সাম্প্রতিক পোস্ট

পায়রা প্রান্তিক জনগোষ্ঠির খাদ্য সংকট মোকাবিলায় হাতিয়ার

হরিরামপুর থেকে মুকতার হোসেন

করোনা দুর্যোগের বৈশ্বিক প্রভাব বাংলাদেশেও বিরাজমান। শহর-নগর-গ্রাম-চরাঞ্চল সর্বত্রই করোনা মহামারী মানুষের দৈনন্দিন যাপিত জীবনে বিরূপ প্রভাব নিয়ে এসেছে। মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার পাটগ্রাম চরবাসী প্রান্তিক মানুষের জীবনেও করোনা এসেছে নিদারুন খাদ্যসংকটের দুর্ভোগ হয়ে।

মহামারী করোনা চরবাসী প্রান্তিক জনগোষ্ঠি যাদের দৈনন্দিন আয়ই জীবিকার প্রধানতম অবলম্বন তাদের জীবনে অসহনীয় দূরবস্থার সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী চাল, ডাল, তেল, পিয়াজ, রসুন, আদা, চিনি ও মসলার দাম। একই সাথে চরের স্থানীয় বাজারে মানুষের প্রধান খাদ্য চালের দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৮-১০ টাকা। এমনি নাজুক পরিস্থিতিতে মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর চরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের নিজ জমিতে উৎপাদিত গম ও পায়রা (যব) খেয়ে উদ্ভুত সংকট পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। চরবাসি ভাতের বিকল্প হিসাবে গম ও পায়রার রুটি ও ছাতু খেয়ে দিনযাপন করছেন।

পাটগ্রাম চরের প্রান্তিক কৃষক আহম্মদ আলী (৫৫)’র সাথে কথা বলে জানা গেল, চাল স্থানীয় বাজারে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে যা তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। তাই নিজের জমিতে উৎপাদিত গম ও পায়রা বর্তমানে তার পরিবারে ভাতের চাহিদা পুরণ করছে। তিনি বলেন, “চলতি মৌসুমে ২ বিঘা (৬৬ শতক) জমিতে গম এবং ৩ বিঘা জমিতে পায়রা চাষ করেছি। আমি ১৬ মণ গম এবং ১৫ মণ পায়রা পেয়েছি। তার মধ্যে ৫ মণ গম ও ২ মণ পায়রা বীজ হিসেবে রেখেছি”। তিনি জানান, পায়রা শুধু চরের মানুষের খাদ্যই নয় বরং চরে গৃহপালিত প্রাণিসম্পদের খাদ্য হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। চরের গরু, ঘোড়া, ছাগল ভেড়ার খাদ্য হিসেবে পায়রা অত্যন্ত উপযোগী খাদ্য। এ ছাড়া পায়রা দিয়ে ছাতু ও রুটি বানিয়ে খাওয়া যায়। হরিরামপুর চরাঞ্চলে পাটগ্রামচর, নটাখোলা, সেলিমপুর, জয়পুর, বসন্তপুর, সুতালড়ী ও আজিমনগড় ইউনিয়নে এ বছর ব্যাপকভাবে গম ও পায়রার চাষ হয়েছে।

বেসরকারী উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক বারসিক ২০০৯ সাল থেকে পাটগ্রাম চরাঞ্চলে কৃষকদের পায়রা চাষে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করে আসছে। বারসিক চরাঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি অনুযায়ী উপযোগি ফসল চাষাবাদ, সম্প্রসারণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, বৈচিত্র্যময় ফসল চাষের উপর কৃষক অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর, তৃণমূল আলোচনা সভা, বীজ বিনিময়, বীজ মেলা, পায়রা দিয়ে তৈরি নানা ধরনের খাদ্য-উৎসবের আয়োজন, অভিজ্ঞ কৃষকদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও তথ্য আদান প্রদানসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। কাজের ধারাবাহিকতায় কৃষকদের মধ্যে একতা, কৃষকদের নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, ফসলের সঠিক মূল্য পাওয়া, ও সরকারী পরিসেবা প্রাপ্তির জন্য কৃষকরা গড়ে তুলেছেন লেছড়াগঞ্জ চরউন্নয়ন কৃষক সংগঠন, হরিহরদিয়া কৃষক সংগঠন, উত্তর পাটগ্রাম নারী উন্নয়ন সংগঠনসহ চরের তরুণরা ও গড়ে তুলেছেন একাধিক সামাজিক সংগঠন। পাশাপাশি লেছড়াগঞ্জ চরউন্নয়ন কৃষক সংগঠন স্থানীয় জাতের বীজবৈচিত্র্য রক্ষা, পরষ্পর বিনিময়, দুর্যোগকালীন সময়ে কৃষকদের বীজ সহায়তার জন্য ২০১৪ সালে গড়ে তুলেছেন ‘বৈচিত্র্যময় ফসলের বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র’ যা চরে নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্বেও চরবাসীর স্থায়িত্বশীল কৃষিব্যবস্থা ও জীবিকা অব্যাহত রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: