সাম্প্রতিক পোস্ট

নিজে চাষ করি, তৃপ্তিতে খাই

আটপাড়া, নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

কিছু কিছু নারীদের আলাদা করে উপমা দেওয়া হয় যেমন, সব্জী চাষী নারী বা কৃষাণী। অথচ গ্রামের প্রতিটি নারীই কিন্তু সব্জী চাষী বা কৃষাণী। তাঁরা স্বভাবতই চাষাবাদের সাথে যুক্ত। একজন কৃষক যখন লাঙ্গল জোয়াল নিয়ে মাঠে যায়- তখন দূর থেকে দেখেই বোঝা যায় উনি কৃষক। কারণ কৃষি কাজের চিহ্ন বা দৃশ্যমান বস্তু তার সাথে আছে। অথচ একজন নারী ঘরের কোণে মাটি খুঁড়ে যে শশার বীজটি রোপন করলো বা উঠানের এক পাশে মিষ্টি কুমড়ার বীজটি পুঁতে দিল- তাকে কিন্তু কেউ কৃষক বলেনা। এর কারণ হতে পারে তার হাতে চাষাবাদের জন্য দৃশ্যমান কোনো বস্তু নেই। বা আমরা আজন্ম শুনেই অভ্যস্থ। নারীরা কোনো কাজ করেনা। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এই নারীরাই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছেন আমাদের চাষাবাদ। নিজের হাতই তাঁর কৃষি কাজের উপকরণ। তাঁর মমতাময়ী হাতের ছোঁয়ায় গেরস্থ ঘর ফলে-ফসলে ভরে উঠে। তাই বাড়ির আঙিনায় সব্জী আবাদ করতে তাঁর কোনো উপকরণ বা যন্ত্রের প্রয়োজন হয়না।

আধুনিক কৃষির হাত ছানিতে একজন কৃষক দিক হারাতে পারেন। কিন্তু কৃষানী তা করেন না। তিনি নিজের জ্ঞান, চর্চা, অভিজ্ঞতাকে কখনো অন্যের দখলে যেতে দেয়না। এমনকি কৃষকদেরকেও সেই পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। নারীদের এই অভিজ্ঞতার আলোকেই টিকে আছে আমাদের কৃষি, আমাদের জীবন।

লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের ছোট্ট একটি গ্রাম সুলতানগাতী। এই গ্রামে ৭০টি পরিবারের বসবাস। গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে কোনো সব্জীর আবাদ হয়না। কিন্তু তাই বলে গ্রামের মানুষদের বাজার থেকে সব্জী কিনতে হয় না। প্রত্যেক বাড়ির নারীরা তাঁদের আঙিনায় প্রতি মৌসুমে বিভিন্ন সব্জীর আবাদ করেন, যা দিয়ে তাদের চাহিদা পূরণ হয়। বাড়ির উঠোন, ঘরের চাল বা দেউরির (বাড়ির গেইট) পাশে বাঁশের কঞ্চি অথবা অস্থায়ী মাঁচায় সব্জী ঝুলে থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন মৌসুমের এই সব্জী দিয়েই পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছেন আমাদের গ্রামাঞ্চলের নারীরা। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে কিছু অংশ গ্রামে বা বাজারে বিক্রি করে অর্থও সঞ্চয় করেন তাঁরা। তাঁদের শ্রমে, ঘামে একদিকে যেমন পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। অন্যদিকে তেমনি পরিবারের আর্থিক সমস্যা দূর হচ্ছে। তারচেয়ে বড় কথা হলো স্থানীয় জাতের বীজ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে। আবার বাজার নির্ভরশীলতাও কমছে।

Exif_JPEG_420

এমনই অনেক নারীর মধ্যে একজন হলেন ফিরোজা আক্তার। তিনি বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন প্রকার সব্জীর আবাদ করেন। যা দিয়ে ৪ জনের পরিবারের সব্জীর চাহিদা পূরণ হয়। তাঁর আবাদকৃত সব্জীর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিম। তিনি নিয়মিতই ৭ প্রকার শিম রোপন করেন। যেমন, গুতুম, চিক্রা, বোয়ালের পেডি, ফুলি, খৈলা, আইশনা ও দেশি শিম রয়েছে। এছাড়া মিষ্টি কুমড়া, করলা, দেশি লাউ, মিষ্টি আলু, চালকুমড়া, ডাটা, পুঁইশাক, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা ও শশার চাষ করেন। এসব চাষের জন্য আলাদা কোনো জমি তাঁর নেই। উঠানের এক পাশে ও বাড়ির সামনের খালি জায়গায় মাঁচা বেঁধে তাতে লতানো সব্জী ও মাচার নিচের অংশের মাটিতে অন্যান্য সব্জী রোপন করেন। প্রায় ৭-৮ বছর যাবৎ এভাবেই তিনি সব্জী চাষ করে যাচ্ছেন। পরিবারে উপার্জনক্ষম একজন ব্যক্তি ছিলেন, তাঁর স্বামী। তিনিও প্রায় ৩ বছর শয্যাশায়ী থেকে মাস দু’য়েক হলো মারা গেছেন।

স্বামী যখন সুস্থ্য ছিল তখন অন্যের জমিতে কাজ করে সংসারের চাহিদা পূরণ করতেন। কিন্তু অসুস্থ্য হবার পর থেকে তা করতে পারতেন না। ফিরোজা আক্তার আগে থেকেই সব্জী চাষ করতেন। তবে তা খুবই সামান্য পরিমানে। স্বামী অসুস্থ্য হবার পর অভাবে যখন সংসার চলছিলো না; তখন তিনি সব্জী চাষের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলেন। নিজ গ্রাম ও অন্য গ্রামের পরিচিতদের কাছ থেকে বিভিন্ন বীজ সংগ্রহ করলেন। নিজে মাটি কেটে চাষের উপযুক্ত করে তুললেন। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মাঁচা বাঁধলেন। এভাবেই শুরু হলো তাঁর সব্জী চাষ। আস্তে আস্তে গ্রামের অনেকেই তাঁর কাছ থেকে সব্জী কিনে নিতে থাকলো। সেই টাকা দিয়ে তিনি সংসারের হাল ধরলেন। গত মৌসুমে তিনি ৫০০০/= (পাঁচ হাজার) টাকার সব্জী বিক্রি করেছেন।

গ্রামের অনেক নারীই তাঁর কাছ থেকে নানা ধরনের বীজ সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। তবে কোনো বীজ তিনি বিক্রি করেন না। এ সকল বীজ তিনি পরের মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করেন। বাজারের কোনো সার তিনি ব্যবহার করেন না। বাড়িতে গরু আছে। গোবর, ছাই ইত্যাদি তিনি সব্জী চাষে ব্যবহার করেন।
ফিরোজা আক্তারের মতো অনেক নারী এভাবেই আমাদের অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। কারো প্ররোচনা বা প্রলোভনে নয়। একদমই নিজের প্রয়োজনে- নিজের মতো করে চাষাবাদ করছেন। এবং এই চাষাবাদের জন্য তাঁদের যে সমস্ত উপাদানের প্রয়োজন হয়- তার জন্য কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেই যোগাড় করেন। নিজ পরিবার, গ্রাম ও পরোক্ষ ভাবে প্রকৃতি-পরিবেশের স্থায়ীত্বশীলতাকে রক্ষা করে চলেছেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: