সাম্প্রতিক পোস্ট

কৃষিতে হেসেছেন কৌশল্ল্যা মুন্ডা

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল:

কৃষিতে হেসেছেন কৌশল্ল্যা মুন্ডা। বুড়িগোয়ালিনী আশ্রয়ন প্রকল্পের (যা ব্যারাক নামে পরিচিত) আদিবাসী নারী কৌশল্ল্যা স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জৈব পদ্ধতিতে বছর ব্যাপী বৈচিত্র্যময় সবজী চাষাবাদ, বীজ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, প্রতিবেশীয় বনায়ন, জৈব সার ও ভার্মি কম্পোষ্ট উৎপাদন এবং ব্যবহার সহ স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপকূলীয় কৃষি প্রতিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ ভুমিকা রেখে চলেছেন।

উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বুড়িগোয়ালিনী গ্রামে চুনা নদীর চরে উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রায় ১০ একর জায়গায় (ব্যারাক) আশ্রায়ন প্রকল্প তৈরী হয় ২০০৮ সালে। ব্যারাকে বসবাসরত ১০০ টা পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার হলো হল আদিবাসী কৌশল্যা মুন্ডা’র (৪৮)। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে রিপন মুন্ডাই একমাত্র পড়ালেখায় মাত্র ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত এগুতে পেরেছেন। মেজো মেয়ে মানুবালা ও ছোট মেয়ে রেনুকা সহ ৫ জনের সংসার। স্বামী সন্তোষ মুন্ডা বছরের দিন মজুরের পাশাপাশি ৬/৭ মাস অভাবের তাড়নায় অন্য জেলার ইটের ভাটায় কাজ করে।

কৃষিতে হেসেছেন কৌশল্ল্যা মুন্ডা (2)
কৌশল্যা মুন্ডা পরিবারের অত্যাবশ্যকীয় কাজের পাশাপাশি নদীতে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করে, পোনা ধরে, দিন মজুরী খেটে ও বাড়ীতে কিছু হাঁস-মুরগী পালন করে কষ্টে-সৃষ্টে সংসার চালাতেন। তাদের সীমিত আয়ে সংসারের চাল, ডাল, তরিতরকারি, ঔষধ-পত্র, জামা-কাপড় ও ছেলে মেয়েদের স্কুলের খরচ বহন করে অতি কষ্টে দিন চলতো। এমতবস্থায় প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ পূর্ণবাসিত উক্ত জনগোষ্ঠীর জীবন জীবকা পূন:গঠনে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে একই উপজেলার হায়বাতপুরের সেবা কৃষক সংগঠন, ও বনজীবিদের একটি প্রতিনিধি দল ব্যারাকে বসবাসরত জনগোষ্ঠী তাদের বসতভিটায় কীভাবে বছর ব্যাপি সবজী চাষ এবং বনায়ন করতে পারে সে বিষয়ে সম্মিলিত কার্যক্রম শুরু করে এবং তাদের মাঝে কুশি, ঝিঙ্গা, তরুল, সীম, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, ঢেড়ষ, বেগুন, ঝাল, পুঁইশাক ও পেঁপে, ডেমোশাক, টমেটো, পালংশাক, লালশাক, উচ্ছে, লাউ প্রভৃতির স্থানীয় প্রজাতির সবজী বীজ সহায়তা করে।

অন্যান্যদের মতো কৌশল্যা মুন্ডাও এ সবজী বীজের একটা ভাগ পান। আর এ থেকেই তিনি নিজ হাতে এসকল বীজগুলো নিয়ে আগ্রহের সাথে সবজী চাষে মনোযোগি হন। বাড়ীর যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা, হাঁস-মুরগীর বিষ্ঠা একটা নির্দিষ্ট গর্তে ফেলে রাখেন। পরবর্তীতে এই সার ও গোবর মিশিয়ে মাটি প্রস্তুত করে বীজ বপন করেন এবং মাটিতে জো ধরে রাখার জন্য অন্যের জমি থেকে নাড়ার (ধান গাছের নিচের অংশ) গোড়া উপরে এনে মাটি ঢেকে রাখেন। তিনি বীজ বপন, চারা রোপন, চারার গোড়া খোসা, পানি দেওয়া সহ সকল প্রকার পরিচর্যার কাজ নিজ হাতে সম্পন্ন করেন। বাড়িতে থাকলে তার স্বামীও তাকে এ কাজে সহায়তা করেন।

কৃষিতে হেসেছেন কৌশল্ল্যা মুন্ডা (4)কৌশল্যা মুন্ডা জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে ভালো সবজী উৎপাদন করতে পেরেছেন। নিজেদের বসতভিটায় বছরব্যাপী বৈচিত্র্যময় সবজী উৎপাদন ও কৃষি চর্চার পাশাপাশি লাগিয়ে রেখেছেন নানা জাতের দেশীয় ফল গাছ। নিজের আঙিনাকে সাজিয়েছেন স্থানীয় জাতের ফল গাছ দিয়ে। তার বসত ভিটার চার পাশে আম, জাম, কলা, নারকেল, পেয়ারা, সবেদা, খেজুর, কেওড়া, কদবেল, পাতিলেবু, কুল, তেঁতুল, গবেদা, ডালিম, কাঁঠাল, পেঁপে সহ নানা প্রজাতির দেশীয় ফল।

এ প্রসঙ্গে কৌশল্যা মুন্ডা বলেন, “আমি বার মাসই কোন না কোন সবজী চাষাবাদ করি। সেগুলো থেকে কিছু বাজারে বিক্রি করি। কিছু সবজী পাড়া পৃতিবেশিকে খেতে দেই। সংসারে তো বছরে মেলা টাকার সবজী কেনা লাগতো। এখন একেবারেই সবজি কেনা লাগে না। সব ধরনের বীজ বাড়িতে রেখে দেই পরবর্তীতে লাগানোর জন্য।”

কৃষিতে হেসেছেন কৌশল্ল্যা মুন্ডা (1)সবজী উৎপাদনের পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ করা তার অন্যতম একটি কাজ। বাগানের সবজী গুলোর মধ্যে যেটা মোটা তাজা সেটা বীজ করার জন্য রেখে দেন এবং পাকার পরপরই বীজ সংরক্ষণ করেন। প্রথমে বীজ গুলো ফল থেকে ছাঁড়িয়ে রোদে শুকিয়ে কৌটায় ভরে রাখেন। এবং সেগুলো কিছুদিন পরপর আবারও রোদে শুকিয়ে যতœ সহকারে সংরক্ষণ করেন। একাধারে এসকল বীজগুলো সম্প্রসারণ করে থাকেন। তিনি কুশি, ঝিঙ্গা, তরুল, সীম, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, ঢেড়ষ, কামরাঙা, বেগুন, ঝাল, পুঁইশাক ও পেঁপে, ডেমোশাক, টমেটো, পালংশাক, লালশাক, উচ্ছে, লাউ, কলমিশাক, মুলা, ধনচে সহ মোট ২৩ প্রজাতির স্থানীয় সবজী বীজ সংরক্ষণ করেছেন।
বছরব্যাপী বৈচিত্র্যময় ফসল চাষাবাদের পাশাপাশি স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চাকারী আদিবাসী নারী কৌশল্যা মুন্ডার জ্ঞান-দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অন্যদেরকে উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা যোগাবে এবং কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় ভুমিকা রাখবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: