সাম্প্রতিক পোস্ট

‘বীজ সংকট মুহুর্তে কৃষকদের ভরসায় বারসিক’

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়
আমাদের দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব যখন শুরু হয়েছে, সে সময়টি ছিল বোরো ধান কাটার মৌসুম। এরপর পরই চলে আসে আমন মৌসুম। একদিকে ফসল বিক্রি এবং বীজ ধান সংগ্রহ নিয়ে কৃষকরা বিপাকে পড়ে যায়। যাদের কাছে সংরক্ষিত বীজ ধান ছিল, তাঁরা সেই ধান দিয়েই চাষাবাদ শুরু করেন। কিন্তু যারা সেটা পারেননি, তারা বীজ সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর ঠিক সেই মুহুর্তে কৃষকদের পাশে দাঁড়ায় বারসিক।
লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের সানকিউড়া গ্রামের ৫জন কৃষক বারসিক রামেশ্বরপুর রিসোর্স সেন্টার থেকে ৫ ধরণের ধান বীজ সংগ্রহ করেন। বীজগুলোর মধ্যে ছিল সুবাশ, জেসমিন, বিকল্প, উঝ-৪ও উঝ-০২। প্রত্যেক কৃষককেই প্রথম অবস্থায় এক কেজি পরিমাণ বীজ প্রদান করা হয়। কৃষকরা তাঁদের মতো করে জমিতে চাষ করেন। অন্যান্য ধানের মতো নিয়মিত পরিচর্যাও করেন।


কৃষকদের মধ্য থেকে হাদিস মিয়া নামক একজন কৃষক ‘বিকল্প’ ধান বীজটি নিয়েছিলেন। তিনি প্রায় ১০ শতাংশ জমিতে রোপণ করেন। ধানের থোর আসার সময়ই তিনি বুঝতে পারেন এই ধানের ফলন ভালো হবে। আস্তে আস্তে শীষ বের হয়। পাশাপাশি জমিতে লাগানো অন্যান্য জাতের ধানের শীষগুলো থেকে বিকল্প জাতের ধানের শীর্ষ ছিল অনেক বড়। গ্রামের অন্য কৃষকরাও তাঁর জমির ফলন দেখে ধানের নাম জানতে চান। অনেকেই পরবর্তী সময়ে নিজেদের জন্য অগ্রিম বীজ চেয়ে রেখেছেন কৃষক হাদিস মিয়ার কাছে।
ধান কাটা ও মাড়াইয়ের পর ওজন করে দেখতে পান ১০ শতাংশ জমিতে এই ধানের ফলন হয়েছে প্রায় ৮ মণ। এই জমির পাশেই হাদিস মিয়া অন্য জমিতে বিনা-৭ জাতের ধান রোপণ করেছিলেন। সেখানকার ১৫ শতাংশ জমিতে বিনা-৭ জাতটির ফলন হয়েছে ৮ মণেরও কম। এই দুই জাতের ধানের তুলনামূলক উৎপাদনে দেখা গেছে ‘বিকল্প’ ধান জাতটির ফলন বেশ ভালো। তাছাড়া এই একই জমিতে পূর্বের বছরগুলোতে অন্যান্য জাতের ধান চাষ করতেন। সেই জাতগুলো কখনোই ৪/৫ মণের অধিক ফলন হতোনা।
ধানের ফলন বেশি ও কোনো রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয়নি দেখে কৃষক হাদিস মিয়া বেশ ভবিষ্যতে বেশি পরিমাণ জমিতে এই ধানের চাষ করতে চান। তাই তিনি আগামী আমন মৌসুমের জন্য ১০কেজি বীজ ধান রেখেছেন। দুইজন কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী ২ কেজি বীজ প্রদান করে বাকিটুকু তিনি নিজের জন্য রাখবেন।


বীজ কৃষকের প্রাণ, সম্পদ এবং অস্তিত্ব। ভালো জাতের বীজ চাষ করে একদিকে যেমন কৃষকগণ লাভবান হতে পারেন অন্যদিকে আমাদের পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে। বীজ বৈচিত্র্যতা বাড়ে, পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়। বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে একে অপরের মাঝে বন্ধন দৃঢ় হয়। আর প্যাকেটজাত বীজ চাষে মাটির গুণাগুন নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশেরও ক্ষতি হয়। অধিক পরিমাণে রাসায়নিক ব্যবহারে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। তাই হাদিস মিয়ার মতো কৃষকগণ যদি স্থানীয় জাতের ধান চাষে উদ্যোগি হয় তবে বীজের সংকট দূর হবে। কৃষকের সম্পদ সংরক্ষিত হবে এবং স্থানীয় জাতের বীজ ছড়িয়ে পড়বে গ্রামান্তরে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: