সাম্প্রতিক পোস্ট

সম্পদের স্থায়িত্বশীল ব্যবহারে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন অল্পনা রাণী

:: শ্যামনগর সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

Untitledএকজন অল্পনা রাণী
যুগে যুগে নারীরা প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে টিকিয়ে রেখেছে প্রাণবৈচিত্র্য এবং আমাদের খাদ্য ভান্ডার। সেই সাথে প্রাণবৈচিত্র্যের স্থায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনায় সমৃদ্ধ করেছে নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। একসময় উপকূলীয় কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলের প্রতিটি কৃষি বাড়িই ছিল একটি খামার। স্থানীয় পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের আকার পরিবর্তন করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ একটি কৃষি বাড়ি বা খামার তৈরি করতো। একটি/দুইটি বসতঘর, বীজ ঘর, গোয়াল ঘর, হাঁস-মুরগির ঘর, জ্বালানি ঘর, সবজি ক্ষেত, মিষ্টি পানির পুকুর, ধান ক্ষেত, বসতভিটার চারিধারে ফলজ ও বনজ গাছের বাগান, ঢেঁকিঘর, গোলাঘর ইত্যাদি ছিল একটি কৃষি পরিবারের স্বাভাবিক কাঠামো, যার মাধ্যমে ওই পরিবারের টেকসই জীবনযাপন নির্বাহ হতো। কৃষি বাড়ির এই কাঠামোর সাথে প্রতিটি উপাদান পরস্পর নির্ভরশীল এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জীবনের সাথে রয়েছে আন্তঃসম্পর্ক। আধুনিক কৃষির প্রচলন, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকান্ড এবং অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ বাংলাদেশের উপকূলীয় কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলের অসংখ্য কৃষি পরিবারের সেই চিরচেনা কৃষি কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট গ্রামের কৃষাণী অল্পনা রানী (৪৪) এখনও নিজের প্রচেষ্টায় টিকিয়ে রেখেছেন কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কৃষি বাড়ি। প্রতিকূলতাকে জয় করে জৈব পদ্ধতিতে সমন্বিত কৃষি চর্চা করে সফল হয়েছেন। এলাকার অনেক নারীর সামনে তিনি একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন যে, ইচ্ছাশক্তি, উদ্যম ও আন্তরিকতা থাকলে যে কেউ তার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন। তার এই উদ্যোগের স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, অধিদপ্তর এবং এমনকি তিনি বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক পুরুষ্কারে ভূষিত হয়েছেন।

কি করেছেন অল্পনা রাণী?
অল্পনা রাণীর জমি-জমা বলতে ৩৩ শতক বসতভিটা ছাড়া আর কিছুই নেই। সামান্য এ বসতভিটা জমির কীভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হয় সেটা তিনি দেখিয়েছেন। বসতভিটায় স্বামীর সহযোগিতায় মৌসুম ভিত্তিক আলু, টমেটো, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, বরবটি, ডাটাশাক, ওলকপি, ফুলকপি, বাধাকপি, মুলা, উচ্ছে, শিম, লালশাক, পালংশাক, চালকুমড়া, লাউ, কচুরমুখি,পুইশাক, শসা, মরিচ, পেয়াজ, রসুন, হলুদ ও সরিয়া ইত্যাদি সবজী চাষ করি। গৃহস্থালীর কাজ, বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদন, প্রাণী সম্পদ পালন এবং সমন্বিত কৃষি কাজ (পাতার চাতর তৈরি, ধান রোপণ, ধান কাটা মাড়াই, বীজ সংরক্ষণ) সহ সব ধরনের কাজই তিনি করেন। বসতভিটায় বৈচিত্র্যময় কৃষি চর্চার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি স্বামীর পরামর্শে ২-৩ বিঘা জমি বর্গা নেন। বর্গা নেওয়া জমিতে তিনি বছরব্যাপী ধান ও শাকসবজি চাষ করেন। এভাবে বৈচিত্র্যময় শাকসবজি চাষাবাদ করার মধ্যে দিয়ে অল্পনা রাণী তাঁর সংসারের অভাব দুর করতে সক্ষম হন। ধান ও শাক সবজি আবাদ করায় একদিকে যেমন তাকে বাজার থেকে চাল ও শাকসবজি কিনতে হয় না অন্যদিকে পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন।

Untitlরিedবৈচিত্র্যের সমারোহ অল্পনা রাণীর বসতভিটা
অল্পনা রাণীর বসতভিটা বৈচিত্র্যে ভরপুর। কী নেই তাঁর বসতভিটায়? তাঁর এক বিঘা বসতভিটায় রয়েছে ফলজ ও বনজ উদ্ভিদ যেমন: আম (গোবিন্দভোগ, নিলাম্বরী, লতা) জাম, কলা (সবরি, কাঁচকলা, কাঁঠালে, বড়বাউলে, ডয়রা) নারকেল, পেয়ারা (দেশী, কেজি ও লাল), পানি আমড়া, সবেদা, জামরুল (সাদা ও লাল), বাতাবি লেবু, ডাবো, ডুমুর, তাল, খেঁজুর, করমচা, কেওড়া, নিম, কদবেল, পাতিলেবু, লিচু, আপেল, কুল (নারকেল, বিলিতে), তেঁতুল, আঁশফল, আমলকি, জলপাই, গবেদা, কমলালেবু, ডালিম, বেদানা, কাঁঠাল, সুপারি, পেঁপে, গাব গাছ, দেশী বেল। অন্যদিকে চিকিৎসার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় গাছ-গাছড়া নিজ গ্রাম ও বাড়ির আশপাশ থেকে সংগ্রহ করে রেখেছেন তিনি। প্রয়োজনে কোন উদ্ভিদ খুঁজে পেতে অনেক বেগ পোহাতে হয় তাকে। এ কারণে তিনি এ সব প্রয়োজনীয় উদ্ভিদকে হাতের কাছে পেতে নিজ আঙিনায় গড়ে তুলেছেন ছোট একটি ঔষধি গাছের বাগান। তাঁর বাগানে রয়েছে অনন্তমূল, অপরাজিতা, ঈষাণমূল, লালকেউটে, কালকেউটে, শিউলি, সোনাঝুরি, কৃষ্ণ তুলসী, রাধা তুলসী, মাধবীলতা, যাঁতিফুল, শিষ আকন্দ, শ্বেত আকন্দ, বাউফুল, কানফুল, ঝাউগাছ, চিরবসন্ত, পাথরকুচি, দূর্বাঘাস, মেহেদী, ধুতরা, গাদাফুল প্রভৃতি। এছাড়া তাঁর বসতভিটায় সারাবছর মৌসুমভিত্তিক লালশাক, ডাটাশাক, পালংশাক, সীম, বরবটি, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, ঢেড়স, চালকুমড়া, উচ্ছে, করল্লা, বেগুন, টমেেেটা, ওল, কচুরমুখী, আদা, হলুদ, শসা, পেঁয়াজ, রসুন, পুইশাক, সরিষা, মরিচ/ঝাল, আলু, ওলকপি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মূলা, বড় আলু. মানকচু ইত্যাদি চাষাবাদ ও সংরক্ষণ করেন।

অচাষকৃত শাকসবজির সংরক্ষণ ও পশু পালন
অল্পনা রাণী শুধু বৈচিত্র্যময় শাকসবজি আবাদই করেন না প্রকৃতিতে যে অচাষকৃত শাকবসজি রয়েছে সেগুলোর যত্ন, ব্যবহার ও সংরক্ষণ করছেন। এগুলো তার পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি জানান। অল্পনা রাণী তাই আদাবরুন/বিলশাক, তেলাকচু, ঘুমশাক, কলমিশাক, গাদামনি শাক, হেলাঞ্চ, মাটিফোড়া শাক, খুদকুড়ো, হাতিশূর, সেঞ্চি শাক, ঘোড়া সেঞ্চি, কাটানটি, গিমে শাক, থানকুনি, কালকচু প্রদর্শনী প্লট করে সংরক্ষণ করেছেন।

অন্যদিকে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং আর্থিক উপার্জনের জন্য অল্পনা রানী বিভিন্ন প্রাণীসম্পদ (গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, কবুতর, শালিক ও ভেড়া) পালন করেন। তাছাড়া, নিজের মিষ্টি পানির পুকুরে সারাবছর কৈ, শিং, মাগুর, মলা, শোল, ঢেলা, চ্যাং, ব্যাদলা, পুঁটি, মরুল্য, রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, খুরকুল্লো, আমলেট, খয়রা, গলদা, টেংরা, চিংড়ি সংরক্ষণ করেন।

অন্যদের উৎসাহদাত্রী
এছাড়াও তিনি একজন ভীষক (কবিরাজ) চিকিৎসক হিসেবে এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। অল্পনা রাণীর প্রধান লক্ষ্য হল গ্রামের প্রতিটি বাড়ি যেন তার বাড়ির মত হয়। কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সমৃদ্ধ একটি সমৃদ্ধশীল জনপদ গড়ে তোলাই অল্পনা রাণীর মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি বিভিন্ন নারীকে নানাভাবে, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সহযোগিতা করেন। মূলত ২০১২ Untitুিৃlরিedসালে বারসিক’র কাছ থেকে গ্রামীণ নারী সম্মাননাসহ বিভিন্ন পরামর্শ ও উপকরণ পাওয়ার পর থেকে তিনি নব উদ্যমে এ কাজটি করে গেছেন। এলাকার অন্য নারীদেরকে ক্ষমতায়িত করা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে তারা যেন অবদান রাখতে পারে সে জন্য তিনি নিজ এলাকার সব পেশাজীবী নারীদের নিয়ে ২০১৪ সালে গড়ে তুলেছেন ধূমঘাট শাপলা নারী উন্নয়ন সংগঠন। এই সংগঠনের ব্যানারে অল্পনা রাণী তাঁর উৎসাহমূলক কাজ, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং অন্যান্য সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন নারীদের।

স্বীকৃতি
অল্পনা রাণীর এই উদ্যোগ তাকে শুধু স্বাবলম্বীই করে তুলেনি; এনেছে বিভিন্ন সম্মান ও স্বীকৃতিও। সমন্বিত কৃষি চর্চার সফলতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাকে সনদপত্র দিয়ে স্বীকৃতি দিয়েছে। এভাবে তিনি একে একে লাভ করেন ২০১৩ সালের লোকবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় প্রদত্ত ক্রেস্ট ও সনদপত্র, সাতক্ষীরা-৪ আসনের মাননীয় সংসদ কর্তৃক প্রত্যায়নপত্র, উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক সনদপত্র, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক কর্তৃক সনদপত্র, সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম কর্তৃক সম্মাননাপত্র, উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কেন্দ্র কর্তৃক পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখায় পরিবেশ সম্মাননা সনদপত্র, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য কর্র্র্র্তৃক সনদপত্র, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক সনদপত্র, উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক সনদপত্র অর্জন করেছেন। অল্পনা রাণীর পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগ আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৪ সালে সমন্বিত কৃষি চর্চায় অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী অল্পনা রাণী উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার লাভ করেন। সবচে’ বড় স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক (ব্রোঞ্জ) ১৪১৯ লাভ করেন। প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অল্পনা রাণীর কৃষি বাড়ি উপকূলসহ বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলের কৃষিঐতিহ্য,অস্তিত্ব, সংস্কৃতি এবং স্থায়িত্বশীল জীবনযাত্রার দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল। বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকায় এরকম আরও অনেক অল্পনা রাণীর তৈরি হোক!

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: