Posted in

একটু সুখের ছোঁয়ায়

মানিকগঞ্জ থেকে কমল চন্দ্র দত্ত

ভাগ্য বিড়ম্বনার কারণে অনেকের জন্ম হয় দরিদ্র পরিবারে। বড় হবার সাথে সাথে দারিদ্রতার বলয় থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এ রকমই এক কঠোর পরিশ্রমী নারী মানিকগঞ্জ পৌরসভাধীন পূর্ব দাশড়া গ্রামের অবহেলিত মনিদাস পাড়ার শুভলক্ষ্মী মনিদাস (৪৫)। পিতার অভাবগ্রস্ত সংসার থেকে অল্প বয়সে বিয়ে হয় আরেক অভাবগ্রস্ত পুরুষ মঙ্গল চন্দ্র মনিদাসের সাথে। সংগত কারণেই অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে তাদের সংসার চলছিল। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেই পৃথিবীর মুখ আলো করে আসে তাদের মেয়ে ভগবতী মনিদাস। এর ছয় বছর পর জন্ম নেয় ছেলে অধীন মনিদাস। শুভলক্ষ্মীর স্বামী তখন রাজমিস্ত্রির যোগানদারের কাজ করতেন। তার উপার্জিত অর্থে কোন রকম দু’বেলা খেয়ে বেঁচে দিন চলে যায় তাদের।

DSC03820 (1)

অভাব-অনটন দূর করার জন্য শুভলক্ষ্মী দাস নিজে কাজে যোগদান করেন। তিনি মাটি কাটার কাজ শুরু করেন। মাটি কাটার কাজের সাথে সাথে তিনি বাড়িতে ছাগল পালন করেন। মায়ের দেয়া একটি ছাগল নিয়ে আসেন নিজ পরিবারে। নিজেদের থাকার জন্য একটি মাত্র দোচালা টিনের ঘর। তাও আবার ভাঙাচোরা। একটু জোরে বৃষ্টি এলেই জল পড়ে। সঙ্গত কারণেই একই ঘরে নিজেদের ও ছাগলের বসবাস। তারপর ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা চালিয়ে যান তিনি। একটি ছাগল থেকে এক বছর পর ২টি পরবর্তীতে ২টি থেকে ৬টি ছাগল হয় তাঁর। এভাবে বর্তমানে তাঁর মোট ২৬টি ছাগল রয়েছে। তিনি কয়েকবার ছাগল বিক্রি করে ৩৬ হাজার ৭শ’ ৫০ টাকা আয় করেছেন। তিনি নিজে ঘাস কেটে ছাগল লালন পালন করেছেন বিধায় তার ব্যয় কম হয়েছে। তিনি নিজের ছোট বোনকে একটি ছাগলও দিয়েছেন।

ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ও সংসারের ব্যয় মেটানোর জন্য তিনি এ কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান। তাঁর মেয়ে ভগবতী মনিদাস মানিকগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে থেকে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছিল কিন্তু পাশ করতে পারেনি এবং ছেলে অধীন মনিদাস মানিকগঞ্জ খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন খান উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে। তিনি ছাগল পালনের পাশাপাশি কবুতরও পালন করেন। কবুতর পালনে তাঁর একটি মজার ইতিহাস আছে। তিনি খড়ি আহরণ করার জন্য একবার একটি অসুস্থ কবুতরের বাচ্চা পান। সেটিকে তিনি বাড়িতে এনে ছেলের জন্য রান্না করতে চান কিন্তু ছেলে বায়না ধরে সে কবুতরটিকে পালন করবে। ছেলের কথায় মা অনেক কষ্ট করে কবুতরটিকে সুস্থ করে পালন শুরু করেন। শুভলক্ষ্মী মনিদাস বাজার থেকে আরও ২টি কবুতর কিনে মোট ৪টি কবুতর পালন শুরু করেন। তা থেকে দুই বছরে মোট ৬০টি কবুতর হয়। কবুতরের বাচ্চা বিক্রি করেও তিনি মোটামুটি আয় করেন। বর্তমানে তার ৪৫টি কবুতর আছে।

শুভলক্ষ্মী মনিদাস সামাজিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তার ছেলেমেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভালো ছেলে পাওয়ায় গত বছর মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। তবে তিনি ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করে তার আশা পূরণ করতে চান।

DSC03821

তিনি কত বছর যাবৎ ছাগল পালন করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ৮-৯ বছর আগে থেকে ছাগল পালন শুরু করি। আমি গত এক বছরে বিশ হাজার টাকার ছাগল বিক্রি করেছি। আমার হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত নব্বই হাজার টাকার ছাগল বিক্রি করেছি। সেই টাকা আমি সংসারের নানা কাজে এবং ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অঞ্জলী রাণী দাস, শিখা রাণী দাস, অর্চনা রাণী দাস ও পুষ্প রাণী দাস ৩-৪ বছর ধইরা ছাগল পালে।’

তিনি নিজে আয়রোজগারের সাথে নিয়োজিত বিধায় সমাজ ও পরিবারে তাঁর মর্যাদার আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি জানান। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পরিবারে আমার স্বামী আগে আমার কথার দাম দিত না,কোন বিষয়ে আলাপ করতো না, আমার মতামত নিত না। নিজের মনে যা চাইত তাই করতো। এখন আমার কথার দাম দেয়, সংসারের নানান বিষয়ে মতামত চায়। সমাজের লোকজন আগে নানান কথা বলতো। কেউ কেউ ছাগল পালন নিয়া টিটকারি করতো। মেয়েকে পড়াই দেইখা নানান কথা বলতো। অনেকে বলতো মেয়েকে বিয়া না দিয়া ঘরের খুটি বানাইয়া রাখ গা। আমি অনেক কষ্ট কইরা ছাগল ও কবুতর পাইলা এবং মাটি কাইটা মেয়েকে মেট্রিক দিয়াছি। এখন সবাই আমাকে ভালো চোখে দেখে, আমার কথার দাম দেয়।’

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.