Posted in

কৃষি ও জনস্বাস্থ্যে জলবায়ু পরিবতনের প্রভাব

ঢাকা থেকে এবিএম তৌহিদুল আলম

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে কাজ করছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার সংস্থা বা ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)। সারা বিশ্বের ৮৫০ বিজ্ঞানী এখানে কাজ করছেন। আইপিসিসি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আইপিসিসি বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে দারিদ্রের হার বাড়বে এবং সহনীয় জলবায়ু পরিবর্তন পরিবেশে বছরে ১ দশমিক ১ শতাংশ হারে এবং চরম জলবায়ু পরিবর্তন পরিবেশে ২ শতাংশ হারে মোট দেশজ উৎপাদন হ্রাস পাবে। তাই ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য দারিদ্র ও বৈষম্য বিলোপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার মত বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেকক্স’র ২০১৯ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ৭ম বিপদাপন্ন দেশ হলো বাংলাদেশ ।

২০১৪ সালে আইপিসিসি’র ৫ম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে মৌসুমি বায়ু প্রভাবিত এলাকায় বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অপরদিকে শুকনো মৌসুমের বৃষ্টি কমছে। তাই বদলে যাচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন। অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি তারপর দীর্ঘ সময় ধরে অনাবৃষ্টি প্রায়শই আমাদের কৃষি অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। তাই বাড়ছে বন্যা ও খরার প্রকোপ। উত্তাপ বাড়ার ফলে বাষ্পীভবন বাড়ে, কমে যায় ব্যবহারযোগ্য পানির পরিমাণ। এক কথায় বলা যায়, পানি চক্রের স্বাভাবিক ছন্দে বিঘ্ন ঘটছে। এটা শুধু কৃষি অর্থনীতিতেই নয়, আঘাত হানছে বাস্তুতন্ত্রেও।

জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি
পৃথিবীব্যাপী খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রধানতম খাত হলে কৃষি যা জলবায়ু পরিবর্নের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা একটি ভয়াবহ বার্তা। সবকিছু অক্ষুন্ন রেখে যদি দেশের তাপমাত্রা বর্তমানের চেয়ে ১ ডিগ্রিও বৃদ্ধি পায়, তবে ধানের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ এবং গমের উৎপাদন ৬১ শতাংশ কমে যাবে। অন্যদিকে আইপিসিসি বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৮ শতাংশ ধান ও ৩২ শতাংশ গমের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন গবেষকরা। কোনো কোনো বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাপমাত্রা ২ ডিগ্রির বেশি বাড়লেই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর যার ফলে ধান ৮ ভাগ এবং গমের উৎপাদন ৩২ ভাগ কমবে। উচ্চতাপমাত্রা আউশ, আমন ও বোরো ধানের উচ্চফলনশীল জাতের ফলন হ্রাস করবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বিকিরণ পরিবেশের কীটপতঙ্গ, রোগ-জীবাণু ও অণুজীবগুলোর বৃদ্ধি ঘটাবে।

1 (1)

আইপিসিসি’র এর ৫ম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারাবিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একুশ শতকের মধ্যে তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি বেড়ে যেতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। রিপোর্টে বলা হয়, জলবায়ুর এই পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশের মিঠা পানির প্রবাহ ও কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যাবে। এছাড়া নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব ঘটবে।

জলবায়ু পরিবর্তন উপকূলীয় এলাকায় কৃষিজমির লবণাক্ততা বাড়াবে যার ফলে উপকূলীয় কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে লবণাক্ততা প্রবণ এলাকায় ধানের ফলন কমে গেছে। বিশেষত পটুয়াখালী জেলার ধানের গড় ফলন জাতীয় উৎপাদন গড়ের চেয়ে ৪০ শতাংশ এবং নওগাঁর তুলনায় ৫০ শতাংশ কম। সহনীয় জলবায়ু পরিবর্তন পরিবেশে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের ফলে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ফসল নষ্ট হচ্ছে। পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, স্থিতাবস্থা পরিস্থিতিতে ফলন হ্রাসের ফলে বার্ষিক ধানের উৎপাদন ২০৫০ সালে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ২১০০ সালে আরো ৫ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট পুনঃপুন বন্যায় কৃষি খাত আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগব্যাধি
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। এই তাপমাত্রা মানুষের শরীরে রোগবালাই সৃষ্টিতে সহায়ক হিসাবে কাজ করবে। মানুষের শরীরের সুস্থতা রোগবালাই ও তার চারপাশের পরিবেশের উপর নিভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের উপর যে যৌগিক চাপ তৈরি হবে তাতে অনেক গুণ স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাবে। যেমন অতি বেগুনি রশ্মি বেশি মাত্রায় পৃথিবীতে প্রবেশ করলে মানুষের শরীরে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। ভূপৃষ্ঠের কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার ফলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি অংশ জলাশয় ও সমুদ্রের পানির সাথে মিশে পানির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনবে। পানি দূষণের ফলে পানিতে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদপ্রাণি বিলুপ্ত হবে। দূষিত পানিতে বড় হওয়া মাছ খেয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। সেচকাজের ব্যবহৃত পানি দূষিত হলে সেই পানি ব্যবহারে উৎপাদিত ফসল খেয়ে শারীরিক রোগব্যাধি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তন সুপেয় পানি ও পয়োঃনিষ্কাশন সমস্যা বাড়াবে। এতে করে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যাবে। গবেষকদের মতে, ২০২০ সালের মধ্যে উদরাময়জনিত রোগ বেড়ে যাবে। তাপমাত্রা উষ্ণ থাকলে সমুদ্রে যেখানে দূষিত পানি রয়েছে সেখানে ঘন ঘন শৈবাল জন্মায়। সমুদ্রে শৈবালের সাথে কলেরা জীবাণুর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

2

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কোনো কোন গাছের রেণু উৎপাদন বাড়বে। ফলে হাঁপানি ও এলার্জিজনিত রোগ বাড়বে। বৈশ্বিকউষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে কোনো কোনে পতঙ্গের স্বাভাবিক জীবনকাল দীর্ঘায়িত হবে। ফলে অনুকূল পরিবেশ পেয়ে তাদের দ্বারা বাহিত রোগ- জীবাণুর সংক্রমণ বেড়ে য়াবে। জলবায়ু পরিবর্তনে ভেক্টর অণুজীব যেমন- মশা, মাছি ও ইদুর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বেশি বেশি বংশ বৃদ্ধি করবে। ফলে বাড়বে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, কালাজ্বর ইত্যাদি। মানুষের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয় বা মানুষের উপকার করে থাকে এমন ব্যকটেরিয়ার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত কারণে পবিবর্তিত হতে পারে যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

অতিরিক্ত গরম আর আর্দ্রতায় রক্তচাপ ওঠানামা, ক্লান্তি এমনকি হিটস্ট্রোক মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ বাড়ার ফলে দরিদ্র জনগণ পর্যাপ্ত ও সুষম খাবারের অভাবে পুষ্টির সমস্যায় পড়বে। এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে ত্বক, ফসফুস, পাকস্থলি, কিডনী ও হাড়সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গে জটিল রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। যেসব রোগীরা দীঘর্দিন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সেই রোগে আরও জটিল আকার ধারণ করবে ও নিরাময়ে সমস্যা হবে। শিশুদের টনসিলের প্রদাহ, কানের সমস্যা, ঘন ঘন সর্দিকাশি ও রোটা ভাইরাসে আক্রান্তের কারণে মারাত্মক ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হুমকির সম্মুখীন হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি মা ও নবজাতকের বিভিন্ন সমস্যা যেমন জন্মগত সমস্যা, মস্তিষ্কের ত্রূটি হতে পারে। উষ্ণপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যাও খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দূর্যোগ মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ঘটনা। দূর্যোগে বিপর্যস্ত পরিবার জীবন-জীবিকা হারানোর ফলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

3 (1)
বৈশ্বিক উষ্ণতাবৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ। কোন সন্দেহ নেই জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলা করা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সম্ভব নয়। কার্বন পোড়ানোর পরিমাণ কমিয়ে তাই নবায়নযোগ্য জা¡লানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একমাত্র গাছপালাই পারে পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.