সাম্প্রতিক পোস্ট

দুল কলমী হাওরবাসীদের জ্বালানির চাহিদা পূরণ করে

কলমাকান্দা নেত্রকোনা থেকে ঝলমল খংস্টিয়া

দুল কলমী প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো একটি উদ্ভিদ। হাওরাঞ্চলে উজাউড়ি নামেই পরিচিত এই দুল কলমী। হাওরাঞ্চলে এটি বেশি জন্মে। দুল কলমীর সাথে হাওরবাসীদের একটি অচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। কেননা এই উদ্ভিদ তাদের সংসারের জ্বালানির চাহিদা যেমন পূরণ করে তেমনিভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা বন্যা থেকে তাদের বসতভিটাকে রক্ষা করে। বসতভিটাকে মজবুত করার জন্য হাওরবাসীরা বাঁশ দুল কলমী রোপণ করেন। এই উদ্ভিদটি পানি সহনশীল এবং সহজে মরে না বিধায় হাওরবাসীরা এটিকে বসতভিটার বাঁধ ও বেড়া হিসেবে ব্যবহার করেন।

?নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলাটি হাওরাঞ্চলে অবস্থিত। এই উপজেলার পূর্বদিকে মহিষা হাওর, বড় হাওর এবং অন্যান্য ছোট বড় বিল রয়েছে। বর্ষাকালে ৬ মাস পানি বন্দী থাকায় হাওরাঞ্চলের মানুষ গুচ্ছভাবে বাস করেন। একটি গুচ্ছ থেকে আরেকটি গুচ্ছে যাতায়াতের জন্য তারা বাঁশের সাকো ও নৌকা ব্যবহার করেন। বছরে তারা মাত্র একটি ফসল ফলাতে পারেন এবং সেটি হচ্ছে বোরো ধান। বছরের বেশির ভাগ সময়ে পানি বন্দী থাকায় হাওরাঞ্চলের মানুষেরা নানান টানাপোড়েন ও অভাব-অনটনের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। উপরোন্তু আগাম বন্যা যদি বোরো ফসল ভাসিয়ে নেয় তাহলে তাদের কষ্টের সীমা নেই। এই প্রতিকূলতার মাঝেও হাওরাঞ্চলের মানুষের সংগ্রাম করে তাদের ফসল ও বসতভিটা রক্ষার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো হিজল, করচ এবং দুল কলমী উদ্ভিদগুলো তাদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ায়। তাই তো তারা এসব উদ্ভিদ নষ্ট করেন না; বরং সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেন।

দুল কলমী উদ্ভিদটি হাওরবাসীদের জ্বালানির চাহিদাও পূরণ করে। তবে জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এসব উদ্ভিদ আগের মতো আর পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির আশপাশে পাওয়া যায় না বলে এসব জ্বালানি সংগ্রহে হাওরবাসী বিশেষ করে নারীদের অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হয়। বসতবাড়ি থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে গিয়ে বিলে ও উচু জমিতে এসব জ্বালানি সংগ্রহ করেন নারীরা। সংগৃহীত দুল কলমীগুলোর ওপর গোবরের প্রলেপ দেওয়া হয়। এরপর রোদে শুকিয়ে রাখা হয়। সাধারণত হাওরবাসীরা দুলকলমী শুকানোর পর অগ্রহায়ণ থেকে বৈশাখ মাস পযর্ন্ত এটি ব্যবহার করেন।

আগের মতো দুল কলমী উদ্ভিদটি কেন পাওয়া যাচ্ছে না জানতে চাইলে হাওরাবাসীরা জানান, আগে মানুষ কম ছিল অল্প জমিতে বেশি ধান হতো এবং বেশিরভাগ জমি পতিত থাকতো। এই পতিত জমিতে দুল কলমী জন্মাতো এবং সহজে এটি সংগ্রহ করা যেতো। কিন্তু বর্তমানে সব জমিউ চাষ হচ্ছে এবং উজাউড়ি গাছ (দুল কলমী) উপড়ে ফেলা হতো জমি চাষ দেওয়ার সময়। এছাড়াও কৃষকরা বেশি ধান পাওয়ার আশায় রাসায়নিক সার ব্যবহার, রিফিট ছিটানোর ফলে গাছের গুঁড়াগুলো পচে গিয়ে মরে যায়। ফলে দিনে দিনে এসব উদ্ভিদ কমে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, খাস জমিগুলোতে যদি উজাউড়ি বা দুলকলমী সংরক্ষণ করা যেত তাহলে হাওরবাসীর জ্বালানির চাহিদা একদিকে যেমন পূরণ হবে, পারিবারিক ব্যয় সাশ্রয় হবে তেমনিভাবে বসতভিটাকে মজবুত করার জন্য সহজে এ উদ্ভিদ ব্যবহার করতে পারবেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: