সাম্প্রতিক পোস্ট

একজন আত্মবিশ্বাসী মায়া

ঢাকা থেকে সাবিনা নাঈম

বালুরমাঠ এলাকায় ১২ বছর ধরে বাস করেন মায়া (৫০)। ৪ সন্তানের মা মায়া বর্তমানে বালুরমাঠ এলাকায় ছোট একটি চায়ের দোকান চালান।
২০১০ সালে নোয়াখালি থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। গ্রামে থাকাকালীন সময়ে থাকার জন্য একটা ঘর ছাড়া চাষাবাদ করার জন্য কোন জমি ছিল না। এলাকায় কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে পারতেন না। অতিরিক্ত অভাব থাকার কারণে স্বামী সন্তানসহ ঢাকায় চলে আসেন কাজের সন্ধানে। প্রথমে ঢাকায় এসে বউবাজার, হাজারীবাগ এলাকায় ওনার স্বামী ট্যানারীতে শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। এই সময় মায়া ট্যানারীর কয়েকজনকে রান্না করে দুপুরের খাবার সাপ্লাই দিতেন। সেইসময় তিনি ট্যানারী এলাকায় চামড়া থেকে জুতা তৈরির কাজ শিখেন। এই কাজটি শেখার কারণে খাবার সাপ্লাই দেওয়া বন্ধ করে তিনি একটি চামড়ার কারখানায় চাকরি শুরু করেন।

স্বামী স্ত্রী দুইজনের আয়ে সংসার ভালোই চলছিল। ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে সংসারে পুনরায় অভাব দেখা দেয়। তিনি বউবাজার থেকে বালুরমাঠ এলাকায় ইঞ্জিনিয়ার বাড়িতে একটি ছোট ঘরে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে এই বস্তির ৭০টি ঘরের এই বস্তিতে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন বিনিময়ে ঘর ভাড়াটা দিতে হয় না। ফ্রিতে থাকার ব্যবস্থা হলেও সংসার চালানোটাই তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো। একজন বস্তিবাসী যিনি আবার চা দোকানদার তাকে পরামর্শ দেন বস্তির পাশেই আরেকটা চা দোকান দিতে। তবে করোনাকালীন সময়ে এই দোকানটি দেওয়ার কারণে স্বামী সন্তানসহ দুইবেলা খাওয়ার সংস্থান হয়েছে। তিনি চান এলাকায় কোন নারী যদি এমন চায়ের দোকান দিয়ে স্বাবলম্বী হতে চান তাহলে তিনি তাদেরকে সহযোগিতা করবেন। নারীরা কাজ করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করুক এটা তার আশা। আশপাশে অনেক নারীই নানানভাবে নির্যাতিত হয়, কিন্তু নারীরা যখন আয় রোজগার করে তখন তাদের কথা বলা ও মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।
মায়ার চায়ের দোকানের কারণে এলাকার বেশিরভাগ মানুষের সাথে তার পরিচয় হয়েছে। ঢাকা কলিং প্রকল্পের শুরু থেকে তিনি বালুরমাঠ সিবিও সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন। ইঞ্জিনিয়ার বাড়িটিতে যেহেতু অনেক পরিবার বসবাস করে এবং এই পরিবারের মানুষদের মাঝে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ধারনা কম ছিল। তিনি এই বস্তিসহ এলাকায় পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও পচনশীল-অপচনশীল বর্জ্য কিভাবে আলাদা করে রাখতে হবে তা সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এছাড়া যেখানে সেখানে যাতে কেউ ময়লা না ফেলে সেটা তদারকি করেন। এই বস্তিতে বর্ষার সময় সামান্য বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানিতে ডুবে যায়। ঢাকা কলিং প্রকল্পের বিভিন্ন মিটিং ও ট্রেনিং থেকে শিখেছেন বস্তিতে বা রাস্তায় যেখানেই প্লাটিক বর্জ্য ও পলিথিন পরে থাকবে তা যেন নিজেদের উদ্যোগে তুলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখেন তাহলে হয়তো ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে না। তিনি বলেন, ‘ঢাকা কলিং প্রকল্প আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।’


মায়া, ঢাকা কলিং প্রকল্প এর সাথে যুক্ত হয়ে অল্প জায়গার মধ্যে কিভাবে গাছ লাগানো যায় তা শিখে নিজে গাছ লাগান অন্যকেও উৎসাহিত করেন। তার ছোট চায়ের দোকানে ময়লা ফেলার জন্য একটিমাত্রা ঝুড়ি ছিল কিন্তু ইয়্যুথ এডভোকেসি গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে দোকানে আরেকটি ঝুড়ি কিনে দিয়েছেন। এর ফলে একটি ঝুড়িতে ময়লা জমে গেলে আরেকটিতে রাখতে পারেন। মায়া দোকানে আগত সকলকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বোঝান। প্রথম প্রথম অনেকে তার কথায় বিরক্ত হতো এখন অবশ্য পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বস্তি ও দোকানের সামনে আগের থেকে পরিস্কার থাকার কারনে অনেকে তার কাছে চা খেতে আসে আর এ থেকে অনেকেই শিখছে। তিনি সকলকে সচেতন হতে উৎসাহিত করেন আর সকলকে ধন্যবাদ জানান এই পরিবর্তনের জন্য।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: