। কৃষক সাইফুল্লাহ জানান, একজন নারী হাতের কাজ করে গড়ে ১৬০০ টাকা আয় করতে পারেন। মূলত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের কারণে এলাকার নারী ও পুরুষরা কাজের ক্ষেত্র পেয়ে নিজের ভাগ্য উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। এসব উদ্যোগের কারণে কাউনিয়া উপজেলার নারীদের তৈরি টুপি সৌদি আরবসহ মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে যা নারীদের আয়ের পথকে প্রসারিত করেছে। Jaha-3

অন্যদিকে এলাকায় কিছু ছোট ছোট শিল্প কারখানায় মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকেই প্রায় একজন বা দু’জন করে ঢাকার গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন এলাকায় চাকুরি করে বাড়িতে টাকা পাঠানোর কারণে এলাকার মানুষের সেই আগের কষ্ট আজ আর নেই। এলাকার অধিকাশ রাস্তা পাকা হওয়ার কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারছেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এবং মানুষের প্রচেষ্টা, উদ্যম এবং অধ্যবসায়ের কারণে এখন রংপুরবাসী মঙ্গার বদনাম থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন। সঙ্গত কারণেই বলা যায় যে, এলাকার নারী-পূরুষ সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের কারণেই মঙ্গা থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন রংপুর জেলার মানুষ।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.