সাম্প্রতিক পোস্ট

খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণে প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার জরুরি

খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণে প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার জরুরি

কলমাকান্দা, নেত্রকোনা থেকে অর্পণা ঘাগ্রা
২৮ মে ২০১৮ খ্রি তারিখে কলমাকান্দা উপজেলা পরিষদ হলরুমে বারসিক কলমাকান্দা রিসোর্স সেন্টারের আয়োজনে খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণে প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার বিষয়ক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফুজ্জামান। অনুষ্ঠানে সরকারি, বেসরকারি, যুব, নারী, কৃষক, জেলে, কবি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অংশগ্রহণ করেন।

আলোচনায় বক্তারা জানান, শিংগাইর নদী ও হাওরের অভ্যন্তরে অবস্থিত রংশিংপুর গ্রামের চারপাশ প্রায় ৮ মাস যাবৎ জলমগ্ন অবস্থায় থাকে। এই জল ও জলাভূমি মাছ ও অচাষকৃত শাকসবজির প্রাকৃতিক উৎস। কিন্তু সেখানে তাদের অভিগম্যতার সুযোগ ঘটে কেবল ফাল্গুন-চৈত্র মাসে। আর এই সময়েও প্রায়ই পানি দূষিত থাকে। এ সম্পর্কে এই গ্রামের অধিবাসী নিতাই তালুকদার বলেন, “শিংগাইর নদীর পানি আমরা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করি। কিন্তু অনেক সময় যারা মাছ ধরে তারা মাছ ধরার লাইগ্যা একধরনের ঔষধ ব্যবহার করে। তখন মাছগুলা মইরা ভাইসা উঠে। এই মাছ খাইলেও গন্ধ করে, পানিও গন্ধ করে, গোসল করলেও শরীর চুলকায়, বাড়ীর অন্যান্য দরকারী কাজে ব্যবহার করতে পারিনা। আমাদের এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।”

IMG_20180528_132333
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার অরিফুজ্জামান বলেন, “এই উপজেলাটি একটি নেচারাল রিসোর্স সেন্টার। এখানে একই সাথে পাহাড় ও হাওরাঞ্চল রয়েছে। তাই প্রাকৃতিক সম্পদও যথেষ্ট রয়েছে। এই প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই টোটাল একটা চেইন মেইনটেইন করে। জীববৈচিত্র্যের কোন একটা কম্পোনেন্ট যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে সার্বিক বিষয়ের উপরই প্রভাব পড়ে। তাই প্রাকৃতিক খাদ্য উৎস্যগুলো যেন আমরা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারি তা নিয়ে আমাদের আরো কাজ করতে হবে। শুধু আইন করে অনেক কিছু সংরক্ষণ করা যায় না। নিজেদেরকে বিষয়গুলো বুঝে নিতে হবে। তরুণ প্রজন্মকেও এর দায়িত্ব নিতে হবে।”

উপসহকারী কৃষি অফিসার মাসুদ মিয়া বলেন, “হাওরে একসময় শাপলা, শালুক শিংড়াসহ অনেক ধরনের জলজ খাবার পাওয়া যেতো। যেগুলো ছিল আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও প্রাকৃতিক খাবার। এইসব এখন দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মানুষের আচরনগত কারনে। হাওরের অধিকাংশ জমিই ফসলী জমি। ফসল চাষের সময় মাত্রাতিরিক্ত রাসাইনিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগে শাপলা, শালুক, শিংড়ার বীজ নষ্ট হচ্ছে। জলে বসবাসকারী অন্যান্য প্রানীও মারা যাচ্ছে। তাই জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদের চর্চা বাড়ানো উচিত।”

IMG_20180528_133046
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা পপি রানী তালুকদার বলেন, “খাদ্য উৎপাদনে এবং সংরক্ষণে সেই সাথে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নারীদের অনেক ভূমিকা রয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে নারীদের অনেক অবদান রয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই তাদের নিয়ন্ত্রণাধিকার নিশ্চিত করার জন্য মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও গ্রাম পর্যায়ে আরো ব্যপকভাবে আলোচনা করতে হবে।”

উপজেলা প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা: ফারুক হোসেন বলেন, “সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন প্রকৃতি আমাদেরকে যেভাবে খাদ্য উপহার দিচ্ছে আমরা সেইভাবে গ্রহণ না করে অন্যভাবে গ্রহণ করছি। আর এই মানসিকতা থেকেই আমরা প্রকৃতিকে কুক্ষিগত করছি। প্রকৃতির প্রাকৃতিকতা স্বাভাবিক রাখার জন্য মানুষ ও প্রকৃতির সাথে সতুবন্ধন শক্তিশালী হওয়া দরকার।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিনাত জাহান বর্ণালী বলেন, “মৎস্য, মৎস্যের আবাস্থল ও এর চারপাশ প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম একটা অংশ। আর এগুলো মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতেও সহায়ক। নদী, নালা, খাল, বিল, হাওরকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে। তাই প্রাকৃতিক সম্পদের সবকিছু ভালো রাখা উচিত। যারা ঔষধের মাধ্যমে নদী বা হাওরের মাছ ধরে এবং পানির পরিবেশ দূষিত করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সকলের এগিয়ে আসতে হবে।”

গোড়াডুবি নদী, বিল ও হাওরকে কেন্দ্র করে গোড়াডুবি মৎস্যজীবী সংগঠনের সদস্যদের জীবন জীবিকা নির্ভরশীল। এখানে রয়েছে মাছের একটি অভয়াশ্রম। কিন্তু দিন দিন এর গভীরতা কমছে। তাই গভীর পানির মাছের আবাস্থলের সংকট দেখা দিচ্ছে। এ সম্পর্কে গোড়াডুবি মৎস্যজীবি সংগঠনের সহ-সভাপতি নগেন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন, “মাছের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অভয়াশ্রমটি খনন করা দরকার। অভয়াশ্রমের চারপাশে হিজলের গাছ লাগানো দরকার। তাহলে মাছের কাটা দেয়ার জন্য হিজলের ডাল কিনতে অইবোনা। এছাড়াও মৎস্যজীবীদের জন্য সরকারের যে ছয় মাস মেয়াদী ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করেছেন তা যেন প্রকৃত মৎস্যজীবীরা পেতে পারে।”

IMG_20180528_133415
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বাবুল চক্রবর্তী বলেন, “এই প্রকৃতির মধ্যে গাছপালা, নদী, নালা, হাওর, পাহাড়, বন সবকিছুকে নিয়েই আমাদের সংস্কৃতি। এগুলোকে কেন্দ্র করেই আমরা গান লিখি, কবিতা লিখি, নাটক করি। এগুলো গবাদি পশুপাখিসহ মানুষকে যেমন খাদ্য যোগায় তেমনি আমাদের লেখার বিষয়কে উন্নত করে। তাই আমরা প্রকৃতির সুরক্ষা চাই।” শুধু আলোচনা নয় বাস্তবায়ন চাই বলেও দাবি জানান।

বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক মঞ্জুরুল হক তারা বলেন, “মানুষ যখনই সংকটে পড়ে তখনই সমাধান খুঁজে। আমরা এখন প্রকৃতিতে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি। প্রকৃতির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। একসময় কলমাকান্দার মানুষ বসতি গড়ে তুলেছিল নদী, হাওর ও পাহাড়কে কেন্দ্র করে। কারন এইসব উৎস থেকে খাদ্য সংগ্রহ করা সহজ ছিল বলে। এখন একদিকে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কর্তৃত্ব বাড়ছে। এছাড়াও কলমাকান্দার যেসব এলাকার ফসলী জমি বছরের প্রায় ৬-৮ মাস পর্যন্ত পানিতে নিমজ্জ্বিত থাকে সেইসব জমির ব্যবহার বৃদ্ধিতে শিংড়া চাষের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো দরকার।”

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: