সাম্প্রতিক পোস্ট

শিমবৈচিত্র্য: প্রায়োগিক কৃষি গবেষণা

ঢাকা থেকে এবিএম তৌহিদুল আলম এবং শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে পার্থ সারথী পাল, আল ইমরান ও সুশান্ত মন্ডল

সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের গাঙ্গেয় জোয়ার প্লাবণভূমি কৃষি-পরিবেশের অর্ন্তগত সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ^রীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট গ্রামে বিগত খরিপ-১ মৌসুমে ১৮ ধরনের স্থানীয় শিম পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়। ফলন, প্রতিটি শিমের একক ওজন, বাহ্যিক ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য যেমন পুষ্পায়ন, ফল ধারণের সময়কাল, রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা, রান্নার সময়কাল, স্বাদও বাজার মূল্য ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে রেশমিলি, কড়িশিম, মাঝারি কার্তিকা, পাতরাকার্তিকা শিম স্থানীয় কৃষকরা পছন্দ করেন। পরীক্ষণ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বলা যায়, দেশের গ্রামাঞ্চলের নানা প্রান্তে এখনও অনেক ধরণের শিম বিদ্যমান যা ভিন্ন ভিন্ন কৃষি-পরিবেশে চাষ উপযোগি এবং লাভজনকভাবে চাষাবাদ করা সম্ভব।

সূচনা
বাংলাদেশের অতি জনপ্রিয় ও পুষ্টিসমৃদ্ধ শিম একটি আলোক সংবেদনশীল সবজি যা সাধারণত শীতকালে চাষ করা হয়। তবে বারোমাসী শিম সারাবছরই চাষ করা যায়। গ্রীষ্মকালে দিনের দৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় শিমের চাষ ভালো হয় না। ছোট দিনে শিমগাছে ফুল আসতে শুরু করে। গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই শিমের চাষ হয়। শিম গাছ শিকড়ের সাহায্যে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে মাটিকে উর্বর করে তোলে। বাংলাদেশে শিমের যে জাত রয়েছে সেগুলোতে সাধারণত অক্টোবর মাসের আগে এর ফুল আসে না। (‘গ্রীষ্মকালের চাষেও চাহিদা মেটাবে শিম-টমেটো’, ড. শহীদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা নিউজ২৪.কম, জুলাই ১২, ২০১৩)। বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষিপরিবেশ অঞ্চলে বিভিন্ন ফেনোটাইপের নানা বৈশিষ্ট্যের হরেক রকমের শিম রয়েছে। আবার একই শিমই কখনো কখনো বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন নামেও পরিচিতি লাভ করে। শিমের যেহেতু আগাম, মাঝারি ও নাবি জাত আছে তাই জাতের সঠিক তথ্য জেনে চাষ না করলে ভালো ফলন পাওয়া যায় না। বিভিন্ন ফেনোটাইপিক বৈশিষ্ট্যের দেশীয় এই শিমগুলো নানা কারণে বিলুপ্তির সম্মুখীন। কিন্তু জাত গবেষণা ও শিমজাত উন্নয়নের জন্য এইগুলো ভবিষ্যতেও প্রয়োজন রয়েছে।

bean-1

উপকরণও গবেষণা পদ্ধতি
বিগত ২০১৭ সালের খরিফ-২ মৌসুমে শিমবৈচিত্র্য প্রায়োগিক গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ^রীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট গ্রামে। মোট ১৮ ধরনের শিম যেমন লালকরমজা, জামাইকুলি, দেলপাট, বড়করমজা, সাদা নলকোষ, পাতরানলকোষ, কলাশিম, লালশিম, পাতরা কার্তিকা, সবুজনলকোষ, কার্তিকা, মটরশিম, কড়িশিম, নলকোষ, মাঝারি কার্তিকা, জলকার্তিকা, রেশমিলি, ঘৃতকাঞ্চন শিম এই প্রায়োগিক গবেষণায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। বসতভিটায় কৃষকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ও জৈবপদ্ধতির চাষাবাদে পরিচালিত এই পরীক্ষণে জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ১.৫ বর্গফুট আকৃতির পিট তৈরি করে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে প্রতিটি পিটে ৪ টি করে বীজ বপন করা হয়। বীজ বপনের ৫-৬ দিনের মধ্যে অংকুরোদগমের পর সেখান থেকে প্রতিটি পিটে ২টি সবল চারা রাখা রেখে বাকিগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়। পরীক্ষণে অন্তর্ভূক্ত প্রতিটি শিমের পাক্ষিকভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার সাথে যুক্ত কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠির মতামতকে তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তি হিসাবে ধরা হয়।

ফলাফল পর্যালোচনা
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কলাশিম জাতে সর্বাগ্রে ৭২ দিনে (অক্টোবর)ফুল এসেছে। এরপর কার্তিকা ও রেশমিলি জাতে যথাক্রমে ৮১ ও ৯১ দিনে পুষ্পায়ন হয়েছে। সবার শেষে ১৫০ দিনে ফুল এসেছে নলকোষ ও মাঝারি কার্তিকা শিমে। তাই এই শিমগুলো শীতকালীন নাবি জাতের। ফুল আসার সময় বিবেচনা করলে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, কলাশিম, কার্তিকা ও রেশমিলি আগাম শীতকালীন জাত। নলকোষ ও মাঝারি কার্তিকা শিম নাবি শীতকালীন জাত। এছাড়া নভেম্বর মাসের মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ফুল এসেছে লালকরমজা, জামাইকুলি, দেলপট, বড়করমজা, সাদানলকোষ, পাতরাকার্তিকা, সবুজ ললকোষ শিমের। এই শিমগুলো শীতকালীন জাতের। অন্যদিকে শীতকালীন হলেও তুলনামূলক দেরীতে অর্থাৎ ডিসেম্বরে ফুল এসেছে লালশিম, মটরশিম কড়িশিম, জল কার্তিকা ও ঘৃত কাঞ্চন শিমে। প্রতিটি শিমের একক ওজন বিবেচনায় সর্বোচ্চ ২৪৭ গ্রাম গড় পাওয়া গেছে কলাশিমের। আর সাদা নলকোষ শিমের প্রতিটির গড় ওজন মাত্র ৫ গ্রাম। অন্যদিকে ঘৃতকাঞ্চন শিমের প্রতিটির গড় ওজন পাওয়া গেছে ৫৩ গ্রাম। প্রতিটি শিমের ৩০-৪৩ গ্রাম গড় ওজন পাওয়া গেছে এমন জাতগুলো হলো দেলপট, পাতরাকার্তিকা, সবুজ নলকোষ, কর্তিকা, মটরশিম, কড়িশিম, মাঝারি কার্তিকা ও রেশমিলি। গড় ওজন ৩০ গ্রামের নিচে এমন জাতগুলো হলো লাল করমজা, জামাইকুলি, বড়করমজা, পাতরা নলকোষ, লালশিম, নলকোষ ও জলকার্তিকা জাতের। গাছপ্রতি সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া গেছে ঘৃতকাঞ্চন জাতে যা ৪৬.৮১ কেজি আর সর্বনিম্ন ফলন পাওয়া গেছে সাদা নলকোষ জাতে ১.০২ কেজি। রেশমিলি জাতের গাছ প্রতি ফলন পাওয়া গেছে ৩৩.২৪ কেজি, পাতরা কার্তিকা জাতে ২৩.১০ কেজি, কড়িশিম জাতে ১৮.৭ কেজি ও মাঝারি কার্তিকা জাতে ১৬.২২ কেজি।

Bean-seed

গবেষণায় দেখা গেছে, সব শিমেই স্বল্প থেকে মাঝারি মাত্রায় জাব পোকার আক্রমণ হয় যা সাবান-পানি, মেহগনি ফলের রস স্প্রে করে এবং বাসি ছাই ছিটিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি শিমের নাম করণের সাথে এর উৎপাদন সময়, ফলধারণ, ফলের আকার, বর্ণ বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। যেমন কলা শিম কলার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ তেমনি নলকোষ শিম নলাকৃতির।

উপসংহার
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, বিভিন্ন শিমে বিভিন্ন ধরণের ফেনোটাইপিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যা মানুষের পছন্দ ও বাজারমূল্যের নির্ধারক। সর্বাধিক পছন্দের জাতগুলো যেমন অধিকতর গবেষণার দাবি রাখে তেমনি এই শিমগুলো বিভিন্ন এলাকায় চাষের জন্য সহজলভ্য হলে দেশে শিমবৈচিত্র্যও বাড়বে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: