সাম্প্রতিক পোস্ট

থাংসেংআ সংগঠনের উদ্যোগ

কলমাকান্দা থেকে গুঞ্জন রেমা

কলমাকান্দা উপজেলার লেঙ্গুরা ইউনিয়নের ৩ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিম সীমানা ঘেঁষা একটি গ্রাম কালাপানি। এই গ্রামে ২০১৩ সালে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে একটি কৃষাণী সংগঠন। সংগঠনটির নাম থাংসেংআ। থাংসেংআ গারো শব্দ যার অর্থ দাঁড়ায় আলোকিত। মাঝখানে এই সংগঠন ভেঙে গিয়েছিল। তারপরও কিছ্ ুউদ্যোগী ব্যক্তি এগিয়ে আসে সংগঠনটিকে পুনরায় উজ্জীবিত করার মানসে। ১২ জন উৎসাহী নারী আবারও গড়ে তোলেন সংগঠনটি।

প্রতিদিন একটি পরিবারে যে পরিমাণ ভাতের জন্য চাল দরকার হয়, সেখান থেকে এক মুঠো করে চাল রেখে দেওয়া হয়, সেটাকে চাল মুষ্টি বলা হয়ে থাকে। আর এই চাল মুষ্টি প্রতি মাসে সংগ্রহ করে বিক্রি করে সঞ্চয় করা শুরু করেন এই ১২ জন নারী। তাদের এই উদ্যোগটি শুরুতে তেমন ফলপ্রসূ হবে না বলে মনে করেছিলেন অনেকে। কিন্তু কয়েক মাস পর তারা তাদের সুফলটি বুঝতে পারেন। বর্তমানে এই মুষ্টি চাল বিক্রি করে তারা সঞ্চয় করেছে ১২ হাজার টাকা। আর সদস্য সংখ্যা বেড়ে  দাঁড়িয়েছে ২৭ জন। এছাড়াও প্রায় ১৬ শতাংশ পতিত জমিতে তারা বৃক্ষরোপণ করেছেন সংগঠনের খরচে। প্রতি মাসের শেষে সংগঠনের মাসিক মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সঞ্চিত টাকা পয়সার হিসাব নিকাশ করা হয়। মাঝে মধ্যে অবসর সময়ে সবাই মিলে মিশে রোপণকৃত চারার  পরিচর্যা করেন তারা।

Youth
কালাপানি গ্রামটি গারো সম্প্রদায়ের বসবাস। এছাড়া দক্ষিণ দিকে রয়েছে বাঙালি জনগোষ্ঠী। এই গ্রামে যাতায়াতের বড় সমস্যা হলো ফুলবাড়ি ছড়া। শুকনো মৌসুমে পারাপারে কোন সমস্যা না হলেও বর্ষা মৌসুমে সমস্যা দেখা দেয়। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল আসলে শত প্রয়োজনেও ছড়াটি পারাপার হওয়া সম্ভব হয় না। ছড়া পারাপারের জন্য নেই কোনো নৌকা, নেই সেতু। তাই বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে সমস্যা হয়। যার ফলে কিছু শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। ছড়া পারাপারের জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদিওবা অনেক দিন আগে থেকেই বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি ব্রিজের জন্য আবেদন করা হয়েছিলো। কিন্তু কোন সমাধান পাওয়া যায়নি।

বিগত দুই মাস আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হল। কালাপানি ওয়ার্ডের একজন মেম্বার পদপ্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণার জন্য কালাপানি গ্রামে যান। তখন কালাপানি থাংসেংআ সংগঠনের সভাপতির উদ্যোগে একটি উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ঐ উঠান বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল ওই মেম্বার পদপ্রার্থীকে ফুলবাড়ি ছড়ার উপর একটি ব্রীজ নির্মাণে রাজি করানো বা প্রভাবিত করানো। তারা সবাই ঐক্যমতে পৌছেন যে, যদি ওই মেম্বার নির্বাচিত হয়ে ব্রিজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন তবেই তারা সবাই তাকে নির্বাচনের সময় ভোট দেবেন। তাদের কথামতে, সেই উঠান বৈঠকে মেম্বার পদপ্রার্থী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, যদি তিনি জয়ী হন তবে তিনি নির্বাচিত হওয়ার ৩ দিনের মধ্যেই ফুলাবাড়ি ছড়ার উপর বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটি ব্রীজ তৈরি করে দেবেন।

পরিশেষে নির্বাচনে ঐ মেম্বার প্রার্থী জয়ী হন এবং এর তিন দিনের মধ্যেই ফুলবাড়ি ছড়ার উপর বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটি  ব্রীজ তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু করে দেন। ওই সময় সংগঠনের সদস্যরা নিজ নিজ তরুণ-যুবক সন্তানদের ব্রিজ নির্মাণ কাজে সহযোগিতার জন্য পাঠিয়ে দেন। এভাবে ইউপি মেম্বার, থাংসেংআ সংগঠনের উদ্যোগ ও জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছড়া পাড়াপাড়ের বড় একটি সমস্যার সমাধান হল।
এই সংগঠনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও প্রভাবে ছড়াটির ওপর একটি ব্রিজ নির্মিত হলো। এ থেকে একটি প্রমাণিত যে, সম্মিলিত শক্তিতে যেকোন কাজ সমাধা করা যায়।

happy wheels 2
%d bloggers like this: