সাম্প্রতিক পোস্ট

ফরিদা পারভীনের জৈব সার

সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে পার্থ সারথী পাল 

বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য সকল প্রাণী এবং উদ্ভিদ যেমন অভিযোজিত হয় তেমনি মানুষও চেষ্টা করে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিভাবে টিকে থাকা যায়। এই টিকে থাকার প্রচেষ্টায় থাকে বিভিন্ন পদ্ধতি, উপায় উদ্ভাবন। বিগত দিনে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপকহারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যাবহারের কারণে মাটির জৈব পদার্থ এবং উপকারী বিভিন্ন প্রকার অণুজীব ধ্বংসপ্রায়। কৃষি পরিবেশের এরূপ ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে বহু পদ্ধতি উদ্ভাবন হয়েছে। মাটিতে জৈব পদার্থ বাড়াতে এবং মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য বিভিন্ন উপায়ে জৈব সার তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন হয়েছে যেমনঃ কেচোঁ কম্পোষ্ট, কুইক কম্পোষ্ট, গর্ত কম্পোষ্ট, স্তুপ কম্পোষ্ট, তরল সার, সবুজ সার ইত্যাদি। এরকমই জৈব সার তৈরির একটি নুতন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন শ্যামনগর উপজেলার হায়বাতপুর গ্রামের কৃষাণী ফরিদা পারভীন।

ফরিদা পারভীন এক ধরনের পচা আবর্জনাভূক পোকা দিয়ে এই জৈব সার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে সফল কৃষাণী ফরিদা পারভীন বলেন, “আমি একদিন আবর্জনা পরিস্কার করতে গিয়ে দেখি যে এক ধরনের পোকা যা আবর্জনাকে সারের মত তৈরি করে ফেলেছে। তখন ওই সারের মত আবর্জনাকে লাউ গাছের মাদায় দিই, তখন দেখি যে দু’তিন দিনের ভেতর গাছগুলো বেশি সতেজ ও সবুজ হয়েছে। আমি তখন নিশ্চিত হলাম এটা খুব উন্নত জৈব সারে পরিণত হয়েছে।” তিনি বলেন, “এরপর আমি ভাবি এ পোকা যখন এখানে সার তৈরি করে আমি যদি এটাকে একটা যায়গায় সার তৈরি করার জন্য রাখি তাহলে বেশি করে সার তৈরি করা যাবে। আমার বাড়িতে গর্ত কম্পোস্ট তৈরির জন্য তিনটি পাকা হাউস আছে এবং তা গর্ত কম্পোস্ট সার তৈরির কাজে ব্যবহার করতাম। আমি চিন্তা করি এ হাউজগুলিতে এ পোক দিয়ে সার তৈরি করব।”
pa.jpg2
এভাবে তিনি হাউজের একটিতে কিছু আধা-শুকনা কচুরিপানা, ছাগলের নাদা, গোবর এবং কলা গাছের কুচি স্তরে স্তরে দিলেন। ২০১৪ সালের মার্চ মাসে পুকুর পাড়ের আবর্জনার ভেতর থেকে কিছু পোকা নিয়ে হাউজের ভিতর ছেড়ে দিলেন। তিনি দেখলেন পোকাগুলো খুব দ্রুত আবর্জনার ভেতর ঠুকে গেলো। মাঝে মাঝে উপর থেকে পানির ছিটা দিতেন তিনি। এরপর মাস খানেকের মধ্যে পোকাগুলো সমস্ত আবর্জনাকে সারে পরিণত করেছে। তখন তৈরি সারকে হাউজের একপাশে সরিয়ে অন্য পাশে নুতন করে আবর্জনা স্তুপ করেন ফরিদা পারভীন। পোকার তৈরি জৈব সার বিভিন্ন গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করে খুব ভালো ফল পান। বর্তমানে তিনি তিনটি হাউজেই এই পোকা দিয়ে জৈব সার তৈরি করছেন। গত বছর এপ্রিলে গর্ত তিনটিতে আবর্জনা ভর্তি করে পোকা ছেড়ে দেন এবং জুলাই মাসে একটি হাউজ থেকে প্রায় দশ মণ, একটা থেকে তিন মণ এবং অন্যটি হতে আড়াই মণ সার পান।

সারগুলো বেশিরভাগ ধানের ক্ষেতে দেন, কিছু সবজিতে ও কিছু ফল গাছের গোড়ায় দেন বলেন জানান। তিনি বলেন, “এই পোকা দিয়ে খুব অল্প সময়ে ভালো একটি জৈব সার তৈরি করা যায়। সার দেখতে কিছুটা ড্যাপ সারের মত। এটা দিলে গাছ খুব দ্রুত বাড়ে। এ সার তৈরিতে তেমন কোনো খরচ এবং পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না।” তিনি আরও বলেন, “পোঁকাটি সম্পর্কে আমার খুব বেশি ধারণা নেই, তবে ছোটবেলা থেকে পোকাটি দেখছি। পোকাটি দেখতে কিছুটা চিংড়ি মাছের মত। অনেকে একে চিংড়ি পোঁকা বলে। পোকাটি হালকা সাদা-ঘিয়ে রঙের, আঙ্গুলের মত লম্বা হয়, মুখের দিকে কালচে-খয়েরি, কয়েকটি পা আছে এবং ঘা মারলে গুটিয়ে যায়। আমি এই পোকার কেনো ক্ষতিকর দিক দেখতে পায়নি।” এই পোঁকা নিয়ে তিনি আরো গবেষণা এবং অন্যদের এই জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করবেন বলে জানান। তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে সার তৈরি করার জন্য তাঁর কাছ থেকে এ পোকা নিয়েছে ধুমঘাটের অল্পনা মিস্ত্রি, সোনামুগারীর কহিনুর বেগম, দাদপুরের ছুরাতুন্নেছা এবং হায়বাতপুরের ছালেহা বেগম।
pa
ইন্টারনেট তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, পোকাটি স্ট্যাগবিটল জাতীয় পোকার লার্ভা। এ ধরনের পোকার লার্ভা পচা আবর্জনা বিশেষ করে কাঠ জাতীয় খাবার খেয়ে বড় হয়। পোকাটি লার্ভা অবস্থায় দীর্ঘদিন (১-৭ বছর) থাকতে পারে। লার্ভা সাধারণত মাটির নিচে ককুন (পূর্ণাঙ্গ পোকা হওয়ার পূর্বের সুপ্ত অবস্থা) তৈরি করে। ককুন হতে পূর্ণবয়স্ক পোঁকা মে-আগস্ট মাসের দিকে বের হয়। পূর্ণাঙ্গ পোকা মিলিত হওয়ার পর মাটির নিচে ছোট-ছোট গোল আকৃতির ডিম পাড়ে এবং ডিম পাড়ার কিছুদিন পর মারা যায়। পূর্ণাঙ্গ পোকা সাধারণত তেমন কিছু খায় না। শীতের সময় সাধারণত কোনোও পূর্ণাঙ্গ পোকা বেঁচে থাকে না। মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। এ পোকার লার্ভা ব্যবহার করে কেউ কম্পোস্ট সার তৈরি করেছেন কিনা তা জানা যায়নি। কৃষাণী ফরিদার উদ্ভাবিত পোকার সাহায্যে জৈব সার তৈরির এই পদ্ধতি উপকূলীয় লবণাক্ত কৃষি পরিবেশের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমরা মনে করি।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: