Posted in

ঘিওরে ফুলে ফুলে মধু

আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি ॥

মানিকগঞ্জের ঘিওরে সর্বত্রই সরিষা ফুলের হলুদ বরণে সেজেছে ফসলের মাঠ। দিগন্ত জোড়া মাঠের যতদূর চোখ যায় শুধু হলুদ আর হলুদ রঙের মাখামাখি। শীতের আগমনে প্রকৃতি সেজেছে হলুদে আর মৌচাষিরা ব্যস্ত মধু সংগ্রহে। ঘিওর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষা আবাদ বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়েছে মৌসুমী মৌচাষীদের তৎপরতা। বর্তমানে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ আমাদের দেশের একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।

ঘিওর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন সরিষা মাঠে অর্ধ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৩৫-৪০ টন মধু সংগ্রহ হবে, এমন আশাবাদ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। মানিকগঞ্জের কৃষকরা বুঝে গেছেন মৌমাছি মধু সংগ্রহ করলে পরাগায়ণের মাধ্যমে ফসল ভালো হয়। তাই মৌসুমী মৌচাষীরা আসায় জেলায় সরিষার ফলন বৃদ্ধি পাবে প্রায় ১৫ শতাংশ ।

1 (7)

জীবন ও জীবিকার তাগিদে মৌচাষকে পেশা হিসেবে নিয়ে অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে এবং উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে জাতীয় উন্নয়নে রাখছে বিশেষ ভূমিকা। খুলনা, সাতক্ষীরা, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, ঈশ্বরদী থেকে প্রায় শতাধিক খামারি এসেছেন মানিকগঞ্জে। তারা মানিকগঞ্জ সদর, ঘিওর, সাটুরিয়া, দৌলতপুর, হরিরামপুর, শিবালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মধু সংগ্রহের কাজ করছে।

খুলনার মৌচাষি খালেক মৃধা বলেন, ‘প্রতিবছর ডিসেম্বর মাস থেকে আমাদের মধু সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। এটি চলবে মার্চ পর্যন্ত। জেলায় প্রায় শতাধিক খামারি মধু সংগ্রহের কাজ করে। এ বছর মধু সংগ্রহের কাজে আমরা ৩৫০টি বাক্স ব্যবহার করছি।’সাতক্ষীরার কলারোয়ার মৌচাষি বিল্লাল মিয়া বলেন, ‘১৫ বছর ধরে সরিষা থেকে মধু সংগ্রহের কাজ করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘মধু সংগ্রহে যে মৌমাছি ব্যবহার করা হয়, এরা আমাদের দেশি মৌমাছি নয়। এফিসমেলিফ্রা জাতের অস্ট্রেলিয়ান মৌমাছি দিয়ে মধু সংগ্রহ করা হয়। মৌমাছিগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আনা হয়।’

ঢাকা আরিচা মহাসড়কের পাশেই সরষে ক্ষেতে মধু সংগ্রহের সরঞ্জাম নিয়ে বসেছে জামালপুর জেলার মো. রাজন ও শফিকুল ইসলাম। তারা জানান, মধু সংগ্রহ করে তাদের সাবলম্বী হওয়ার কাহিনী। তাদের বাক্সেও সংখ্যা একশোর কাছাকাছি। প্রতি মণ মধু ৮-১০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন ঢাকার যাত্রাবাড়ি ও আশুলিয়ার এক পাইকারের কাছে। নারায়ণগঞ্জের কুমুলী ইউনিয়নের মৌচাষী দলের প্রধান মো. সেলিম জানান, উন্নত প্রশিক্ষণ আর সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মধু সংগ্রহের কাজে ব্যাপক উন্নয়ন করা সম্ভব। তিনি আরো জানান, দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রফতানী করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

মৌ-শ্রমিক মো. বাদল হোসেন জানান, মধু সংগ্রহে সুপার চেম্বার, বুরট, নিউক্লিয়াস নামের বাক্স ব্যবহার করা হয়। বাক্সগুলো সরিষা খেতের কাছে রাখলে মৌমাছিরা মধু এনে বাক্সে জমা করে। প্রতিটি বাক্স থেকে তিন-চার কেজি মধু পাওয়া যায়। সপ্তাহে এক দিন মধু সংগ্রহ করা হয়। প্রতি কেজি মধু পাইকারী ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। প্রতিটি খামারে তিন থেকে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিকেরা মাসিক এক থেকে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা করে বেতন পান।

2 (3)

মানিকগঞ্জ থেকে এই শীতে প্রায় কয়েক কোটি টাকার মধু সংগ্রহ হবে বলে জানালেন সংশ্লিষ্ট মৌ-চাষিরা। সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের কাজটাকে আরো বৃহৎ পরিসরে করতে পারলে এটি আমাদের দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মৌচাষিরা মনে করেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক মো. আলীমুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মানিকগঞ্জে এবার ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৮৮ হাজার মেট্রিকটন। সরকার বারি ১৪ জাতের বীজ সরবরাহ করায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। জেলায় ৩৫ টন মধু সংগ্রহ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘মৌচাষীরা আসায় ফলন প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। মৌমাছি শুধু মধুই সংগ্রহ করে না ফসলের জন্য ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ মেরে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের সহয়তা করে থাকে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.