সাম্প্রতিক পোস্ট

কৃষি ও করোনা

ঢাকা থেকে কৃষিবিদ এবিএম তৌহিদুল আলম

এক
করোনাক্রান্ত এ সময়টা অন্যসব সময়ের থেকে একেবারেই অন্যরকম। বিশ্বের সাথে সরাসরি পারস্পরিক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ। বিগত ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ চীনের হুবেই প্রদেশের ইউহানে ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির শরীরে প্রথম কোভিড-১৯ ধরা পড়ার পর থেকে বিশ্বের তাবৎ মাথাওয়ালা মানুষগুলো এই অদৃশ্য মাথাহীন ভাইরাসের কাছে পরাজিত হয়ে ঘরবন্দী জীবনযাপন করছে যা বিশ্বের উৎপাদন খাতসমূহকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু সভ্যতার আদি শ্রমিক, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের জন্য নিরলসভাবে খাদ্য-ফসল উৎপাদন করেন তাদের কাজ থামেনি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতোই বলতে হয় “গাহি তাহাদের গান-ধরণীর হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান”। বতমানে তাই সময় এসেছে আমাদের নিজেদের স্বার্থে করোনাকালীন ও করোনা পরবর্তী সময়ে এই খাত ও এইখাতের কৃষকদের নিয়ে বাস্তব ভিত্তিক পরিকল্পনাও তা সম্পাদনে সম্ভব সবকিছু করা।

বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষি ও কৃষক। শিল্পবিপ্লবের পর কৃষির কদর আপাত কম মনে হলেও এখনও বহুদেশে কৃষিই প্রধানতম ও উল্লেখযোগ্য খাত হিসেবে বিবেচিত। করোনা সর্বোতভাবে প্রমাণ করেছে মহামারীর কারণে লকডাউনে অন্যান্য শিল্প স্থবির হলে কৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত কৃষি কখনোই স্থবির হয় না। বরং দুর্যোগকালীন সময়ে ঝুঁকি এড়িয়ে কৃষির চর্চা সাবলীল ভাবেই পরিচালিত হতে পারে। এমনকি অন্যান্য অনেক শিল্পের কাঁচামালের মূল যোগান দিয়ে সেগুলোকেও সচল রাখতে সক্ষম। বাংলাদেশে কৃষিপণ্য রপ্তানি করে প্রতি বছর বৈদেশিক মুদ্রার আয়ও নেহাত কম নয়। সারাবছর এমনকি যেকোন দুর্যোগকালীন সময়ে এই খাতই হয়ে উঠে দেশের মানুষকে দূর্ভিক্ষ থেকে বাঁচানোর নির্ভরতার প্রতীক। যদিও এই শিল্পের সাথে জড়িত কারিগররা সবসময় থেকেছেন অবহেলিত। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে কৃষি, দেশের অভ্যন্তরের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তৈরি পোশাকশিল্প এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্সের ওপর। শেষের দুটি কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। কৃষি চিরস্থায়ী। নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আবহাওয়ার প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কৃষিকে টিকে থাকতে হয়। জাতিকে ক্ষুধামুক্ত রাখতে এবং অপুষ্টি থেকে বাঁচাতে আমাদের কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানীও কৃষিসম্প্রসারণ কর্মীদের অবদান খুব কমই আলোচিত হয়। আজ বাংলাদেশ যে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে তাতে কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষকের অবদান বিরাট। ধান, গম, ডাল, তেলবীজ, ইক্ষু, শাকসব্জিই শুধু নয়, ফলমূলের উৎপাদন, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য পালন প্রভৃতি ক্ষেত্রে কৃষিবিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণকর্মী কৃষকদের সহযোগিতা করেছেন। মাছ-মাংস, সবজি, দুধ, ডিম ও অন্যান্য শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের কৃষকের সাফল্য বলে শেষ করা যাবে না। কয়েকটি কৃষিজ উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারির ৫টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। এখনো আমাদের ডাল, মসলা, ভোজ্যতেল প্রভৃতি আমদানি করতে হয় বটে তবে বাংলাদেশ শাকসব্জি ও ফলসহ বেশ কিছু কৃষিপণ্য রপ্তানিও করে থাকে।

দুই
কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার কয়েকমাস পরে মার্চ মাসের শুরুতে বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। মার্চ মাসের শেষেই যা বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ মহামারি আকার ধারণ করে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে সরকার সকল নাগরিককে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করাসহ কিছু বিশেষ স্বাস্থ্য সুরক্ষা আচরণ রপ্ত করার জন্য রাষ্ট্রীয় নিদের্শনা দেয়। বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকান, স্কুল-কলেজ ও গণপরিবহন। শহর থেকে বিপুল পরিমাণ মানুষ গ্রামে চলে যায়। মানুষের মধ্যে কাজ করতে থাকে ভয় ও অসহায়ত্ব। সংগত কারণেই এর প্রভাব কৃষিব্যবস্থার ওপর পড়েছে। বাংলাদেশের ফসল উৎপাদন ব্যবস্থায় অক্টোবর মাস থেকে পরের বছর মার্চ মাস পর্যন্ত সময়টাকে বলা হয় রবি মৌসুম। এ মৌসুম মাঠ ফসল উৎপাদনের জন্য প্রধান মৌসুম। এ মৌসুমে প্রাকৃতিক বৈরিতা তেমন থাকে না সে কারণে ফসল উৎপাদন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হয়। এ মৌসুমে প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের পাশাপাশি গম, ভুট্টা, আলু, ডাল ও তেলবীজ, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচের মতো প্রধান প্রধান মসলা উৎপাদন ও সংগ্রহের কাজ চলে। প্রতিটি কৃষক পরিবার কাটান ব্যস্ত সময়। এমন একটি সময়ে যদি কৃষকদের ঘরে থাকতে হয়, উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিক্রয় না করতে পারেন, মাঠের ফসলের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা না হলে এর প্রভাব কৃষির ওপর পড়বে বৈকি। এছাড়া আসন্ন খরিপ-১ মৌসুমে আউশ ধান, পাট, মুগডাল ইত্যাদি ফসল চাষের প্রস্তুতি ও পরিচর্যা, মধ্য এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে বোরো ধান কর্তন ও সংগ্রহের কাজে প্রতিনিয়ত কৃষকদের মাঠে যেতে হবে। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান কর্তন। হাওরাঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদন হয়। এ সময় উত্তরবঙ্গের পাবনা, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, জামালপুর ও ময়মনসিংহ থেকে কৃষিশ্রমিক হাওর অঞ্চলে যাতায়াত করেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে এসব কার্যক্রম খানিকটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের কৃষিতে যে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহৃত হয় তার রাসায়নিক দ্রব্যের কোনো কোনোটি কাঁচামাল হিসেবে আবার কোনোটি তৈরি পণ্য হিসেবে বিদেশ থেকে আসে। আমরা যে সবজি, ভুট্টা এবং পাট উৎপাদন করি এসব ফসলের বীজের প্রধান উৎস বিদেশ। আলু এবং কিছু কিছু হাইব্রিড ধানের বীজও বিদেশ থেকে আসে। পাশাপাশি কৃষি-যন্ত্রপাতির সিংহভাগ আসে বিদেশ থেকে। করোনাজনিত কারণে এসব পণ্য বিদেশ থেকে সময়মতো আসা বিঘিœত হচ্ছে আর তার নেতিবাচক প্রভাব কৃষির ওপর পড়তে শুরু করেছে।

তিন
উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ কৃষিক্ষেত্রে আরেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। দেশের ভেতরে এবং বাইরের পচনশীল কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ বিঘ্নিত হলে তার প্রভাবও কৃষির ওপর পড়বে নানাভাবে নানা মাত্রায়। সাধারণ ছুটির কারণে পণ্য পরিবহণ কিছুটা সংকটের মুখে পড়েছে। কৃষক তাঁর ফসল নিয়ে পড়েছেন বিষম বিপাকে। গরুর দুধ কেনার ক্রেতা নেই। যে দুধ করোনার আগে ছিল ৬০-৭০ টাকা লিটার, এখন তা ২০-২৫ টাকা দরেও ক্রেতা পাওয়া যায় না। মিষ্টির দোকান বন্ধ। বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে সবজি চাষিদের। বগুড়া, যশোর, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, সিলেট, কুড়িগ্রাম, ঝিনাইদহ, পাবনার কৃষক সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। সবজি সংরক্ষণের জন্য ‘প্রাকৃতিক হিমাগার’ তৈরির একটি উদ্যোগ কয়েক বছর আগে রাজশাহীতে নেওয়া হয়। ওই হিমাগারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। একটি প্রাকৃতিক হিমাগার প্রতিষ্ঠায় দেড়-দুই লাখ টাকার বেশি ব্যয় হবে না। গ্রাম এলাকায় ফ্রিজার নেই, দুধ পাস্তুরিত করার ব্যবস্থা নেই। সেদিকে কর্র্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কম। সরকার কৃষিতে ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছেন। কয়েক শ কোটি টাকা শাকসবজির সংরক্ষণে প্রাকৃতিক হিমাগার তৈরিতে বরাদ্দ দিলে অর্থনীতিতে যোগ হবে হাজার হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে একের পর এক বিভিন্ন জেলা লকডাউন করা হচ্ছে। এই বিরূপ পরিস্থিতিতে মৎস্য ও পশু খাদ্য, সার, বীজ, কীটনাশক, পোল্ট্রিপণ্য, কৃষি-যন্ত্রপাতি কৃষকের কাছে পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। অথচ পরবর্তী উৎপাদন সচল রাখতে এর কোন বিকল্প নেই। আবার উৎপাদিত খাদ্য শস্য আহরণ ও সংরক্ষণ, ফলমূল, শাক-সবজি, মাছ-মুরগি, দুধ, ডিম ইত্যাদি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রয়োজনীয় সব যায়গায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানো কষ্টকর হয়ে পড়ছে। সরকার যদি ট্রাকে বিভিন্ন জেলা থেকে শাকসব্জি ঢাকা ও বড় বড় শহরে এনে বস্তিবাসী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে চাল-ডালের মতো বিতরণ করতেন, কৃষকেরা কিছুটা উপকৃত হতেন এবং সবচেয়ে বেশি উপকার হতো নগরের উপার্জনহীন দরিদ্র গৃহবন্দী মানুষরা।

চার
এই বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়েই আমাদের কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। বিষয়টি কত বড় চ্যালেঞ্জ তা অবশ্যই অনুমেয়। এমনিতেই কৃষি জলবায়ুর প্রভাব নির্ভর অনিশ্চয়তার পেশা। তার ওপর যদি এই প্রাণঘাতী মহামারির মুখোমুখি হয়ে কৃষি উৎপাদন বেগবান করতে হয় সে তো হবে এক অন্য রকম মহাযুদ্ধ। এই মহামারি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে উৎপাদনের মহাযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে সাফল্য পেতে প্রয়োজন হবে:

  • যুদ্ধের প্রধান সৈনিক খাদ্যযোদ্ধা কৃষকদের সর্বপ্রকার সহায়তা দেওয়া। সবার আগে করোনা থেকে কৃষককে রক্ষা করতে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে করোনা ব্যবস্থাপনায় কৃষকরা যেন সুরক্ষিত থাকে সেটা সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিশ্চিত করবেন। আর উৎপাদন কাজে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে দ্বিগুণ দায়িত্বশীলতা ও অঙ্গীকারের সাথে কাজ করবেন যাতে উৎপাদন কর্মকান্ড নিরবচ্ছিন্ন থাকে। মাঠ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাতে প্রযুক্তি ও পরামর্শ সেবা অব্যাহত থাকে সে জন্য সংস্থা পর্যায়ে এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে সেবার পরিধি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নিতে হবে। প্রধান কাজ হবে উৎপাদনে কৃষকের মনোবল সুদৃঢ় করে তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
  • বিদ্যমান মাঠ ফসলের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা অব্যাহত রাখা; যদিও কৃষকগণ স্ব-উদ্যোগেইএ কাজটি করে থাকেন। তদুপরি উপসহকারী কৃষি কমকর্তাগণ তাদের পেশাগত কাজটিতে আরো তৎপর হবেন।
  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ, বীজ, সার, বালাইনাশক, সেচ ব্যবস্থাপনাসহ কৃষিযন্ত্রপাতির সঠিক সময়ে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব খাতের প্রণোদনা এবং বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহের কার্যক্রম যাতে মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় সেদিকে নজরদারি জোরদার করা। খরিপ-১ ও খরিপ-২ মৌসুমে ফসল চাষ নির্বিঘ্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় আমদানিযোগ্য উপকরণের জোগান নিশ্চিত করার জন্য উৎস দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ এবং এসব পণ্যের আগমন, পরিবহন ও ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আমদানিকারক ও বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর সাথে যোগাযোগ নিশ্চিত করা। খরিপ-১ মৌসুমের প্রধান প্রধান ফসল যেমন আউশ ধান, পাট, মুগডাল ইত্যাদি চাষের লক্ষ্যমাত্রা যাতে অর্জিত হয় সে বিষয়ে কৃষি গবেষণা, বিএডিসি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের যৌথ কর্মধারা জোরদার করা। এ ক্ষেত্রে ধানবীজ ব্যবসায়ী ও যারা পাটবীজ বিপণন করে থাকেন তাদের সাথে সমন্বয় বৃদ্ধি করা।
  • স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কৃষিপণ্যের পরিবহন, গুদামজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ কাজসমূহ নির্বিঘ্ন করা। আমন তথা খরিপ-২ মৌসুমে ইতোমধ্যে গৃহীত পরিকল্পনা পুনঃনিশ্চিত করা এবং বোরো মৌসুমের ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার বিষয়টি পরিকল্পনায় সংযুক্ত করে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা।
  • করোনা দুর্যোগকালে ও দুর্যোগ উত্তর উদ্ভাবনমূলক সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের জন্য উদ্ভাবনী জ্ঞান সম্পন্ন্ কর্মকর্তাদের প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করা। একই সাথে এসব উদ্ভাবনী সম্প্রসারণ সেবা সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা।

পাঁচ
করোনা পরিস্থিতির অনাকাঙ্খিত অবনতি ঘটলে আমাদের এতসব প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা ভূলুণ্ঠিত হতে পারে। পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হলে অন্যসব ব্যবস্থার মতো কৃষিখাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নিঃসন্দেহে। তখন কৃষি উপকরণের ওপর আমাদের বিদেশ নির্ভরতা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিঘিœত করতে পারে। এমন চরম খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আমরা কী পর্যায়ে কৃষি উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখব তথা খাদ্যোৎপাদন চাহিদার সমানুপাতে রাখব সে বিষয়টি এখন থেকেই ভাবতে হবে। এই প্রস্তুতির ক্ষেত্রে –

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে সম্ভাব্য নিরাপদ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে কৃষি উৎপাদন চালু রাখতে বিশ্ব পরিসরের কোনো কৌশল বা অনুমোদনযোগ্য অভিজ্ঞতা থাকলে তা গ্রহণ ও প্রয়োগের চর্চা করা যেতে পারে। সেই সাথে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের উপযোগী উদ্ভাবনমূলক কার্যকর কর্মকৌশল গ্রহণ করা আবশ্যক।
  • ভুট্টা, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের সহযোগিতা করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে কৃষকের বসতবাড়িতে এবং শহরাঞ্চলের বাড়িতে ছাদে পুষ্টিবাগান রচনার কাজ দ্রুততার সাথে করা যেতে পারে। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় এ কাজে সকলকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। নার্সারি থেকে যাতে বীজ বা চারা সংগ্রহ করে এ কাজ করা যায় তার সুব্যবস্থা থাকা দরকার।
  • একই সাথে দরকারি কৃষিযন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তুলতে হবে এবং ভর্তুকিমূল্যে অধিক সংখ্যক কৃষক যাতে কৃষিযন্ত্রপাতি পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি, বাণিজ্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আন্তঃসমন্বয় জোরদার করে কৃষি উপকরণ দেশের বাইরে থেকে আনা, খাদ্যপণ্য আমদানি-রফতানি এবং কৃষিপণ্যের ও উপকরণের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থা সুচারুরূপে চালু রাখতে হবে।
  • চলতি বোরো মৌসুম থেকে সরকারের পক্ষ থেকে ন্যায্যমূল্যে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সংরক্ষণের প্রয়োজনে বেসরকারি গোডাউন এবং সরকারি শস্যগুদামগুলো ব্যবহার করতে হবে। করোনা মোকাবিলায় এটা হবে অতি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। কৃষক, কৃষিউদ্যেক্তা এবং ক্ষুদ্র মাঝারি কৃষি ব্যবসায়ীদের কম সুদে ঋণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

ছয়
বর্তমান সরকার কৃষি বান্ধব। সরকার সার, বীজ, কীটনাশক, মৎস্য ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং সেচের জন্য ডিজেলে বরারই ভর্তুকি দিয়ে থাকেন। করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপি খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে সে জন্য সরকার কৃষকের জন্য ৫% সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছেন। অপরদিকে গার্মেন্টস মালিকদের জন্য ২%, ভারী শিল্পের জন্য ৪% সুদে প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এটা অবশ্যই বৈষম্যমূলক। সরকার কর্র্র্তৃক কৃষকদের প্রণোদনার সুদের হার ৫% থেকে সর্বনিন্ম পর্যায়ে কমিয়ে আনা জরুরি। সেইসাথে যথাসময়ে যাতে কৃষকের হাতে টাকাগুলো পৌঁছায় তার নিশ্চয়তার বিধান করা দরকার। কৃষকের প্রণোদনায় সুদের হার কখনই অন্য খাতের চেয়ে বেশি হওয়া কাম্য নয়। আমাদের কৃষক ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে গলায় দড়ি দেয়, বজ্রপাতে মরে মাঠে পড়ে থাকে। বন্যায় মাছ ও ফসল ভেসে গেলে পরিবার পরিজন নিয়ে অভুক্ত থাকেন। তবুও তাঁরা লড়াই করে বেঁচে থাকতে চান এবং সমস্ত শক্তি-শ্রম-ভালোবাসা দিয়ে এই সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে চান। এঁরাই আমাদের মানবতার ভেন্টিলেটর। শুধু তাঁদের জন্যই নয়, আমাদের নিজেদের জন্যও কৃষকের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সাত
হাতে টাকা আছে কিন্তু কেনার খাদ্যপণ্যটি বাজারে নাই! তখন কি অবস্থা হবে? মানুষসহ সব জীবিত সত্ত্বার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও প্রধানতম চাহিদা হচ্ছে খাদ্য। খাবার ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাইতো যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবার আগে মানুষ এগিয়ে আসে খাদ্য সহায়তা নিয়ে। আগে বাঁচার ব্যবস্থা তারপর অন্যকিছু। আমাদের তাই সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে খাদ্যশস্য উৎপাদনে। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল, ডাল, সবজি আছে বলেই সরকার, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ করোনাকালীন সময়েও সেগুলো যাদের দরকার তাদের কাছে কিছুটা হলেও পৌঁছে দিতে পারছেন।

গ্রামীণ অর্থনীতির সমস্যা আমাদের নীতিনির্ধারকদের খুব কমই মনোযোগ আকর্ষণ করে। সারাদেশে খাদ্য চাহিদার প্রয়োজন মেটানো ও বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষক যেন তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কৃষককে পরবর্তী উৎপাদনে মনোনিবেশকল্পে উৎসাহ প্রদানের বিকল্প নাই। উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী, পরিবহণ মালিক-শ্রমিক, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আমাদেরও নাগরিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাদের প্রতি সযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, কৃষক বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে, অর্থনীতির চাকাও সচল হবে। তাই কৃষকের সুযোগ সুবিধা আরো বৃদ্ধি করা দরকার। করোনা উত্তর সময়ে ক্ষুধা মুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে কৃষি শিল্পের বিকাশ তরান্বিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই যা করার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: