Posted in

চরাঞ্চলে গরু পালনের সম্ভাবনা ও গোখাদ্য

হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ থেকে মুকতার হোসেন

নৌকায় এক ঘণ্টায় পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে চরে যেতে হয়। প্রায় ৩০ বছর ধরে জেগে উঠা চরে গড়ে উঠেছে বসতি। চরের মানুষের প্রধান জীবন জীবিকার খাত হলো কৃষি। তার মধ্যে প্রাণীসম্পদ বিশেষ করে করে গরু পালন অন্যতম। নারীরাই মূলত এই পশুসম্পদ পালনে প্রধান ভূমিকা রাখেন। গরুর ঘাস সংগ্রহ থেকে শুরু করে, চকে/মাঠে নিয়ে যাওয়া আসা, গোয়ালে তোলা, গোয়াল থেকে বাইরে বের করা, গোয়ালঘর পরিস্কার করাসহ বিভিন্ন কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখছেন। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া গ্রামের কৃষক লাভলু মিয়া (৩৮) তিনি বলেন, “চরে আমরা গরু পালন করে অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে। চরে একটি গরিব পরিবারে দশ হাজার টাকা হলে চিন্তা করে একটি গরু কিনে পালন করার। গরিব আত্মীয়স্বজনকে স্বাবলম্বী করার জন্য বাছুর (ছোট গরু) দেয়।”

চরের পাটগ্রাম চর, হালুয়াঘাটাচর, খরিয়াচর, বালিয়াচর, নটাখোলা, হরিহরদিয়া, লেছড়াগঞ্জ এলাকায় সবচেয়ে বেশি গরু পালন করে থাকে। কৃষকদের সাথে আলোচনা করে দেখা গেছে যে, প্রায় প্রতিটি পরিবারে রয়েছে ২-২০টি পর্যন্ত স্থানীয় জাতের গরু। অনেক পরিবারে দেখা গেছে, তারা গরু পালনের সাথে ভেড়া পালন করছে। এই প্রসঙ্গে পাটগ্রামচরের কৃষক সেলিম মিয়া বলেন, “চরে বেশির ভাগ পরিবার গাভী গরু পালন করে। গাভী গরু বছরে একটি করে বাচ্চা দেয় এবং আমরা গাভী থেকে দুধ পাই।” চরে গরু পালন করার অপার সম্ভাবনা হিসেবে হরিরামপুর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মিজানুর বলেন, “চরে প্রচুর পরিমাণ জায়গায় রয়েছে এবং কৃষকদের গরু পালনের পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। চরে প্রচুর পরিমাণ কাচা ঘাস পাওয়া যায়। ফলে কৃষকরা গরু পালনে লাভবান হতে পারেন।”

New Microsoft PowerPoint Presentation

মাঘ মাস থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত চকে (চড়ায়) তাকালে দেখা যায় যে, অনেক গরু বিচরণ করছে। চরে গরুর খাবার হিসেবে চকে (চড়ায়) যে ধরনের ঘাস খায় তা হলো দুর্বা, জলদুর্ববা, কাটা হেনচি, হামা, বাদলা, গইচা, কাইশ্রা, হেনচি, ছোট কলমী, ছোন, কাটানটা। এছাড়া খড়, কালাইয়ের ভুষি, গমের ভুষি, খুদ, চালের কবুড়া, পায়রার ভুষি এ সকল খাদ্য গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

কৃষকরা গরুর দুধ বিক্রি জন্য নটাখোলা, পাটগ্রামচর, নতুনহাট, বসন্তপুর হাটে বিক্রি করে বিশেষ করে সকালে বাজারে ক্ষুদ্র পাইকরা দিয়ে কিনে এনে মূলভুমি হরিরামপুর বিক্রি করে। প্রতি কেজি দুধ ৩৫- ৫০ পর্যন্ত বিক্রি করে থাকে। এছাড়া ও কৃষকরা দুধ দিয়ে মিষ্টি, বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দই ঘি তৈরি করে থাকে। দুধ বেশি হওয়ার জন্য কৃষকরা আলোকলতা, বিচা কলা, পানি লাউ, খুদ, গমের ভুষি, কাচা ঘাস গরুকে খাওয়ান থাকে। অন্যদিকে গরু বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষকরা নয়ারহাট, ঢাকা গাবতলী, ঝিটকা, টেপরা এ সকল হাটে বিক্রি করতে যান। এ ছাড়া অনেক পাইকরা বাড়িতে গিয়ে গরু কিনে আনেন।
চরে স্থানীয় জাতের দেশী গরু পালন বেশি দেখা যায় তবে কিছু পরিবারে ফ্রিজিয়ান ও করচ জাতের গরুও পালন করতে দেখা যায়। চরাঞ্চলে গরু পালনের সমস্যা হিসেবে দেখা যায় যে, বর্ষা মৌসুমে গরু চুরি ডাকাতির প্রবণতা দেখা যায় এবং রোগের ক্ষেত্রে খোরা রোগ, হঠাৎ পেটফুলা, পাতলা পায়খানা এসব রোগ বেশি দেখা যায়। চরে চুরি ডকাতির হাত থেকে রক্ষার জন্য বর্ষা মৌসুমে গ্রামে পাহারা কমিটি তৈরির মাধ্যমে রোধ করে থাকে। চরে গরু চুরি প্রসঙ্গে হরিরামপুর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, “চরের মানুষের বড় গরু তাদের পরিবারে আর্থিকভাবে লাভবান সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো গরু। তাই বর্ষাকালে চরে থেকে পুলিশ টহল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।”

গরু পালনের সমস্যার ক্ষেত্রে ভালো চিকিৎসক পাওয়া যায় না। কৃষকরা গ্রামের পল্লী চিকিৎসকের মাধ্যমে গরু চিকিৎসা করান। সরকারি ডাক্তার পাওয়া যায় না। বেশি জরুরি হলে তারা হরিরামপুর উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসে গরু নিয়ে আসেন। সরকারি ডাক্তার চরে নিতে গেলে অনেক খরচ হয় বলে কৃষকরা জানান। গরু পালনের সমস্যা হিসেবে হালূয়াঘাটা গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “বর্ষাকালে চরে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে পানিবন্দী হয়ে পড়ে। সে সময় গরুর খাদ্য, গরুর রাখার আতালে পানি উঠে তখন গরু পালন কষ্ট হয়ে যায়। অনেক কৃষক উচু রাস্তায়, আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি, আশ্রয়ণ প্রকল্পে উচু ভিটায় গরু রাখেন। অনেকে আবার সস্তায় গরু বিক্রি করে দেন এ সময়।”

বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বারসিক কৃষকদের গরু পালনের সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের সাথে যোগযোগ তৈরি, ভ্যাতসিনেশন ক্যাম্প, গরু চুরি রোধে গ্রাম পর্যায়ে পাহারা কমিটি গঠনে সহায়তা প্রদানে কৃষকদের সহায়তা দিয়ে থাকে। এছাড়া এই সংস্থা বর্ষাকালে জরুরি সেবাদানের জন্য নৌকা দিয়ে টহল কাজে সহযোগিতা করে। চরবাসী প্রত্যাশা করেন যে, চরে যদি সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি ইউনিয়নে ক্যাটল সেল্টার (গরুর আশ্রয়ণ কেন্দ্র) থাকত তাহলে বর্ষাকালে কৃষকদের গরু নিয়ে আর ভোগান্তিতে পড়তে হত না।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.