Posted in

আমার মেয়েদের বাল্য বিয়ে দেব না আমি

নেত্রকোনা থেকে সুয়েল রানা

গ্রামাঞ্চলে অনেক পিতামাতা রয়েছেন যারা ইচ্ছা থাকলেও দারিদ্রতার জন্য বেশিদূর লেখাপড়া করতে না পেরে সে ইচ্ছা শত কষ্টের মাধ্যেও সন্তানদের মাধ্যমে পূরণের চেষ্টা করেন। নিজে খেয়ে না খেয়ে হলেও এধরণের পিতামাতা সন্তানদের খরচের টাকা জোগাড় করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ান। এমন অনেক পিতামাতার সাফল্যের কাহিনী আমরা প্রায়শই বিভিন্ন গণমাধ্যমের (রতœগর্ভা) মাধ্যমে জেনে থাকি। এমন সফল মায়েদের গল্প বা কাহিনী শুনে সত্যি আমরা তাদের জন্য গর্ভবোধ করি, তাদের সফলতায় আমরাও উদ্বুদ্ধ হই।

এমনই একজন মায়ের গল্প আজ আপনাদের নিকট তুলে ধরছি। তিনি হলেন নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার মদন ইউনিয়নের হাওর ঘেষা দক্ষিণ মদন গ্রামের পয়ত্রিশোর্ধ কনিকা আক্তার, যিনি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের গৃহবধু। ৬ সন্তান (৫ মেয়ে ও ১ ছেলে) ও স্বামীসহ ৮ সদস্যের পরিবার কনিকার। স্বামী আজিজুল হক (৫০) পেশায় কৃষি শ্রমিক। স্থাবর সম্পদ বলতে বাড়ি ভিটার এক কাঠা বা ১০ শতাংশ জমি। চাষের নিজস্ব কোন জমি না থাকায় স্বামী আজিজুল হক অন্যের জমি বর্গা ও লিজ নিয়ে চাষ করে আট সদস্যের খোরাকের ধান উৎপাদন করেন। বছরের অধিকাংশ সময় তিনি কৃষি মজুরের কাজ করে যে আয় করেন তা দিয়েই আটজনের সংসার অনেক কষ্টে চলে। সংসারের অভাব অনটনের মধ্যেও কনিকা আক্তার সকল সন্তানকেই বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্বিবিদ্যালয়ে লেখাপড়া করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বড় মেয়ে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজে অর্নাস তৃতীয় বর্ষে পড়ছে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। চতুর্থ মেয়ে ৭ম, পঞ্চশ ছেলে মাদ্রাসা স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী এবং ষষ্ঠ মেয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। কনিকা আক্তার মাঝে মাঝে গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে টুকিটাকি কাজ করে পরিবারের আয় বৃদ্ধির চেষ্ট করেন।


কিন্তু গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতেও একমাত্র বোরো ধানের মৌসুম ছাড়া তেমন কাজ থাকেনা। ফলে কনিকাকে বছরের বেশিরভাগ সময় স্বামীর সামান্য আয়ের উপরই নির্ভর করতে হয়। কনিকা আক্তার নিজে এবং মেজো মেয়ে কাপড় সেলাইয়ের কাজ ভালো জানেন। সেলাইয়ের কাজ জানা থাকলেও সেলাই মেশিন না থাকায় সে দক্ষতা তারা পরিবারের আয় বৃদ্ধিতে কোন কাজে লাগাতে পারেনা। একটি সেলাই মেশিন কেনার ইচ্ছা থাকলেও দারিদ্রতার জন্য তা সম্ভব হয় না। একটি সেলাই মেশিনের মূল্য কম করে হলেও আট হাজার টাকা। স্বামী যে আয় করেন তা জমিয়ে সেলাই মেশিন কেনা তাদের পক্ষে অসম্ভব। স্বামীর রোজগারের টাকা থেকে বড় মেয়ের ময়মনসিংহে লেখাপড়ার খরচ দিতে গিয়ে কনিকাকে হিমশিম খেতে হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়ে, যারা মদন আব্দুল আজিজ খান সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছে তাদের লেখাপড়ার খরচতো রয়েছেই। কনিকা আক্তার ও মেজো মেয়ে নারী ও শিশুদের সকল প্রকার পোষাক যেমন-থ্রি-পিছ, মেক্সি, ব্লাউজ, পেটিকোট, পাজামা, ফ্রক, বাচ্চাদের পেন্ট, নারীদের স্কার্ফ, হিজাব ইত্যাদি দক্ষতার সাথে সেলাই করতে পারেন।

কনিকা রানী তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘একটি সেলাই মেশিন হলে আমি এবং আমার মেজো মেয়ে দু’জনে গ্রামের নারীদের ফরমায়েস অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের পোষাক তৈরি করে পরিবারের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে পারতাম। আমার সব সন্তানই লেখাপড়ায় খুব আগ্রহী, কিন্তু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলে তাদেরকে শহরে থেকে পড়তে থাকা, খাওয়া ও যাতায়াত বাবদ অনেক খরচ লাগে। তাই আমার মন খারপ হয় এই ভেবে যে, টাকার অভাবে আমার সন্তানরা হয়তো ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না। একটি সেলাই মেশিন হলে আমি ঘরে বসে সেলাইয়ের কাজ করে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারতাম।’


কনিকা আক্তার ২০১৯ সালে দক্ষিণ মদন গ্রামের বারসিক’র সহযোগিতায় গড়ে ওঠা ‘দক্ষিণ মদন নারী সংগঠন’র সদস্য হন। বারসিক’র আয়োজনে বিভিন্ন সভা, সেমিনার, মেলা ও প্রশিক্ষণে তিনি অংশগ্রহণ করেন। অত্যন্ত অভাব অনটনের মধ্যেও কনিকা তার ছয় সন্তানকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করানোয় গ্রামের সকলে এবং সংগঠনের সকল সদস্য তার খুব প্রশংসা করেন। সংগঠনের সভাপতি পাপিয়া আক্তার এবং অন্যান্য সদস্যরা সংগঠনের মাসিক সভায় বারসিক’র কর্মীর নিকট কনিকা আক্তারের সেলাই কাজে দক্ষতার কথা জানায়। তারা কনিকার জন্য সম্ভব হলে বারসিক’র মাধ্যমে পা চালিত একটি সেলাই মেশিন সহযোগিতা দেয়ার জন্য সুপারিশ করেন।

২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে বারসিক ‘দক্ষিণ মদন নারী সংগঠন’র মাধ্যমে সেলাই কাজের মাধ্যমে কনিকা আক্তারের পারিবারিক আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি পা চালিত সিঙ্গার সেলাই মেশিন সহযোগিতা প্রদান করে। সেলাই মেশিন সহযোগিতা পেয়ে কনিকা আক্তার সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় আশার আলো দেখতে পান। প্রায় এক বছর যাবৎ কনিকা ও তার মেজো মেয়ে অবসরে গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে ও নারীদের পোষাক তৈরী করে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করে চলেছেন। এ বিষয়ে কনিকা আক্তার বলেন, ‘আমরা প্রতি সপ্তাহে ৩/৪টি থ্রি-পিস সেলাইয়ের ফরমায়েস পাই। এখন আমি প্রতিমাসে কিছু না কিছু আয় করি, যা পরিবারের জন্য খুবই সহায়ক হয়েছে।’

কনিকা আরও বলেন, ‘ঘরে বসে কাপড় সেলাই করে প্রতিমাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় করতে পারায় আমাকে সন্তানদের প্রাইভেটের খরচ নিয়ে চিন্তা করতে হয়না। প্রতিমাসে সেলাই থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে মোটামুটি সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চলে যায়। শুধুমাত্র ময়মনসিংহে বড় মেয়ের খরচ দিতে একটু সমস্যা হয়।’ ‘আর কি ধরণের কাজ করলে তার আয় আরও বাড়বে’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনিকা বলেন, ‘যদি ঘরে কিছু কাপড় রাখা যেত তাহলে গ্রামের নারীরা বাড়ি এসে কাপড় কিনে পোষাক তৈরির ফরমায়েস দিতেন। কিন্তু ঘরে কাপড় না রাখায় গ্রামের নারীরা প্রয়োজন থাকলেও পছন্দের পোষাক বানাতে দেয়না, কারণ গ্রামের নারীদেরকে মদন উপজেলা সদরে গিয়ে কাপড় কিনে নিয়ে এসে তবেই সেলাই করতে দিতে হয়। গ্রামের নারীদের সব সময় শহরে যাওয়া হয় না এবং কাপড়ও কেনা হয় না। তাই ঘরে কিছু কাপড় তোলা গেলে কাপড় যেমন বিক্রি হত তেমনি সেলাইয়ের ফরমায়েসও বাড়ত। আমার লেখাপড়ার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু দরিদ্র পিতার পক্ষে আমাকে লেখাপড়ার খরচ দিতে না পারায় আমাকে বাল্য বয়সেই বিয়ে দেয়। কিন্তু আমি আমার বাবার মত মেয়েদের বাল্য বিয়ে দিবনা, আমার সাধ্যমত আমি তাদেরকে লেখাপড়া করাবো, যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াত পারে।’ একটি সেলাই মেশিন কনিকার ইচ্ছা পূরণে খুবই সহায়তা করছে বলে তিনি জানান। ভবিষ্যতে তিনি ঘরে কাপড় রেখে সেলাই কাজটিকে আরও বড় করার স্বপ্ন দেখেন।

কনিকা আক্তারের মত গ্রামের ধনী ও দরিদ্র সকল পরিবারের পিতা-মাতা দরিদ্রতা বা অভাবকে দায়ী করে সন্তানদের বাল্য বয়সে বিয়ে না দিয়ে লেখাপড়া করিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোয় সহযোগিতা করলে গ্রাম তথা দেশ থেকে বাল্যবিয়ে যেমন দূর হবে, তেমনি নরীরা সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়ে পারিবারিক উন্নয়নে তথা দেশের উন্নয়নে শামিল হতে পারবেন। সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার যে স্বপ্ন কনিকা আক্তার দেখে চলেছেন তার সন্তানরা যেন সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারে সেই কামনা করি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.