সাম্প্রতিক পোস্ট

উনি মহালে, আমার দিন কাটে আতংকে

উনি মহালে, আমার দিন কাটে আতংকে

সাতক্ষীরা থেকে শাহীন ইসলাম

একটি বাঘ বিধাব পরিবারের দুঃখের শেষ নেই। তাদের খাবার কষ্ট, পরার কষ্ট, থাকার কষ্ট। ওই পরিবারের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে না। রোগে পড়লে চিকিংসা করতে পারে না। কোন ইচ্ছা পূরণ করতে পারে না। তারা কোন রকমে বেঁচে থাকে। বাদাবনে মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহে অনেকের জীবন গেছে। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৬/৭শ’ বাঘ বিধবা পরিবার আছে।

মহাল বা মধু সংগ্রহ সবচে’ ঝুঁকিপূর্ণ। মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মেলে, চুন সংগ্রহের চেয়ে মধু সংগ্রহের কাজ ভিন্ন। অন্য কাজে সবদিকে চোখ রাখা যায় বা দেখা যায় কিন্তু মধু সংগ্রহের জন্য চোখ রাখতে হয় গাছের ডালে/ঝোপের দিকে। নিচে বা আশেপাশে নজর রাখা যায় না। মধু খোঁজা আর বাঘ খোঁজা একই কথা। এ যাবত যত বনজীবী বাঘের আক্রমণে আহত বা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই বনজীবী মৌয়ালী। বনজীবী নারী শেফালী বেগম এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমার প্রতিবেশী অনেকে বাঘ বিধবা। তাদের কষ্ট দেখলে মনে হয় জীবনে যদি অন্য কোন কাজ করে বেঁচে থাকা যেত, তাহলে এই নিরপত্তাহীন পেশার কাজ কখনও আমার স্বামীকে করতে দিতাম না। বাঘের ভয়, ডাকাতের অত্যাচার, নির্যাতন ও চাঁদাবাজিতে আমরা বনজীবীরা বড় অসহায়।” তিনি আরও বলেন, “আমার স্বামী অন্য কাজে বাদায় গেলে এত বেশি চিন্তা হয় না। গা ছম ছম করে না। খুব একটা দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় না। কিন্তু মধু কাটার সময়ে খুব ভয় লাগে, গা ছম ছম করে। রাতে ঘুম হয় না। প্রতিটি দিন কাটে আতংকে।”

অন্যদিকে স্বামী বনে গেলে নারীদের অনেক নিয়ম রীতি মেনে চলতে হয়। এ সময় কোন মৌয়ালের বউ বাইরে রাত কাটাতে পারবে না। দুপুরে রান্না করা যাবে না। রান্না করলে ধোঁয়া উনার চোখে লাগবে। খুব ভোরে নামাজ পড়ে ঘরবাড়ি ও উঠান ঝাড় দিতে হবে। এরপর চূলা লেপতে হবে। ঝাল পোড়ানো যাবে না। তাহলে বনের মধ্যে উনার কাশি লাগবে। কাপড় পরিস্কার করে পা-য়ে আঘাত করা যাবে না, তাহলে বনে গাছের ডালপালার আঘাত চোখে লাগবে। দিনের বেলায় চুল আচড়ানো যাবে না, তাহলে গাছ থেকে পড়ে যাবে। মাথায় তেল দেওয়া যাবে না তাহলে গাছ তেলা হয়ে যাবে। আর কোন বিপদ যদি হয়ে যায় তাহলে সব দোষ নারীদের। অপায়া, অলক্ষ্মী খেতাব নিয়ে সারাজীবন চরম কষ্ট ও যন্ত্রণায় বেঁচে থাকতে হবে।
shym
বনের মধ্যে রান্না খাওয়া, ছোট নৌকায় গাদাগাদি শুয়া। ঝড়, বাতাস, মশার কামড়, বিষাক্ত সাপ পোকার কামড়ের ভয়, ডাকাতের ভয় আরো কত যন্ত্রণা সহ্য করে মধু কাটতে হয় মৌয়ালীদের। তাঁরা ঠিকমত খেতে পারেন না, ঘুম বা গোসল করতে পারেন না। কোন সমস্যা হলে ডাক্তার ও ঔষুধের ব্যবস্থা নেই। জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। অথচ শোনা যায়, ভারতের বনে যারা মধু সংগ্রহ করতে যান বনবিভাগ তাদেরকে একটি করে মানুষের মুখোশ দেয়। প্রত্যেকে সেই মুখোশ মাথার পিছন দিকে পরে। বাঘের ধর্ম সে সামনের দিক থেকে আক্রমণ করে না। কিন্তু দু’দিকে মুখ দেখে অনেক সময় বাঘ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে এই কৌশল জীবনে ঝূঁকি কমায়।

শেফালী বেগম জানান, তাঁর স্বামী সরকারকে রাজস্ব দিয়ে বনে যাচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব তাঁর স্বামীর নিরাপত্তা দেওয়া। জেলখানার কয়েদীদের সরকার বিশেষ পোশাক পরতে দেয়। বনজীবীদের জন্যও সরকার যদি বিশেষ কোন পোশাক দিতো যা বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে তাহলে খুব ভালো হতো বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, পোশাকটি এমন হতে হবে যে, বাঘে আক্রমণ করলেও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশের কোন ক্ষতি হবে না। বিএলসি নাম্বারের সাথে ওই বিশেষ পোশাকও প্রদান করা যেতে পারে। মৌহাল শেষ হলে মৌয়ালীরা সেটা আবার বনবিভাগে জমা রাখবেন। এছাড়া শেফালী বেগমসহ জনজীবীরা মনে করেন সরকার বনজীবীদের চিকিৎসার জন্য মৌসুমে বনের মধ্যে ভ্রাম্যমান হাসপাতাল চালু করে চিকিৎসা সেবা দিতে পারে। যে কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বনজীবীদের বাঁচার জন্য আশ্রয় সেল্টার করতে পারে, বনদস্যুদের নির্যাতন বাঁচতে থেকে মৌসুমে যৌথ বাহিনীর টহল ব্যবস্থা করতে পারে। তাদের ভাষ্য, “কত হাজার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব সরকার এই সুন্দরবন থেকে অর্জন করছে। অথচ বনের প্রকৃত সন্তানেরা থেকে গেছে নিরাপত্তাহীনতায়।”

প্রতিবছর ১৮ চৈত্র সুন্দরবনের মধু মৌসুম শুরু। সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করাকে বনজীবীরা মহাল বলে। বনজীবী মৌয়ালীরা বন বিভাগের পাস সংগ্রহ করে ৭ থেকে ১০ জনের দল নিয়ে নৌকাযোগে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের যাত্রা শুরু করেন। শুক্রবার ছাড়া প্রতি সপ্তাহে ৬ দিন করে টানা দু’মাস ২ মাস সুন্দরবনের মধ্যে তাঁরা মধু সংগ্রহ করেন। দিনে দু’বার তারা বনের মধ্যে মধু সংগ্রহের জন্য যান। সকাল বেলা ভাত খেয়ে ৭টার দিকে বনে প্রবেশ করেন এবং দুপুর ১২ টার মধ্যে ফিরে আসেন। আবার ২টার দিকে বনে যান এবং বিকাল ৫টার দিকে ফিরে আসেন। বনের মধ্যে মৌয়ালীরা ৫ থেকে ৬ জনের দলে বিভক্ত হয়ে ৬০ থেকে ৭০ ফিট দুরত্ব বজায় রেখে মৌচাকের সন্ধান করেন। মৌসুমে একটি মৌচাক থেকে ৮ থেকে ৯ বার মধু সংগ্রহ করা যায়। দৈনিক একটি মৌয়াল দল সুন্দরবন থেকে ৮ থেকে ১০টা মৌচাক সংগ্রহ করতে পারেন, যা থেকে ৮০ থেকে ৯০ কেজি মধু এবং প্রায় ২ কেজি মোম পাওয়া যায়।

এ বছর পশ্চিম সুন্দরবন অঞ্চল শ্যামনগর উপজেলা থেকে প্রায় শতাধিক বনজীবী মৌয়াল মধু সংগ্রহের পাস নিয়ে বনে প্রবেশ করেছেন। এ কাজে ঝূঁকি বেশি বলে বনজীবীরা নিকট আত্মীয় বা রক্তের বন্ধনে সম্পর্কযুক্ত সদস্যদের নিয়ে দল গঠন করেন। বাঘের আক্রমণের বেশি ঝুঁকি থাকে, সেজন্য কাউকে বাঘে ধরলে তাকে যে কোনভাবে ছাড়িয়ে আনার জন্য দল গঠনে সম্পর্ক বা বন্ধনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

আমরা মনে করি, বাদাবন, বাঘ ও বনজীবীদের নিরাপত্তায় সরকারি ইনোভেশান উদ্যোগ গ্রহণ করলেই বনজীবী নারী শেফালী বেগমসহ শত শত নারীর হতাশা ও আতংকের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

happy wheels 2
%d bloggers like this: