সাম্প্রতিক পোস্ট

বরেন্দ্র অঞ্চলে পুরী কচুর অপার সম্ভাবনা

নাচোল, চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে রঞ্জু আকন্দ

বরেন্দ্র অঞ্চলের চাঁপাই-নবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার জোরপুকুর গ্রামের কৃষক মো. জিয়াউর রহমান(৪৫) একজন উৎসাহি কৃষক। কৃষিতে নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন প্রতিনিয়ত। তাঁর নিজস্ব ৪ বিঘা জমিতে সারা বছরই ফসল উৎপাদন করে সংসারে সচ্ছলতা নিয়ে এসেছেন। যেখানেই কৃষির নতুন বিষয় দেখেন সেখান থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজে প্রয়োগ করেন। তিনি ২০১৮ সালে আত্মীয়ের বাড়িতে প্রথম দেখেন পুরী কচুর চাষ সেখান থেকে শখের বসে এক কেজি পরিমাণ বীজ নিয়ে এসে প্রথমে বাড়ির আঙিনায় রোপণ করে রাখেন। সেখান থেকেই তাঁর যাত্রা শুরু।

প্রথমবছর বাড়ির আঙিনায় চাষ করা কচু থেকে ৭ কেজি বীজ সংগ্রহ সম্ভব হয়। ২০১৯ সালে বাড়ির নিকট ২ শতাংশ পতিত জমিতে ওই ৭ কেজি বীজ পুনরায় রোপণ করেন। এবার সেখান থেকে ২০ কেজি বীজ সংগ্রহ করে পরের বছর চাষ করার জন্য সংরক্ষণ করেন। এবার তিনি কিছু কচু নিজে খাওয়ার কাজে ব্যবহার করেন। এর মাঝে নচোল উপজেলার খরিবোনা গ্রামের কৃষক গবেষক মো. রঞ্জু আকন্দ পুরী কচুর সম্ভাবনা নিয়ে কৃষক জিয়াইয়ের সাথে আলোচনা করে চাষ সংক্রান্ত বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করেন। এছাড়া তিনি জানান, জাতটি এলাকা উপযোগি এবং চাষ করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম কচুটি শুধু বাড়ির আঙিনায় বা অল্প পরিসরে চাষ করা যায় কিন্তু রঞ্জু আকন্দের মাধ্যমে জানতে পারি এটা ব্যাপক পরিসরে চাষ করা সম্ভব। তাই ২০২০ সালে আমি আমার ১১ শতাংশ জমিতে বাণিজ্যিকভাবে কচুটি চাষ করেছি।

বাণিজ্যিকভাবে এই পুরী কচু চাষ করতে হলে বিঘা প্রতি ৬০-৬৫ কেজি বোই/চোখ প্রয়োজন হয়। যেকোন ধরনের জমিতে এই কচু চাষ করা যায় তবে তুলনামূলকভাবে উঁচু জমিতে এই কচু ভালো হয়। ফাল্গুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ে এই কচু জমিতে রোপণ করা যায়। প্রথমে জমি পরিষ্কার করে ৪-৫টি চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হয়। এরপর মাটির সাথে অবশ্যই জৈব সার দিয়ে একটি মই দিয়ে নিতে হয়। এই কচুতে রাসায়নিক সার তেমন প্রয়োজন হয় না। মই দেওয়ার পর লাইন করে ১০ ইঞ্চি ফাঁকা রেখে কচুর বীজগুলো রোপণ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। জমির চারধার দিয়ে পনি নিষ্কাশনের ড্রেন করে দিতে হয়। রোপণের এক মাসের মধ্যে যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে একটি সেচ দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে। এই কচু লতি উৎপাদনের জন্য নয়। গাছে একটি দুইটি লতি হলে তা উঠিয়ে নিতে হয় কচুগুলো ভালো করে বৃদ্ধির জন্য। লাগানো থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত আগাছা দমন ছাড়া তেমন কোন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এর ফসল বাজারজাত করা যায়। তবে বীজ রাখার ক্ষেত্রে কচুগুলো কার্তিক মাস পর্যন্ত জমিতে রাখেতে হয়। বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জমিতে থেকে কচুগুলো তুলে মাটি পরিষ্কার করি ছাঁতে শুকিয়ে নিয়ে ঠান্ডা স্থানে সংরক্ষণ করে রাখতে হয় পরের বছর রোপণের জন্য।

কোন রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয় না বলে এই কচু নিরাপদ ও পুষ্টিগুণ থাকে অটুট। বাজার মূল্য বেশি কিন্তু তেমন উৎপাদন খরচ নেই বলে এই কচু চাষ করা লাভজনক বলে মনে করেন কৃষকরা। আগামী দিনে বরেন্দ্র অঞ্চলে এই কচু চাষ করে অনেক কৃষক লাভবান হবেন বলে আশা করা যায়। চলতি সময়ে কৃষক গবেষক রঞ্জু আকন্দ অন্য কৃষকদের এই কচু চাষে আগ্রহী ও উৎসাহ প্রদানের জন্য নিয়মিত কৃষকদের সাথে আলোচনা করছেন এবং চাষ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় কৃষকদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন।

কৃষকদের মাধ্যমেই এলাকা উপযোগি বিভিন্ন ফসল চাষে কৃষকরা অভ্যস্ত হয়ে উপকার পান। সেখানে শুধু প্রয়োজন সঠিক দিক-নির্দেশনা ও পরামর্শ।

happy wheels 2
%d bloggers like this: