Posted in

করোনার প্রভাব: স্থবির সিলেটের খাসিদের অর্থনীতি

নিরালা পুঞ্জি, শ্রীমঙ্গল থেকে সিলভানুস লামিন
করোনা ভাইরাসের কারণে খাসিদের অর্থনীতি এক অর্থে স্থবির। গত ৪ এপ্রিল থেকে এই গ্রামটি সম্পূর্ণ লক ডাউন করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে খাসিরা তাদের পান বাজারজাতকরণ করতে পারছেন না। মূলত এপ্রিল থেকে খাসিরা তাদের নতুন মৌসুমের পান সংগ্রহ করে থাকেন। হাত টেখিয়া (পান গাছের সবগুলো পাতা সংগ্রহ করা) করার পর খাসিরা প্রায় মাসখানেক নতুন পান পাতা সংগ্রহ করার অপেক্ষায় থাকেন। নতুন সংগ্রহ করা পান পাতাকে খাসিরা লবর বলেন। একমাস ধরে কোন বেচাকেনা করতে না পারায় খাসিরা বলতে গেলে তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়গুলো ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ তাদেরকে যে জীবিকা পরিচালনা করতে হবে! এখানে বলে রাখা ভালো যে, খাসিরা পান বিক্রি করে বাজার থেকে তাদেরকে সবকিছুৃ কিনতে হয়। কিন্তু পান বিক্রি করতে না পারায় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এক অর্থে স্থবির রয়েছে।

নিরালাসহ এলাকার বিভিন্ন খাসি গ্রামের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারায় তারা গভীর সঙ্কটের মধ্যে রয়েছেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানচাষীরা বলতে গেলে সংসার পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন। সঞ্চয়কৃত টাকা ভাঙতে ভাঙতে তারা প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এই প্রসঙ্গে ইসলা পুঞ্জির সারাইলাং ফোনের মাধ্যমে বলেন, “আমার পান বাগানের আয়তন খুবই ছোট্ট। বাগানে যা পান আছে তা বিক্রি করে মোটামুৃটিভাবে সংসার চালাতে পারি। কিন্তু বিগত এক মাস ধরে পান বাগান থেকে পান সংগ্রহ করতে না পারায় আমার সংসারে নানারকম সমস্যা হচ্ছে। বাচ্চারা কতকিছু আবদার করে কিন্তু তাদের আবদার মিটাতে না পারায় খুব অপরাধবোধ করছি।” একই কথা জানান নিরালা পুঞ্জির আলবিনুস পতাম। তিনি জানান, পান সংগ্রহ ও বিক্রি করতে না পারায় তারা সত্যিকার অর্থেই গভীর সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে করোনার ভয়ে খাসিরা পান ক্রেতাদের সাথেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন। নিরালা পুঞ্জিতে গত এক মাস ধরে কোন পান ক্রেতা বা পাইকার আসেননি। এতে করে বিক্রেতা (খাসি জনগোষ্ঠী) ও পান ক্রেতাদের (পাইকার) এর মধ্যে একটি মনস্ততাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনেক পাইকার নিরালা পুঞ্জি লক ডাউন থাকায় অন্য খাসি পুঞ্জিতে (যেসব গ্রাম লক ডাউন হয়নি) পান ক্রয় করতে গেছেন। এই বিষয়ে সোহেল মিয়া বলেন, “নিরালা পুঞ্জিতে আমরা অনেকদিন ধরেই পান ব্যবসা করি। কিন্তু পুঞ্জিটি লক ডাউন থাকার কারণে জীবিকার তাগিদেই আমরা বাধ্য হয়ে অন্য এলাকায় পান কিনতে যাই।” নিরালা পুঞ্জির খাসিরা আশংকা করেছেন লক ডাউন খুলে দেওয়ার পরও হয়তো খুব কম পাইকার গ্রামে আসবে। এতে করে তারা তাদের পান ন্যায্য মূলে হয়তো বিক্রি করতে পারবেন না।

এদিকে, খাসিদের পান বাগানে কয়েক হাজার শ্রমিক (চা বাগানের অনিবন্ধিত শ্রমিক, গারো জনগোষ্ঠী) কাজ করেন। এক মাস ধরে বন্ধ থাকার কারণে এসব শ্রমিকদের খুবই সমস্যা হয়েছে। তারা ‘দিন আনে দিন খায়’ ধরনের শ্রমিক। একদিনে কাজ না করলে তাদের পরিবারের খাদ্য সমস্য্ াদেখা দেয়। পান বাগানে কাজ করতে না পারায় তারা অনেকে অন্য এলাকায় কাজের সন্ধানে ছুটে যেতে চান কিন্তু গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সেটাও করতে পারছেন না। এই প্রসঙ্গে ফয়সাল আরেং ফোনের মাধ্যমে জানান, কাজ করতে না পারায় তার পরিবারে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তার সন্তানের তার কাছ থেকে বিস্কুট বা চকলেট খাওয়ার টাকা পর্যন্ত দিতে পারছেন না। এতে করে তিনি চরম মানসিক অশান্তিতে রয়েছেন। একই আশঙ্কার কথা জানান রুবেল ম্রং, রবিন আরেংসহ আরও অনেকে।

শুধু নিরালা পুঞ্জিই নয়; বলতে গেলে খাসিদের অনেক গ্রামেই অর্থনীতির চাকা এক প্রকার স্থবির। মানুষের ভেতরে আনন্দ নেই, স্বতঃস্ফুর্ততা নেই; আছে শুধু হতাশা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। তবে আশার কথা হচ্ছে, সবাই মনে করেন একদিন না একদিন তারা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.